মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
চট্টগ্রামের বন্যার দৃশ্য বলে ছড়ানো ছবি দুটি এআই নির্মিত ফ্যাক্টচেক

চট্টগ্রামের বন্যার দৃশ্য বলে ছড়ানো ছবি দুটি এআই নির্মিত

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

পুরো চট্টগ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে, এমন দাবি করে সম্প্রতি এরিয়াল ভিউয়ের দুটি ছবি একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবি দুটি গুগলের এআই টুল দিয়ে নির্মিত বা সম্পাদিত। 

গত ১০ জুলাই ‘শিক্ষা বার্তা’ নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট হওয়া ছবি দুটি প্রথমে ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। ক্যাপশনে লেখা— “মনে রাখবেন, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে যখন বন্যা হয়েছিল, তখন চট্টগ্রামের মানুষ তাদের সহযোগিতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আজ পুরো চট্টগ্রাম পানিতে ডুবে যাচ্ছে, অথচ তেমন কোনো মানুষের দৃষ্টি নেই। বড় কোনো মিডিয়াতেও তেমন গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে না, সুশীল সমাজেও নেই উল্লেখযোগ্য আলোচনা। মনে রাখবেন, বাংলাদেশে চট্টগ্রাম সবদিক থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জনপদ। এই অন্ধকার কেটে গিয়ে খুব শিগগিরই আলো আসবে, ইনশাআল্লাহ।দেশের কোনো অংশ বিপদে পড়লে আবার আমাদের স্মরণ করবেন। আগের মতোই আমরা মানবতার পাশে দাঁড়াতে ঝাঁপিয়ে পড়বো। ঢাবি, চবিসহ চট্টগ্রামের সকল কমিউনিটি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসুন। আল্লাহ আমার প্রিয় জনপদ চট্টগ্রামকে হেফাজত করুন। আমিন। সংগৃহীত।”

ফেসবুকে একই ছবি দিয়ে আরও একাধিক পোস্টের (,,) পাশাপাশি ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম এক্স (সাবেক টুইটার)- এ ছবি দুইটি একসঙ্গে বা আলাদাভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 

একটি ছবিতে দেখা যায়, ওপর থেকে দেখানো এরিয়াল ভিউতে একটি বিস্তীর্ণ শহর বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। শহরের রাস্তাঘাট এবং বেশিরভাগ ভবনের নিচতলা পানিতে নিমজ্জিত। ছবির মাঝখানে একটি অর্ধবৃত্তাকার উড়ালসড়ক বা সেতু রয়েছে, যার কিছু অংশ পানির উপরে দৃশ্যমান। ছবির নিচের অংশে পানিতে প্রচুর ভাসমান ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবং ডানদিকে নিচে একটি বড় নৌযানে প্রচুর মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। 

কাছাকাছি ধরনের আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, উজ্জ্বল দিনের আলোতে ওপর থেকে নেওয়া একটি প্লাবিত শহরের দৃশ্য। এই ছবির মাঝখান দিয়েও একটি দীর্ঘ এবং আঁকাবাঁকা উড়ালসড়ক বা হাইওয়ে চলে গেছে। এই ছবিতে উড়ালসড়ক কোনো অংশই পানির নিচে নেই। শহরের বহুতল ভবন এবং সবুজ গাছপালা পানিতে আংশিক নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। 

সত্যতা যাচাইয়ে ছবি দুইটি পর্যবেক্ষণ করে ডিসমিসল্যাব। একটি ছবিতে দেখা যায়, পানির মাঝখানে থাকা কিছু ভবন আবছাভাবে পানির সঙ্গে মিশে গেছে। ভবনগুলোর ছাদের রং ও বন্যার পানির রং একে অপরের সঙ্গে মিশে গেলেও ভবনের সামনের অংশ ঠিকই দেখা যায়।

আরেকটি ছবির মাঝখানে একটি ফ্লাইওভার দেখানো হয়েছে, যার একপ্রান্ত ঢালু হয়ে পানির মধ্যে নেমে বহুতল ভবনের দিকে চলে গেছে। এছাড়া ছবির নিচের দিকে একাধিক নৌকা ও জাহাজ আকৃতির বস্তু দেখা যায়। শহরের প্রেক্ষাপটে এত বড় নৌযানের উপস্থিতি অস্বাভাবিক। 

তাই অধিকতর যাচাইয়ের জন্য ডিসমিসল্যাব ছবিগুলো গুগল জেমিনি এআই শনাক্তকারী টুল “ভেরিফাই এআই” দিয়ে পরীক্ষা করে। টুলটি জানায়, দুটি ছবিই গুগলের এআই টুলের সহায়তায় তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে গুগল সিন্থআইডির হিটম্যাপ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়, একটি ছবির প্রায় পুরো অংশই এআই নির্মিত এবং আরেকটি মাঝ ও নিচের দিকের অংশ এআই দিয়ে সম্পাদনা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পুরো চট্টগ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে দাবি করে এরিয়াল ভিউয়ের যে ছবি দুটি ছড়াতে দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তব কোনো দৃশ্যের নয়, বরং এআই নির্মিত। 

তবে গত ৪ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোয় ১২ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাংলাদেশের সাত জেলা ও ৫৮টি উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। অতিভারী বৃষ্টির ফলে বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ জনে। আহতের সংখ্যা ৩৯ জন। এছাড়া, বন্যায় পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। 

আরো কিছু লেখা