
ভারতের উত্তর প্রদেশে মুসলমানদের বাড়ি ঘরে লুটপাট করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। এই ঘটনার প্রতিবাদে মুসলিমরা রাস্তায় নামলে তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায় মোদি প্রশাসন। এমন দাবিতে একাধিক ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবিগুলো উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের হেল্পলাইন সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে উত্তর প্রদেশে লক্ষ্ণৌর বিভূতি খন্ড এলাকায় আন্দোলনের দৃশ্য।
ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ১২ মে একটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, “ভা/রতে/র উত্তর/প্রদেশে মুসলমা/নদের বাড়ি ঘরে লুটপা/ট করে আ/গু/ন জ্বা/লিয়ে দেয় হি/ন্দুত্ববা/দীরা। এই ঘটনার প্রতিবাদে মুসলিমরা রাস্তায় নামলে উল্টো তাদেরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় মো/দি প্রশাসন ।। যদিও ঘটনা টা কিছু দিন আগের কিন্তু এসব ঘটনা ভারতে প্রতিদিনই হচ্ছে।। কিন্তু কোন মিডিয়া তা প্রকাশ করে না।।”

পোস্টের একাধিক ছবিতে দেখা যায়, লাল জামা এবং সাদা ওড়না মাথায় প্যাঁচানো এক নারীকে পুলিশ সদস্যরা ধরে আছেন। হলুদ জামা পরা এক নারীকেও একটি ছবিতে দেখা যায়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ৩৭৬ বার শেয়ার হয়েছে।
ফেসবুকের একাধিক গ্রুপ, পেজ এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইল (১, ২, ৩, ৪, ৫) থেকেও একই দাবিতে ছবিগুলো পোস্ট করা হয়েছে।
দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ছবিগুলো রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখলে ভারত-ভিত্তিক সংবাদ সংগ্রহকারী সংস্থা ডেইলিহান্টের একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। ৪ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “১৫,০০০ টাকার পরিবর্তে মাত্র ৭,০০০ টাকা বেতন, তার ওপর আবার দুই মাস ধরে বেতন আটকে আছে। এর প্রতিবাদে যখন কল সেন্টারের কর্মীরা রাস্তায় নামলেন, তখন ‘বাবার’ পুলিশ তাঁদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিল।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “মুখ্যমন্ত্রীর হেল্পলাইন পরিষেবা ১০৭৬-এ কর্মরত কর্মীরা স্বল্প বেতন প্রদানের অভিযোগ তুলেছেন। নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে তারা মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিমুখে পদযাত্রা করছিলেন। সেই সময় পুলিশ বেশ কয়েকজন নারী কর্মীকে আটক করে।” এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবিগুলোর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর মিল রয়েছে।

এছাড়াও একাধিক (১,২,৩) প্রতিবেদনে ছড়ানো ছবিগুলো পাওয়া যায়, যেখানে কর্মীদের স্বল্প বেতনের অভিযোগে আন্দোলনের বিষয়টি উঠে এসেছে। এশিয়া নেট নিউজ হিন্দির ২ এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “বৃহস্পতিবার সকালে উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লক্ষ্ণৌতে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন মুখ্যমন্ত্রীর হেল্পলাইন ১০৭৬-এ কর্মরত কর্মীরা হঠাৎ প্রতিবাদ শুরু করেন। কর্মীদের অভিযোগ, তাদের নির্ধারিত বেতন দেওয়া হচ্ছে না এবং গত দুই মাস ধরে তাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে। প্রায় ২০০ জন কর্মী গোমতী নগরের সাইবার টাওয়ার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। তবে পুলিশ পথেই তাদের আটকে দেয়, যার ফলে সেখানে দীর্ঘক্ষণ ধরে তুমুল হট্টগোল ও উত্তেজনা চলতে থাকে।” এ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবি এবং ভিডিওর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর মিল পাওয়া যায়।
ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২ এপ্রিলে পোস্টকৃত একাধিক ছবির সঙ্গেও ছড়িয়ে পড়া ছবির মিল পাওয়া যায়। অধিকতর যাচাইয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যম দ্য লক্ষ্ণৌ টাইমস গত ২ এপ্রিল নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে একটি শর্টস প্রকাশ করেছে। এই শর্টসের বিবরণে লেখা ছিল, “উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী হেল্পলাইনে (১০৭৬) কর্মরত নারীদের বিক্ষোভ।” এই শর্টসের একাধিক দৃশ্যের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া সবগুলো ছবির হুবহু মিল রয়েছে। এই শর্টসেও লাল এবং হলুদ জামা পরিহিত নারীকে স্পষ্ট দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার ৪ এপ্রিলে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ভি-উইন প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী হেল্পলাইন ১০৭৬-এর কর্মীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলো আমলে নিয়েছেন। তিনি বেতন সংক্রান্ত সমস্যা এবং কর্মক্ষেত্রের অন্যান্য জটিলতাগুলো অবিলম্বে সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন।”
অর্থাৎ, লক্ষ্ণৌতে এক মাস আগে হওয়া বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের দৃশ্য ছড়াচ্ছে ভারতে মুসলিম নিগ্রহের দাবিতে।