জাতীয় সংসদে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানের প্রশংসা করেছেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এমন দাবিতে ইউটিউবে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্পাদিত এবং দাবিটিও মিথ্যা। শেখ হাসিনা নয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অবদান বর্ণনা করেছিলেন মির্জা ফখরুল।
ইউটিউবে ‘বিডি নিউজ টুডে’ নামের একটি চ্যানেল থেকে গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ একটি ভিডিও আপলোড করে লেখা হয়, “শেখ হাসিনার মতো উন্নয়ন আগামী শত বছরেও হবেনা; সংসদে আ. লীগকে নিয়ে ঝড় তুললেন মির্জা ফখরুল.! Awamilig।” (বানান অপরিবর্তিত)। ভিডিওর শুরুতে মির্জা ফখরুলকে বলতে শোনা যায়, “আমি বেশি কথা বলব না। আমি শুধু কয়েকটা কথা, যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আমরা দেখেছি যে, যখন তিনি সরকারে ছিলেন সেই সময় তিনি এমন কাজগুলো করেছেন, তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছেন।”
ভিডিওতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যদের “ফ্যাসিবাদের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান”, “ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র, এক সাথে চলে না” স্লোগান দিতে দেখা যায়। এরপর ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, “শেখ হাসিনাকে নিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে ঝড় তুললেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বক্তব্যে সংসদে বিরোধী দলের মধ্যে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা।” ভাষ্যকারের বিবরণ অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে নিয়ে তার কয়েকটি বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হলেও এবার তিনি সংসদে শেখ হাসিনার কয়েকটি কাজের প্রশংসা করেন। সেই প্রেক্ষিতেই সংসদে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তিনি শেখ হাসিনাকে “উন্নয়নের রোল মডেল” হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়। ভিডিওতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শাসনামলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দৃশ্য দেখা যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিওটি ১০ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।
ইউটিউবের একাধিক চ্যানেলে (১, ২, ৩) একই দাবি সংবলিত ভিডিও পোস্ট হতে দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে ডিসমিসল্যাব সময় টিভির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পায়। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ প্রকাশিত ভিডিওটির ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ও ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড থেকে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের অডিও মিলে যায়। তবে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যে তাকে ভিন্ন পোশাকে দেখা যায়। বক্তব্যে তাকে গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, নারী উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরতে শোনা যায়। ওই বক্তব্যে শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো কথা বলেননি তিনি।
ভিডিওতে বিরোধী দলের এমপিদের স্লোগানের দৃশ্য যাচাইয়ে স্টার নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে ১২ মার্চ প্রচারিত আরেকটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। শিরোনামে লেখা, ‘‘রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী দলের ওয়াক আউট।” ভিডিওটির শুরু থেকে ছড়িয়ে পড়া স্লোগানের দৃশ্যে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আব্দুল্লাহ আল আমিন-কে শনাক্ত করা গেছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর ভাষণের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের ৭৭ জন এমপি সংসদ ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি অধিবেশনে যোগ দিলে নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আব্দুল্লাহ আল আমিনের নেতৃত্বে “ফ্যাসিবাদের দোসর” আখ্যা সংবলিত পোস্টার প্রদর্শন ও স্লোগান শুরু হয়। পরে এই হট্টগোলের মধ্যে বিরোধী জোট কক্ষ ত্যাগ করে। অর্থাৎ, মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের সাথে এই হট্টগোলের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
অর্থাৎ, মির্জা ফখরুল সংসদে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছেন এবং তার বক্তব্যের ফলে সংসদে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। একাধিক ভিন্ন ঘটনার দৃশ্য কেটে সম্পাদনার মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বিবরণ দিয়ে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

