পার্বত্য চট্টগ্রাম ভেঙে ‘জুম্মল্যান্ড’ নামক নতুন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়েছেন অগাস্টিনা চাকমা- সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এমন দাবিতে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনে প্রচারিত দাবিগুলো সত্য নয়। ২০২৩ ও ২০২৬ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের দুটি ভিন্ন অধিবেশনে অগাস্টিনা চাকমার দেওয়া বক্তব্যে এমন কোনো দাবি করতে দেখা যায়নি।
অগাস্টিনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও দ্য সিএইচটি ইনডিজেনাস পিপলস্ কাউন্সিল অব কানাডার প্রতিনিধি (১, ২)। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী নারীদের অধিকার আদায়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে (১, ২) কথা বলে আসছেন। উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে ১৯৭২ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম রাজনৈতিক দল “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” গঠিত হয়।
ভিডিও ১
দেশবিদেশ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ১২ আগস্ট ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওর ভেতরে লেখা, “পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভেঙ্গে চাকমা উপজাতিদের জন্য জুম্মল্যান্ড নামক নতুন রাষ্ট্র গঠনের জাতিসংঘে দাবি অগস্টিনা চাকমার” (বানান অপরিবর্তিত)। পোস্টে লেখা ছিল, ‘‘আবারো জাতিসংঘে জোরালো বক্তব্য দিয়ে ঝড় তুললো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সরকারি কো/টা সু-বি-ধা নিয়ে পড়া সাবেক আদিবাসী শিক্ষার্থী অগষ্টিনা চাকমা। শুভ কামনা জানিয়ে আনন্দ মিছিল করলো, মিয়ানমারের উপজাতি নেতারা। ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময়, ৩ জন ভারতীয় চাকমা উপজাতি নাগরিক আটক” (বানান অপরিবর্তিত)। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ৬৮ হাজার বার দেখা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচশ বার শেয়ার করা হয়েছে।
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করলে জাতিসংঘের আদিবাসী–বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ওয়েবসাইটে ভিডিওটির সূত্র পাওয়া যায়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল প্রকাশিত ভিডিওর ২ ঘণ্টা ৪১ মিনিট অংশ থেকে অগাস্টিনা চাকমার পোশাক ও পারিপার্শ্বিক দৃশ্যের মিল পাওয়া যায়। দ্য সিএইচটি ইনডিজেনাস পিপলস্ কাউন্সিল অব কানাডার প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তিনি।

ভিডিওতে ইংরেজিতে তাকে যা বলতে শোনা যায়, তা বাংলা করলে দাঁড়ায়, “জুম্ম নারী ও শিশুরা প্রতিনিয়ত বিচারহীনতা, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির মুখোমুখি হচ্ছেন। জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) এবং নারীদের প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদের (CEDAW) সাধারণ সুপারিশ ৩৯ থাকা সত্ত্বেও এই অধিকারগুলো এখনো উপেক্ষিত। এভাবে আর কতদিন চলবে? সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা ছাড়া আর কত নারী ও শিশুকে এই ভয়াবহতা সহ্য করতে হবে? আমরা, জুম্ম জনগণ, পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষা করছি। কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি ছাড়াই বছরের পর বছর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও পরিবর্তনের মতো একই দাবির পুনরাবৃত্তি আর চলতে দেওয়া যায় না।”
এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, জুম্ম নারী ও শিশুদের সুরক্ষা ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে তাকে কথা বলতে দেখা গেছে। পুরো বক্তব্যে জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার কোনো দাবি করতে দেখা যায়নি তাকে।
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে অগাস্টিনা চাকমার বক্তব্য নিয়ে আইপি নিউজ বিডি নামের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে বক্তব্য প্রদান করেন অগাস্টিনা চাকমা। বক্তব্যে তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, সুরক্ষা ও অধিকারের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন।
ভিডিও ২
একই পেজ ১২ আগস্টে আরেকটি ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়, “জাতিসংঘে জু০ম্ম০ল্যা০ন্ডের রুপরেখা তুলে ধরলেন, সরকারি তহবিলের অনুদান ব্যবাহার করে, বিদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আদিবাসী শিক্ষার্থী অগষ্টিনা চাকমা। উল্লেখ্যা, অগস্টিনা চাকমা সন্তু লারমার নাতনি। তিনি ২০১৯ সালে মিয়ানমারের রাখাইনের নাগরিক পল্লব চাকমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পাশাপাশি, তিনি কানাডাতে মডেল হিসেবে কর্মরত। এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশের পর্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা উপজাতিদের অধিকার উন্ননয়ে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা –টা সু বি ধা র মাধ্যমে, ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন” (বানান অপরিবর্তিত)।
ভিডিওর ভেতরে লেখা, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সুবিধা ও বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সাহযোগিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর, জুম্মল্যান্ড রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুলল চাকমা শিক্ষার্থী” (বানান অপরিবর্তিত)। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিওটি ৭০ হাজার বার দেখা হয়েছে এবং পাঁচ শতাধিক বার শেয়ার করা হয়েছে।
কিওয়ার্ড সার্চ করলে জাতিসংঘের আদিবাসী–বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ওয়েবসাইটে ভিডিওটির সূত্র পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত ভিডিওর ১ ঘণ্টা ৪১ মিনিট অংশ থেকে অগাস্টিনা চাকমার পোশাক ও স্থানের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্য মিল পাওয়া যায়।

এই ভিডিওতে ইংরেজিতে দেওয়া তার বক্তব্য বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “আমি আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর জন্য ভূমির মালিকানার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ভূমির অধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। আর এই অধিকার ছাড়া টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) বসবাসরত আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতির প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য হলো, এই অঞ্চলের ভূমি, বন, পাহাড়, পুকুর, ছড়া ও ছোট নদী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই অঞ্চলের অধিকাংশ আদিবাসী ভূমি সরকারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে আনা প্রায় পাঁচ লাখ বাঙালি বহিরাগত বা বসতিস্থাপনকারীর হাতে দখল হয়ে গেছে।…গত সপ্তাহে এই ফোরামে বাংলাদেশের মাননীয় প্রতিনিধি দাবি করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য চলতি বছর ১ হাজার ৫৫৫টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ক্রমাগত তাদের ভূমি হারাচ্ছে এবং নিজেদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে।” এই বক্তব্যেও জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কোনো দাবি করেননি।
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২২তম অধিবেশনে বক্তব্য প্রদান করেন অগাস্টিনা চাকমা। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন।
অর্থাৎ, ২০২৩ এবং ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের দুটি ভিন্ন অধিবেশনে অগাস্টিনা চাকমার দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও কেটে তাতে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে প্রচার করা হচ্ছে। বক্তব্যগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের বিষয়ে আলোকপাত করা হলেও ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে নতুন কোনো রাষ্ট্র গঠনের দাবি করা হয়নি।

