
যুবদল নেতা ফ্যামিলি কার্ড দেবে বলে এক নারীকে ধর্ষণ করেছে, এমন দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, প্রচারিত ছবিতে থাকা নারী-পুরুষের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে নির্মিত। গুগল জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল সিন্থআইডির মাধ্যমে পরীক্ষায় দেখা যায়, ছবিগুলোতে সিন্থআইডির ওয়াটারমার্ক রয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ছবিতে থাকা নমুনা ফ্যামিলি কার্ডটিও অনেক আগে থেকেই ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। একাধিক প্রতিবেদনেও ভিন্ন নামে কার্ডটির ছবি পাওয়া যায়।
ফেসবুকে “বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ” নামের একটি পেজ থেকে গত ১৭ এপ্রিল একটি ছবি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “তারেকের সোনার ছেলে যুবদল নেতা ফ্যামিলি কার্ড দিবে বলে বিধবাকে ঘরে ডাকে। তারপর ঘুমের ওষুধ সেবন করিয়ে রাতভর ধর্ষন করে.! বিএনপি ওয়ালাদের চরিত্র মানেই ধর্ষকের মতো পবিত্র।” ছবিটিতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তার দুই পাশে দুইজন এবং পেছনে এক পুলিশ দাঁড়ানো। ছবির আরেক অংশে এক নারী এবং একটি নমুনা ফ্যামিলি কার্ড দেখা যায়।

ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল (১, ২, ৩) এবং ইনস্টাগ্রাম থেকে একই দাবিতে ছবিটি প্রচার করা হয়।
যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিতে থাকা ব্যক্তিটির পেছনে একটি বোর্ডে “বাংলাদেশ পুলিশ” সদৃশ কিছু লেখা দেখতে পাওয়া যায়। অক্ষরগুলোর সঙ্গে বাংলা বর্ণমালার মিল থাকলেও তা কোনো অর্থবোধক শব্দও তৈরি করে না। এমন ধরনের লেখা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি লেখার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এছাড়া, ছবির নিচের ডান কোণে গুগল জেমিনির লোগোর একাংশ দেখতে পাওয়া যায়। এআই শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন অনুযায়ী ছবিটির এ অংশটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

ছবিটির আরেক অংশে একটি নমুনা ফ্যামিলি কার্ড এবং একজন নারীকে কাঁদতে দেখা যায়। এ কার্ডটির নামের জায়গায় লেখা, “আমেনা খাতুন;” কার্ড নম্বর হিসেবে লেখা, “১২৩১২৩৪৫৬৮।” এ ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ে, কার্ডটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে দেখা যায়, একই কার্ড নম্বর তবে ভিন্ন নামে, “ফারিয়া পিংকি” কার্ডটি “উইকিমিডিয়া কমনস”-এ পাওয়া যায়। এছাড়া একাধিক (১, ২, ৩) সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে এ কার্ডটি দেখতে পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, সব প্রতিবেদনেই কার্ডটিতে থাকা নাম ফারিয়া পিংকি লেখা এবং প্রতিবেদনগুলো গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত। প্রতিবেদনে থাকা কার্ডে থাকা নম্বর এবং ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির কার্ডের মিল রয়েছে।
অধিকতর যাচাইয়ে ছবিগুলো গুগলের ‘সিন্থ-আইডি’ প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশেষায়িত শনাক্তকরণ টুলেও পরীক্ষা করা হয়। এই টুলটি ছবির ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বিশ্লেষণ করে ভিজ্যুয়াল ফলাফল প্রদর্শন করে থাকে। পরীক্ষায় ফ্যামিলি কার্ডের নারীর ছবিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। সেখানে টুলের শনাক্তকরণের আত্মবিশ্বাস মাত্রা বা ‘কনফিডেন্স লেভেল’ ছিল ‘উচ্চ’ (High) এবং ‘খুবই উচ্চ’ (Very High)।

ফলাফলের হিটম্যাপে ছবির যে অংশে ব্যক্তিটি হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় আছে, সে সিংহভাগ অংশকেই নীল রঙের গ্রিড দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবং ছবির আরেক ভাগে যেখানে নারীটি রয়েছেন, সেখানকার পুরো অংশটি নীল রঙের গ্রিড দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিন্থ-আইডির পরিভাষায় যার মানে হলো, ছবিগুলোর ওই নির্দিষ্ট অংশগুলোতে গুগল এআই-এর চিহ্ন শনাক্ত করা গেছে।
প্রসঙ্গত, ফরিদপুরে এক বিধবা নারীকে ফ্যামিলি ও বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে সুজন শেখ নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-১০)। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ বিষয়ে একাধিক (১, ২, ৩) সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য, এ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া এআই নির্মিত ব্যক্তির ছবির কোনো মিল পাওয়া যায়নি।