মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
Not a Jamaat Leader Feature

বাংলাদেশের জামায়াত নেতা নন, টেস্ট ফায়ারিং করছিলেন পাকিস্তানের অস্ত্র ব্যবসায়ী

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

৫ আগস্টের পর দেশে জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একজন জামায়াত নেতা মেশিনগানের টেস্ট ফায়ারিং করছেন, এমন দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি পাকিস্তানের পেশোয়ারভিত্তিক এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর আগ্নেয়াস্ত্রের টেস্ট ফায়ারের ভিডিও।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর এক্সে ‘ডেস্পারেট’ (Desperate) নামের একটি হ্যান্ডল থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনের দাবি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “জুলাইয়ের সহিংস অস্থিরতার জেরে, ৫ আগস্টের পর দেশটা সন্ত্রাসীদের অস্ত্র চর্চার প্রশিক্ষণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এমনকি একজন জামায়াত নেতাকে ব্যক্তিগতভাবে একটি মেশিনগান টেস্ট ফায়ার করতে দেখা গেছে।” ২০ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা টুপি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তি শাটারযুক্ত একটি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটি অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে গুলি ছুড়ছেন। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণার গান বাজছে।

এক্স ও ফেসবুক পোস্টে করা ভুয়া দাবির স্ক্রিনশট

একই ভিডিও ‘মুজিবীয় চেতনা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও ছড়ানো হয়। পোস্টে দাবি করা হয়, “ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কি হচ্ছে দেশে পাকিস্তানি এজেন্ট এন,সি,পি ও স্বাধীনতা বিরোধী জামাত শিবিরের জঙ্গি সন্ত্রাসী নেতারা পূর্বে দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণার কথা বারংবার বলে আসছিল এই অস্ত্রের মহড়া কি তারই বহিঃপ্রকাশ। এরা কি তাহলে দেশ ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছে।…”

এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া ছিল ১ হাজার ৮০০ বারের বেশি, শেয়ার করা হয়েছে অন্তত ১২০০ বার এবং দেখা হয়েছে ৭১ হাজারেরও বেশি বার।

সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওর কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। তাতে ইনস্টাগ্রামে s9xofficials নামের অ্যাকাউন্টে ৬ সেপ্টেম্বর আপলোড করা একটি ভিডিওর সঙ্গে হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, “Small 223 krinkof” (বানান অপরিবর্তিত), যা দিয়ে সম্ভবত অস্ত্রটিকে .২২৩ ক্যালিবারের একটি রাইফেল হিসেবে বোঝানো হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করলে অন্যান্য ভিডিওতেও (, , ) আগ্নেয়াস্ত্রের টেস্ট ফায়ার করতে দেখা যায়।

কিওয়ার্ড সার্চে ‘S9X Official’ এই নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল পাওয়া যায়। চ্যানেলের বিবরণীতে লেখা, “এসনাইনএক্স অফিসিয়ালে স্বাগতম- আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সচেতনতা, কারিগরী জ্ঞান বাড়ানো ও বিস্তারিত রিভিউর একটি পেশাদার ও শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম।”

একই নামের ইনস্টাগ্রামটিকটক অ্যাকাউন্টের বায়োতে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দেওয়া ছিল। ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে গেলে হোয়াটসঅ্যাপ বিজনেস অ্যাকাউন্টের বিবরণীতে নাম লেখা ছিল ‘সাঈদ খান’ (Said Khan), ক্যাটাগরি ‘গান রেঞ্জ’ (Gun Range) এবং বিবরণে লেখা, “এসনাইনএক্স অস্ত্র মালিক: সাঈদ খান (৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা)”। সেখানে বলা হয়েছে, শুধু লাইসেন্সধারীদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেন তারা। সেখানে পাকিস্তানের পেশোয়ারের কোহাট রোডের একটি শিল্প এলাকার ঠিকানা দেওয়া।

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে সাঈদ খান নামে একটি ব্যক্তিগত ফেসবুকইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায়। ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বায়োতে লেখা, “আমি অস্ত্র তৈরির প্রকৌশলী, ১৯৯০ সাল থেকে কাজ করছি। আগ্নেয়াস্ত্রে ৩১ বছরের অভিজ্ঞতা আছে আমার।” অ্যাকাউন্টটি ‘গান শপ’ ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত এবং ঠিকানা হিসেবে পাকিস্তানের পেশোয়ারের কথা উল্লেখ আছে।

সাঈদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি জানান, পাকিস্তানের পেশোয়ারেই থাকেন এবং তার নিজস্ব অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভিডিওগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, “আমরা এই ভিডিও বানাই, বন্দুক চেক করার জন্য ফায়ার টেস্ট করি। এটা তো সব কোম্পানিই করে থাকে। আমরা সেটা বৈধভাবেই করছি। আমাদের কোম্পানির লাইসেন্স রয়েছে।”

তার এই কোম্পানি নিয়ে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর ‘বুলেট স্কোপ’ (Bullet Scope) নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। যার শিরোনাম, “Visit the Weapons manufacturing company of meet up with Said Khan (Saeed khan)”। ভিডিওর বিবরণীতে সাঈদ খানকে একজন প্রসিদ্ধ অস্ত্র প্রস্তুতকারী হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি তার কারুকার্য ও উদ্ভাবনী নকশার জন্য পরিচিত।

অর্থাৎ, জামায়াত নেতার মেশিনগান টেস্ট ফায়ারিং করার দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি আসলে পাকিস্তানের পেশোয়ারভিত্তিক এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর আগ্নেয়াস্ত্র টেস্ট ফায়ারের ভিডিও, যার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই।

আরো কিছু লেখা