তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশুর বাবাকে জামায়াত আমীরের চেক দেওয়ার ছবিটি এআই নির্মিত

পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশুর বাবাকে জামায়াত আমীরের চেক দেওয়ার ছবিটি এআই নির্মিত

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান-এর একটি ছবি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। ছবিতে জামায়াত আমীরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শিশুর বাবাকে দেখা যাচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে— শিশুটির বাবাকে ১০ লক্ষ টাকার চেক দিয়েছেন জামায়াত আমীর। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। 

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ছবিতে দেখা যায়, ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি চেক নিয়ে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন সম্প্রতি পল্লবীর ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা। তার মুখোমুখি জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ছবিটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে— “আলোচিত রামিসার বাবাকে ১০ লক্ষ টা’কা চেক দিলেন জামাত আমির এবং বিচারের..” (বানান অপরিবর্তিত) 

ফ্যাক্টচেক পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশুর বাবাকে জামায়াত আমীরের চেক দেওয়ার ছবিটি এআই নির্মিত
এআই দিয়ে তৈরি ছবি শেয়ার করা ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

২০ মে রাত ৮টা ১৬ মিনিটে একটি পোস্ট এডিট করে নতুন এই ছবি ও ক্যাপশন যুক্ত করা হয়। তবে সেটি পরদিন (২১ মে) দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে আবারও বদলে ফেলা হয়। এখন পর্যন্ত পোস্টটি নয় হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। 

পোস্টে একজন মন্তব্য করেছেন, “আমির মহান। মজলুম এর পাশে দাঁড়ানোর কাজটা কয়জনে করে থাকে।” আরেকজন লিখেছেন, “এই টাকাটা কোন কারণে দেয়া হল, বিচারের কথা যাতে মেয়ের বাবা না বলে না অন্য কিছু।” 

এই ছবি ও ক্যাপশন পোস্টটি থেকে সরিয়ে ফেলা হলেও একই ছবি একই ক্যাপশনসহ পোস্ট করা হয় আরেকটি প্রোফাইল থেকে। ১ ঘণ্টা ৯ মিনিট পর পোস্ট এডিট করে নতুন এই ছবি ও ক্যাপশন যুক্ত করা হয় ২০ মে রাত ৯ টা ২৫ মিনিটে।  

পোস্টটি এ পর্যন্ত দুই হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “এখানে বিচার হওয়ার আগেই এই মুহূর্তে টাকা কেন।” আরেক ব্যবহারকারীও একমত প্রকাশ করে লিখেছেন, “এই টাকাটা কিসের জন্য আর উনি এই টাকাটা নেই কোন হিসেবে”। 

পর্যবেক্ষণে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে একাধিক অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের চেকে লোগোটি চেনা গেলেও, তার পাশে থাকা বাংলা এবং ইংরেজি লেখাগুলো সম্পূর্ণ অস্পষ্ট এবং বিকৃত, যা এআই-জেনারেটেড ছবির একটি বড় লক্ষণ। তাছাড়া চেকটি ধরে থাকা ব্যক্তির হাতের আঙুলগুলোর বিন্যাস অস্বাভাবিক। এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে, এই ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রবল।

ফ্যাক্টচেক পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশুর বাবাকে জামায়াত আমীরের চেক দেওয়ার ছবিটি এআই নির্মিত
হাইভ মডারেশন টুলের বিশ্লেষণ।

তাছাড়া ছবিতে থাকা দৃশ্য, ব্যক্তিদের অবস্থান, অঙ্গভঙ্গি, পোশাকের ধরণ ও রং ভিন্ন এক ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের পর শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল আব্দুল বাতেন (অব.)। এ ঘটনার ২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই নেতার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে। 

দেখা যায়, দুইজনের পরিহিত পাঞ্জাবির রং ও ডিজাইনও একই। উক্ত ভিডিও-এর ৫৬ সেকেন্ডের দৃশ্যটি ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সংসদ সদস্য কর্নেল আব্দুল বাতেন (অব.)-এর স্থলে জামায়াত আমীরের ছবি যুক্ত করা হয়েছে। মূল ঘটনায় জামায়াতের আমীর ছিলেন না এবং নিহত শিশুর বাবার হাতে কোনো চেক ছিল না। 

এ ছাড়াও হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় বাংলাদেশের কোনো সংবাদমাধ্যমেও জামায়াত আমীরের অর্থ সহায়তার কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। বরং একাধিক প্রতিবেদনের সূত্রমতে, হজ পালনের উদ্দেশে বুধবার (২০ মে) ঢাকা ছেড়েছেন বাংলাদেশ ডা. শফিকুর রহমান। সেদিন দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

ফ্যাক্টচেক পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশুর বাবাকে জামায়াত আমীরের চেক দেওয়ার ছবিটি এআই নির্মিত
এআইয়ের সাহায্যে সম্পাদিত ছবি (বামে) এবং মূল ছবি (ডানে)।

অর্থাৎ, পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শিশুর বাবাকে জামায়াত আমীরের ১০ লক্ষ টাকার চেক দেওয়ার ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।  

প্রসঙ্গত, গত ১৮ মে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে ২০ মে (বুধবার) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ঘটনার মূল আসামি সোহেল রানা (৩৪)। 

আরো কিছু লেখা