
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি চিঠির ছবি দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, দেশটিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে দলটি। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতও এক পোস্টে তাদের নামে জাল চিঠি ছড়ানোর নিন্দা জানিয়ে বিদ্বেষমূলক প্রচার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড গত ২১ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতে চলমান আন্দোলনের সমর্থনে জামায়াতে ইসলামীর একটি চিঠির ছবি প্রচার করে। প্রতিবেদনে রিপাবলিক লিখেছে— “নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছাত্র আন্দোলনের প্রতি ‘পূর্ণ ও শর্তহীন সংহতি’ প্রকাশ করে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈদেশিক হস্তক্ষেপের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।”

একই ছবি প্রচার করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজ এক্স লাইভ ও নিউজ এইটিন। নিউজ এক্স লাইভ তাদের ৪ মিনিট ১০ সেকেন্ডের ভিডিও প্রতিবেদনের বর্ণনায় লিখেছে, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভারতে চলমান সিজেপি ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাদের বিবৃতি এই আন্দোলন ও বহিরাগত পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।”
নিউজ এইটিন-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী কি দিল্লির আন্দোলনকারীদের ‘সমর্থন পত্র’ পাঠিয়েছে? গোয়েন্দা সূত্রের এক্সক্লুসিভ তথ্য।” তবে, প্রতিবেদনে লেখা ছিল, গোয়েন্দাসংস্থাগুলো চিঠিটির সত্যতা যাচাই করে দেখছে।
তেলুগুভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মাইইন্ডমিডিয়া তাদের ফেসবুক পেজে চিঠির ছবিটি পোস্ট করে লিখেছে, “বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী ভারতে চলমান সিজেপি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।” গণমাধ্যম ও জনসংযোগকেন্দ্র ভিএসকে (বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র) তেলেঙ্গানার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “ককরোচ পার্টিকে ‘বাংলাদেশের সন্ত্রাসী সংগঠনের’ সমর্থন।” প্রতিবেদনে জামায়াতের ওই চিঠি যোগ করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাবি করা কলকাতা টোয়েন্টিফোর সেভেন তাদের ফেসবুক পেজে একটি কার্ড পোস্ট করে। কার্ডে লেখা, “খুলে গেল সোনম-আরশোলাদের মুখোশ! ছাত্র আন্দোলনকে চিঠি লিখে সমর্থন জামাতের।” মন্তব্যে মূল প্রতিবেদনের লিংক দেওয়া ছিল। ২১ জুলাই প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের শিরোনামেও একই ভাষ্য, শুধু আন্দোলনের আগে “তথাকথিত” যোগ করা হয়েছে।
এই আন্দোলনে “বিদেশ অর্থায়ন ও বিদেশি উসকানি প্রমাণিত” উল্লেখ করে প্রতিবেদনে লেখা, “সেই সন্দেহকে সত্য প্রমাণিত করে জামাতের এই চিঠিতে এবার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে এই আরশোলাদের এই তথাকথিত ছাত্র আন্দোলনের আগুনে নিজেদের রুটি সেঁকতে চাইছে জামাত এবং তারা আরও সন্দেহ করছে এর পিছনে আইএসআই যোগ থাকাও অসম্ভব নয়।”

একই ছবি ফেসবুক ছাড়াও ইনস্টাগ্রাম ও এক্স-এর (১, ২, ৩, ৪) একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত ভয়েজ অব হিন্দুজ নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট ২১ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৮ মিনিটে ছবিটি পোস্ট করে। পোস্টে লেখা হয়েছে, “ব্রেকিং: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। ভারতের সব হিন্দুর উচিত এই কথিত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। তা না হলে, আজ বাংলাদেশে হিন্দুরা যে ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি বলে দাবি করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে ভারতের হিন্দুদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। খুব দেরি হওয়ার আগেই জেগে উঠুন!”
পর্যবেক্ষণে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে কিছু অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। চিঠির লোগোতে দলের নামের বানান ভুল। তাছাড়া এতে প্রদর্শিত লোগো জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান লোগোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। চিঠিতে কোনো অফিসিয়াল বা নিবন্ধিত ঠিকানা নেই, কোনো স্মারক বা নম্বর দেওয়া নেই— যা সাধারণত এই দলটির ইস্যুকৃত অফিসিয়াল চিঠিপত্রে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পুরোনো চিঠির সঙ্গে এর তুলনা করে দেখা গেছে, এর ফরম্যাট ও প্যাডের ডিজাইন ভিন্ন।

এছাড়াও চিঠিতে লেখার একটি অংশে কিছু বিকৃতি ছবিটিকে এআই-সৃষ্ট বা ডিজিটালি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। একাধিক এআই কন্টেন্ট শনাক্তকারী টুল দিয়ে ছবিটি যাচাই করে ডিসমিসল্যাব। সাইটইঞ্জিন একে ৯৯% এআই বলে শনাক্ত করে। ওয়াজ ইট এআই জানায়, এই ছবিটি বা এর কিছু অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এআই শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন জানায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৩.৭%।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট কিংবা ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভারতে ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে কোনো চিঠি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে দলটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই জাল চিঠির নিন্দা জানিয়ে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে তাদের এক্স হ্যান্ডলে। ভারতে চলমান এই আন্দোলনের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে তারা জানায়, “কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত ও দৃঢ় নীতি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আমাদের অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি এই নীতি, এবং আমরা কখনোই এর ব্যত্যয় ঘটাইনি। তাই জাল চিঠিতে উল্লিখিত অবস্থান আমাদের প্রতিষ্ঠিত নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।”
অর্থাৎ, ভারতে চলমান ছাত্র আন্দোলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চিঠি দিয়ে সমর্থনের দাবিটি সঠিক নয়। ছবিতে দেখতে পাওয়া চিঠিটি এআই দিয়ে তৈরি।