মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
jagoron indonesia ai feature

ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরির ফের অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে এবং ছাই ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠেছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি গত ৫ সেপ্টেম্বরে হওয়া প্রকৃত অগ্ন্যুৎপাতের দৃশ্য নয়; এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি।

গত ৭ সেপ্টেম্বর অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগরণ (Jagoron)-এর ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়া থেকে আতশবাজির মতো কমলা-হলুদ রঙের লাভার ফোয়ারা আকাশে উঠছে, নিচে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ বাড়ি-গাড়ি এবং রাস্তায় মানুষজন দৌড়াদৌড়ি করছে। ভিডিওর পেছনে ভয়েসওভারে একজনকে বলতে শোনা যায়, “ও মাই গড! ইট’স ইরাপ্টিং,” সেই সঙ্গে মানুষের চিৎকারের শব্দও শোনা গেছে। পোস্টে দাবি করা হয়, “ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরির ফের অগ্নুৎপাত, ছাই উঠল ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায়।”

দৈনিক আনন্দবাজারের সংবাদে এআই ছবির ব্যবহার (বামে); সংবাদমাধ্যম জাগরণের ফেসবুক পোস্টে এআই ভিডিও (ডানে)

এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ভিডিওটি ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে, পোস্টে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি প্রতিক্রিয়া ছিল, শেয়ার হয়েছে নয় শতাধিকবার।

একই দাবিতে ফেসবুকের একাধিক পেজ থেকে (, ) ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা এবং কলকাতা নিউজ (Kolkata News) একই ভিডিও নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে; কলকাতা নিউজ ভিডিওটির জুম-ইন করা অংশ প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয় আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি থেকে আকাশে ছাই ও জ্বলন্ত লাভা লাফিয়ে উঠছে। আনন্দবাজার জানিয়েছে, তারা ভিডিওর “সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।” এ ছাড়া ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াও তাদের একটি প্রতিবেদনে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওর দৃশ্য ব্যবহার করে।

সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওর কিফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ মেক্স (Mexx) নামের একটি অ্যাকাউন্টে হুবহু একই ভিডিওর সন্ধান পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “গতকাল আনাক ক্রাকাতাওয়ে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে…।” পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এই অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বেশিরভাগ ভিডিওই (, , ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। 

হাইভ মডারেশনের ফলাফল

অধিকতর যাচাইয়ে এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯ শতাংশ। তবে ভিডিওটি ঠিক কোন সফটওয়্যার বা মডেল দিয়ে, নাকি বাস্তব কোনো ফুটেজ পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিতে প্রকৃতপক্ষেই বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, যা ২০১৮ সালের পর সবচেয়ে তীব্র। ডারউইনভিত্তিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাবে, ছাইয়ের একটি স্তর ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছে বান্তেন, লাম্পুং ও বেংকুলু প্রদেশ, সুন্দা প্রণালি এবং সুমাত্রার পশ্চিমে ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

অর্থাৎ, ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি বাস্তব নয় বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। কিন্তু সংবাদমাধ্যম সেটা প্রকৃত ঘটনার প্রতিবেদনে ব্যবহার করছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) “প্যারিস চার্টার অন এআই অ্যান্ড জার্নালিজম” নীতিমালায় সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দর্শক-পাঠকদের প্রকৃত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করা গণমাধ্যমের কর্তব্য।

আরো কিছু লেখা