মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক সিরিয়ায় ইসরায়েলি এজেন্ট আটকের দাবিতে ছড়াল নেদারল্যান্ডসের মহড়ার ভিডিও

সিরিয়ায় ইসরায়েলি এজেন্ট আটকের দাবিতে ছড়াল নেদারল্যান্ডসের মহড়ার ভিডিও

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, সিরিয়ায় অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি এজেন্টকে আটক করেছে তুরস্ক। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি আসলে নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরে ডাচ বিমানবাহিনীর একটি মহড়ার দৃশ্য; এটি সিরিয়ার কোনো দৃশ্য নয়।

গত ৫ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে ‘লাইট নিউজ বিডি’ (lightnewsbd.com) নামের একটি পেজ থেকে ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশে দুটি হেলিকপ্টার উড়ছে, একটি হেলিকপ্টার থেকে কয়েকজন সেনাসদস্য দড়ি বেয়ে নিচে নামছেন। ভিডিওর ওপরে লোকেশন হিসেবে “সিরিয়া” লেখা ছিল এবং ক্যাপশনে লেখা, “সিরিয়ায় অভিযান চালিয়ে ইসরাইলি এজেন্টকে আটক করেছে তুরস্ক!” (বানান অপরিবর্তিত)।

ফ্যাক্টচেক সিরিয়ায় ইসরায়েলি এজেন্ট আটকের দাবিতে ছড়াল নেদারল্যান্ডসের মহড়ার ভিডিও
ভুয়া দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ফেসবুক ভিডিওর স্ক্রিনশট।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটিতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ প্রতিক্রিয়া পড়েছে, ১৭১ বার শেয়ার হয়েছে এবং ৬২ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।

একই দাবিতে ফেসবুকের আরও একাধিক পেজ থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় (, )।

সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওর কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে ইনস্টাগ্রামে স্যোরডফটো (sjoerdphoto) ও ইলেভেন-ইঞ্জিনিয়ার-স্পেক-টাস্ক (11engr.spec.task) নামের দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে ৩০ আগস্ট পোস্ট করা ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, রটারডামে দুটি চিনুক ও দুটি কুগার হেলিকপ্টার নিয়ে পরিচালিত মহড়ার দ্বিতীয় অংশ। এই মহড়ায় চিনুক থেকে সেনাসদস্যরা দড়ি বেয়ে নামার পর হেলিকপ্টারটি চলে যায়। ওদিকে কুগার থেকে সেনারা ভবনের ছাদে নেমে ওপরের দিক থেকে ভেতরে প্রবেশ করেন। পোস্টে দৃশ্যের অবস্থান হিসেবে দেওয়া আছে নেদারল্যান্ডসের আইসেলমন্ড, জুইড-হলান্ড।

এই দুই অ্যাকাউন্টের আগের একটি ভিডিও পোস্টে (প্রথম অংশ) জানানো হয়, গত ২৭ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টার দিকে রটারডামে একটি পুরোনো বৃদ্ধাশ্রম ঘিরে ডাচ বিমানবাহিনীর ৭টি হেলিকপ্টার নিয়ে জিম্মি উদ্ধারের একটি মহড়া চালানো হয়, যাতে ৪টি পরিবহন হেলিকপ্টার সেনাদের দড়ি বেয়ে ভবনে নামায় এবং ৩টি অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে। দুটি পোস্টের কোনোটির ক্যাপশনেই সিরিয়া, ইসরায়েল বা তুরস্কের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

স্যোরডফটো এবং ইলেভেন-ইঞ্জিনিয়ার-স্পেক-টাস্কের ইনস্টাগ্রাম পোস্টের স্ক্রিনশট।

অধিকতর নিশ্চিত হতে মহড়ার দ্বিতীয় অংশে থাকা একটি ভবনের ভিডিও ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। সার্চ থেকে জানা যায়, দৃশ্যটি রটারডাম-আইসেলমন্ডের খুনা টান সড়কের। অধিকতর যাচাইয়ে ডিসমিসল্যাব গুগল স্ট্রিট ভিউতে রটারডামের খুনা টান সড়কের দৃশ্য মিলিয়ে দেখে। এতে তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে মিল পাওয়া যায়। প্রথম মিল, রাস্তার পাশের খুঁটির ওপর বসানো একটি বড় বিলবোর্ড কাঠামো। ভাইরাল ভিডিওর ফ্রেমে খুঁটির ওপর থাকা এই ধাতব কাঠামোর অংশবিশেষ দেখা যায়, স্ট্রিট ভিউতেও ঠিক একই খুঁটির ওপর একই আকৃতির সাইনবোর্ড দেখা যায়। দ্বিতীয় মিল, রাস্তার মাঝের ডিভাইডারে বসানো একটি স্ট্রিট লাইট ও তার পাশে অল্প দূরত্বে হলুদ-সাদা রঙের একটি ছোট সাইনবোর্ড, যাদের মধ্যকার দূরত্ব ও অবস্থান ভিডিও এবং স্ট্রিট ভিউ উভয় দৃশ্যেই একই রকম। তৃতীয় মিল, গাছের সারির ওপর দিয়ে দূরে দেখা যাওয়া একটি বহুতল আবাসিক ভবন, যার রং, উচ্চতা ও ব্যালকনির বিন্যাস ভিডিওতে ঝাপসাভাবে হলেও স্ট্রিট ভিউতে একই দিক থেকে দেখা ভবনটির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

অর্থাৎ, সিরিয়ায় অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি এজেন্টকে আটকের দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি আসলে নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরে ডাচ বিমানবাহিনীর একটি সামরিক মহড়ার দৃশ্য।

আরো কিছু লেখা