নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক উড়তে পারেন তা দেখাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেছেন

“উড়তে পারি” প্রমাণ করতে গিয়ে পুরোহিতের মৃত্যুর দাবিটি ভিত্তিহীন

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

এক ব্যক্তির খাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভিডিও শেয়ার করে সম্প্রতি একাধিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, ওই পুরোহিতের মৃত্যু হয়েছে তিনি উড়তে পারেন, তা প্রমাণ করতে গিয়ে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, দাবিটি ভিত্তিহীন। একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে, গভীর খাদে পড়ে ৪৯ বছর বয়সী পুরোহিত পাপাইয়া স্বামীর মৃত্যু হয়।

অনন্তপুর জেলার সিঙ্গানামালা মণ্ডলের গাম্পামাল্য স্বামী পাহাড়ের চূড়ায় তিনি বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করছিলেন। এই আচার চলাকালে ভারসাম্য হারিয়ে পাহাড় থেকে ৪০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যান। তিনি উড়তে পারেন, এমন দাবি করেছেন বা উড়তে পারেন তা দেখাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, এমন কিছু কোনো সংবাদ প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়নি।

সংবাদমাধ্যম “দূরবীন নিউজ” এর ফেসবুক পেজ থেকে গত ৩০ জুন একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ““আমি উড়তে পারি” প্রমাণ করতে গিয়ে মৃ**ত্যু পুরোহিতের!।” ১ মিনিট দৈর্ঘ্যের ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন পুরোহিত হাতে একটি ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে খাদের দিকে এগিয়ে গেলে পা হড়কে খাদের নিচে পড়ে যান। ভিডিওর এক অংশে বলা হয়, “আমার অলৌকিক ক্ষমতা আছে, আমি উড়তে পারি, এমনই এক চাঞ্চল্যকর দাবি করে ভক্তদের সামনে প্রমাণ করতে গিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে মর্মান্তিক মৃত্যু হলো এক পুরোহিতের।” 

এছাড়াও সংবাদমাধ্যম “এইদিন এইসময়” এর ফেসবুক পেজ থেকেও একই দাবিতে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। এই ভিডিওর ক্যাপশনেও বলা হয়, “’আমি উড়তে পারি’—দাবি প্রমাণেই প্রা’ণ গেল হিন্দু পুরোহিতের।” একাধিক ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল (,,) এবং ইনস্টাগ্রামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়।  

ফ্যাক্টচেক উড়তে পারেন তা দেখাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেছেন
ভিত্তিহীন দাবিতে ছড়ানো ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম পোস্টের স্ক্রিনশট।

সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির কিফ্রেম ধরে সার্চ করলে ২০২১ সালে আগস্টে প্রকাশিত টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “ভাইরাল ভিডিও: পূজা করার সময় পাহাড় থেকে পড়ে পুরোহিতের মৃত্যু।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “এক মর্মান্তিক ঘটনায়, ৪০ ফুট গভীর খাদে পড়ে ৪৯ বছর বয়সী এক পুরোহিতের মৃত্যু হয়েছে। অনন্তপুর জেলার সিঙ্গানামালা মণ্ডলের গাম্পামাল্য স্বামী পাহাড়ের চূড়ায় তিনি বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করছিলেন। এই বিশেষ আচার চলাকালে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পাহাড় থেকে ৪০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যান। পুরোহিতের এই আকস্মিক পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি অন্তত ১০০ জন ভক্ত চোখের সামনে ঘটতে দেখেন।” 

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, “জেলার সিঙ্গানামালা মণ্ডলের আনন্দরাওপেতা গ্রামের গাম্পামাল্য স্বামী মন্দিরের পুরোহিত, যিনি তাঁর দুঃসাহসিকতার জন্য পরিচিত ছিলেন, শনিবার সকালে মন্দিরের চূড়া থেকে পা পিছলে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। নিহত পুরোহিত আপ্পা পাপাইয়া (৪৯) প্রতিবছর ধর্মীয় আচার পালনের অংশ হিসেবে একাধিকবার প্রায় খাড়া পাথুরে পাহাড়ের তেলমাখা কিনারা বেয়ে উপরে উঠতেন।” পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

ডেকান ক্রনিকলের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, “ভক্তরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেও পুরোহিতকে বাঁচাতে পারেননি, কারণ তার শরীরে একাধিক হাড় ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। পুরো ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভক্তরা স্মৃতিচারণ করে জানান যে, ওই পুরোহিত দীর্ঘ দশ বছর ধরে মন্দিরে পূজা করছিলেন এবং কোনো রকম সাহায্য বা অবলম্বন ছাড়াই নিচে নেমে আসতেন।” 

ফ্যাক্টচেক উড়তে পারেন তা দেখাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেছেন
মূল ঘটনা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।

একাধিক (,) ভারতীয় প্রতিবেদনেও ঘটনাটিকে পূজা করতে গিয়ে পুরোহিত পড়ে গেছেন হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। 

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালেও পুরোহিত উড়তে পারেন প্রমাণ করতে গিয়ে মারা গেছেন, এরকম ভিত্তিহীন দাবি ছড়াতে দেখা গেছে। বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে (,,) পাওয়া যায় এ দাবিতে। সম্প্রতি গত ২৮ জুন এক্সে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তুর্কি ভাষাতেও এ দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। 

অর্থাৎ, পুরোহিত উড়তে পারেন, এমন দাবি করেছেন বা উড়তে পারেন তা দেখাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, এমন দাবি ভিত্তিহীন।

আরো কিছু লেখা