তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ভিন্ন ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ তুরাগে নিহত “ছাত্রলীগ কর্মী” বলে প্রচার

ভিন্ন ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ তুরাগে নিহত “ছাত্রলীগ কর্মী” বলে প্রচার

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

নরসিংদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের এক ভিডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। দাবি করা হয়, ঢাকার আশুলিয়ায় নিহত “ছাত্রলীগ কর্মীর” মধ্যে একজনে মরদেহ এটি। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, দাবিটি সঠিক নয়। 

১ মিনিট ৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে রাস্তার পাশে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির একটি জটলা দেখতে পাওয়া যায়। ভিডিও-এর পেছনে একজনকে বলতে শোনা যায়, “ফায়ার সার্ভিস এলাকা থেকে অর্থাৎ নরসিংদী থেকে মদনপুর যেতে যে রাস্তাটি রয়েছে, অর্থাৎ এই রাস্তায় অর্থাৎ ফায়ার সার্ভিস থেকে এর কিছুদূর সামনে যেতেই অথবা মারকাজ মসজিদের পাশে যেখানে ময়লা ফেলে রাখা হয়, ঠিক এর পাশে যে ধইঞ্চা খেত, এই ধইঞ্চা খেতের এখানেই কিন্তু একটি টগবগে যুবকের মরদেহ এখানে পড়ে আছে।”

ভিন্ন ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ তুরাগে নিহত “ছাত্রলীগ কর্মী” বলে প্রচার
উদ্ধার হওয়া মরদেহ নিয়ে ভুয়া দাবিতে প্রচারিত পোস্টের স্ক্রিনশট।

পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “ঢাকার আশুলিয়ায় বিএনপি”র সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত ৭ ছাত্রলীগ কর্মীর মধ্যে একজন #দিগন্তর লা/শ আজ উদ্ধার হয়েছে নরসিংদীর মাধবদী থেকে! এই নিয়ে উদ্ধার করা হলো পাঁচটি মরা দেহ আরো দুইজন নিখোঁজ রয়েছে!” পোস্টটি এ পর্যন্ত ৬১ বার শেয়ার করা হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার বারের বেশি। মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “আর কত লাশ চায় অবৈধ সরকার”। আরেকজন লিখেছেন, “তুরাগ গনহত্যার বিচার বাংলার মাটিতেই হবে ইনশাআল্লাহ।”

একই ভিডিও একই ক্যাপশনে পোস্ট করা হয় আরও একাধিক অ্যাকাউন্ট (,) থেকে। এর মধ্যে একটি পোস্ট এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৯ বার শেয়ার করা হয়েছে। আরেকজন একই ভিডিও শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছেন, “তুরাগ নদী ট্রাজিতে নিহত ৭ ছাত্রলীগ কর্মীর মধ্যে একজন দিগন্তর লা/শ আজ উদ্ধার হয়েছে নরসিংদীর মাধবদী থেকে…… এই নিয়ে উদ্ধার করা হলো পাঁচটি ম,রা দে,হ, আরো দুইজন নিখোঁজ রয়েছে” (বানান অপরিবর্তিত)।

কি-ওয়ার্ড সার্চে ভিডিওটির মূল উৎস খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। দেখা যায়, গত ২৯ জুন সকাল ৯টায় একটি রেকর্ডেড লাইভ পোস্ট করা হয়। সেই ১২ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ভিডিও থেকে ১ মিনিট ৮ সেকেন্ড কেটে নিয়ে ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হয়েছে। মূল ভিডিওতে মৃত ব্যক্তির ছাত্রলীগ হওয়ার কোনো দাবি করা হয়নি। এই ভিডিও ছাড়াও একই ফেসবুক পেজ থেকে ৩ মিনিট ৪ সেকেন্ডের অপর একটি ভিডিও পাওয়া যায়।

তাছাড়া ভিডিও থেকে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন (,) পাওয়া যায়। প্রতিবেদন ও মূল উৎসের ভিডিওতে থাকা ছবির একাধিক স্থাপনা, রাস্তা, গাছপালা ও ব্যক্তি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। 

গত ২৯ জুন প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নরসিংদীর মাধবদীতে সড়কের পাশে থাকা ময়লার স্তূপ থেকে দিগন্ত (২০) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ২৯ জুন (সোমবার) সকালে নরসিংদী-মদনপুর সড়কের মাধবদীর খরমদী এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। 

ভিন্ন ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ তুরাগে নিহত “ছাত্রলীগ কর্মী” বলে প্রচার
ভিডিও-এর মূল উৎস থেকে প্রচারিত পোস্টের (বামে) ও সংবাদ প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

একাধিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, তিনি পরিবার নিয়ে মাধবদীর বিরামপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। গত ২৮ জুন (রবিবার) বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। এদিকে, গত ২২ জুন আওয়ামী লীগের একটি মিছিলের পর তুরাগ নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধার শুরু হয় ২৪ জুন থেকে। 

অর্থাৎ, দিগন্ত নামে নরসিংদী থেকে যার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তাকে তুরাগে ২২ তারিখের ঘটনায় নিহত ছাত্রলীগ কর্মী বলে প্রচারিত দাবিটি ভুয়া। 

প্রসঙ্গত, নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগের দিন (২২ জুন), ঢাকার আশুলিয়ার তুরাগ নদের ট্রলার ঘাটে নৌকা নিয়ে একটি মিছিল বের করেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা ধাওয়া করলে মিছিলকারীরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই ঘটনার পর থেকে নদী থেকে লাশ উদ্ধার করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

আরো কিছু লেখা