মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Factcheck India Rally Modi Protest

দিল্লিতে মোদীর বাড়ির সামনে মুসলিমদের বিক্ষোভ নয়, ভিডিওটি উত্তরপ্রদেশে এক জনসভার

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

রাতের অন্ধকারে জনসমুদ্রে হাজারো মোবাইলের আলো জ্বলে থাকার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে রাতে দিল্লিতে লক্ষ মুসলিম রাজপথে নেমেছেন। আরেকটি পোস্টে একই ভিডিও ব্যবহার করে দাবি করা হয়, দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সামনের দৃশ্য। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, দৃশ্যটি দিল্লির নয়, বরং এটি ভারতের উত্তরপ্রদেশের একটি রাজনৈতিক জনসভার।

পিপলস নিউজ’ (Peoples News) নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। পোস্টে এবং ভিডিওর ভেতরে বাংলায় লেখা, “ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ নিয়ে রাতে দিল্লিতে লক্ষ মুসলিম রাজপথে।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া এসেছে ৫৮ হাজারের অধিক এবং শেয়ার হয়েছে ৬ হাজারের বেশি বার।

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) গত ১৮ জুলাই উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভার ভিডিও ভিন্ন ঘটনার বলে উল্লেখ করা একাধিক পোস্টের স্ক্রিনশট।

একই ভিডিও ‘ভিপি সাদিক কায়েম’ নামের একটি গ্রুপে পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “দিল্লিতে কসাই মোদীর বাড়ির সামনে নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার স্লোগান দিচ্ছে।” এই পোস্টে প্রতিক্রিয়া এসেছে দুই হাজার ৩০০-র বেশি এবং শেয়ার হয়েছে আট শতাধিক বার।

ফেসবুক (,,) ছাড়াও ইউটিউব (,,) এবং ইনস্টাগ্রামে (,) একই ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। 

ভিডিওর কয়েকটি কি-ফ্রেম রিভার্স সার্চ করে ও প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যম এক্সে একই ঘটনার দুটি ভিন্ন ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। একটি ভিডিও অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) ‘ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট (@aimim_national)’ থেকে এবং অন্যটি ‘আনুম সাঈদ (@AnumSaeed497645)’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। আনুম সাঈদের পোস্টে দৃশ্যের বর্ণনায় লেখা, “উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে ওয়াইসির প্রভাব।”

ডিসমিসল্যাব ‘দিল্লির’ ঘটনা দাবিতে ছড়ানো ভিডিও এবং এক্সে পাওয়া সাহারানপুরের ভিডিও দুটি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে। প্রথম ভিডিওর শুরুতে জনতার মাথার ওপর ভারতের একটি জাতীয় পতাকা উড়তে দেখা যায়। আনুম সাঈদের পোস্ট করা ভিডিওতেও ঠিক একই জায়গায়, একই ভঙ্গিতে দেশটির জাতীয় পতাকা উড়তে দেখা গেছে।

ছড়ানো ভিডিওর ২১ সেকেন্ডে দূরে আলোকসজ্জা করা একটি মঞ্চ দেখা যায়। ‘আনুম সাঈদে’র ভিডিওর প্রথম দৃশ্যেই হুবহু একই রকম একটি মঞ্চ দেখা যায়, যেখানে “ওয়েলকাম বস (WELCOME BOSS)” লেখা ছিল।

ভুল দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর সঙ্গে মূল ঘটনার ভিডিওর বিভিন্ন দৃশ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

এছাড়া দাবির ভিডিওর শুরুর দিকে একজনকে খুঁটি বা কাঠামো ধরে জনতার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, পরনে লালচে রঙের পোশাক। আনুম সাঈদের ভিডিওর ৪৭ সেকেন্ডের কাছাকাছি সময়ে অনুরূপ ভঙ্গিতে একজনকে লালচে রঙের পোশাকে একটি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। 

ভুল দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর ২১ সেকেন্ডে জনসমাগমের ভেতরে একটি পতাকা দেখা যায়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওই পতাকার সঙ্গে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) পতাকার মিল রয়েছে। 

ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ভিন্ন হলেও এই দৃশ্যগত মিলগুলো থেকে বোঝা যায়, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি মূলত সাহারানপুরে আয়োজিত ওই জনসভারই অন্য একটি কোণ থেকে ধারণ করা দৃশ্য।

পরবর্তীতে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদন (,,) থেকে জানা যায়, গত ১৮ জুলাই উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের চিলকানা রোডে এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি একটি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন। ভিডিওটি মূলত সেই জনসভার।

অর্থাৎ, ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে আয়োজিত একটি রাজনৈতিক জনসভার ভিডিওকে দিল্লির ঘটনা এবং নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সামনে মুসলিমদের বিক্ষোভের দৃশ্য বলে দাবি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে কোনো ছাত্র আন্দোলনেরও সম্পর্ক নেই।

প্রসঙ্গত, ভারতে সম্প্রতি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি)’ ব্যানারে ছাত্র ও যুব আন্দোলন চলছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ জুলাই (২০২৬) হাজার হাজার আন্দোলনকারী দিল্লির সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর এই পুলিশি নিপীড়নের প্রতিবাদে পরদিন মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবন অভিমুখে একটি প্রতিবাদী পদযাত্রা করেন।

আরো কিছু লেখা