তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
This article is more than 2 months old
ফ্যাক্টচেক ভারতীয় বিএসএফকে বাংলাদেশিদের পাথর ছোঁড়ার ভুয়া দাবি

ঘটনা চাঁপাইনবাবগঞ্জের, দাবি শিলিগুড়ি-কোচবিহারের

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রুখতে সীমান্ত সিল করতে শিলিগুড়ি (ফাঁসিদেওয়া) ও কোচবিহারে সীমান্তে বেড়া দেওয়া হচ্ছে। একাধিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি ছড়ানো এক ভিডিওতে এমন দাবি করা হয়। ভারতীয় গণমাধ্যম দাবি করা একাধিক সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকেও বলা হয়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জওয়ানদের লক্ষ্য করে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাথর ছুড়ে হামলার ঘটনা এটি। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, মূল ঘটনা এক বছরেরও বেশি পুরোনো।

বিএসএফ-এর ভাষ্য মতে “ফসল চুরির অভিযোগের কারণে” দুই দেশের কৃষকদের মধ্যকার বাগ্‌বিতণ্ডার মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত। বিজিবি বলছে, ফসল কাটা নিয়ে বিবাদের জের ধরে ভারতীয় কৃষকরা বাংলাদেশের আম গাছ কাটার চেষ্টা করেছে। একাধিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই ঘটনা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের।

গত ২৪ মে ভারতভিত্তিক গণমাধ্যম পাবলিক নিউজ এক্স তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সদস্য ও বেশ কয়েকজন লোককে দেখা যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “পশ্চিমবঙ্গে (শিলিগুড়ি ও কোচবিহার) সীমান্ত বেড়া দেওয়ার কাজ চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিএসএফ কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারা হচ্ছে। বিএসএফ চরম সংযম দেখাচ্ছে, কোনো গুলি চালায়নি। বেড়া দেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে।” ভিডিওটি এগারো হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে।

  • ফ্যাক্টচেক ভারতীয় বিএসএফকে বাংলাদেশিদের পাথর ছোঁড়ার ভুয়া দাবি
  • ফ্যাক্টচেক ভারতীয় বিএসএফকে বাংলাদেশিদের পাথর ছোঁড়ার ভুয়া দাবি

একই দিনে গণমাধ্যম বলে পরিচয় দেওয়া নিউজ এক্স লাইভ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল ৩ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের এক ভিডিও প্রতিবেদন প্রচার করে। প্রতিবেদনের ৩০ সেকেন্ড থেকে একটি ভিডিও ক্লিপে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সদস্যদের দেখা যায়। পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন লোককে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে দেখ যায় ভিডিওতে। সংবাদ উপস্থাপিকাকে বলতে শোনা যায়, “শিলিগুড়ি থেকে একদম নতুন দৃশ্য সামনে আসছে, যেখানে ফাঁসিদেওয়া এলাকায় জরিপ চালানোর সময় বিএসএফ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে স্থানীয় বাংলাদেশিরা।” এই ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৬৩ হাজার বারের বেশি।

২৫ মে মেঘ আপডেটস নামের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। বলা হয়, শিলিগুড়ি (ফাঁসিদেওয়া) ও কোচবিহারে সীমান্ত বেড়া দেওয়ার সময় বিএসএফকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশি নাগরিকদের হামলার মুখেও বিএসএফ চরম সংযম দেখিয়েছে। ভিডিওটি শেয়ার করে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রুখতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করার কাজ তারা অব্যাহত রেখেছে। 

এ পর্যন্ত পোস্টটি তিন হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে সাড়ে তিন লাখের বেশি বার। মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “আমাদের সেনাবাহিনীর উচিত পাথর নিক্ষেপকারী এই জিহাদিদের গুলি করা।”। আরেকজন লিখেছেন, “এতগুলো বছর ধরে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো আসা-যাওয়া করেছে, এখানে পরিবার নিয়ে স্থায়ী হয়েছে, মাদক পাচার করেছে, গবাদি পশু চুরি করেছে এবং অপরাধীদের লুকিয়ে রেখেছে। সীমান্ত বা বর্ডার থাকার বিষয়টিতে তারা অভ্যস্ত হতে পারছে না।” একই দাবিতে ভিডিওটি প্রচারিত হয় সংবাদমাধ্যম দাবি করা আরও কিছু ফেসবুক (দ্য সিএসআর জার্নাল), এক্স (দ্য অল্টারনেটিভ মিডিয়া) ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট (দ্য ট্রেন্ডিং ইন্ডিয়ান, টিউব ইন্ডিয়ান) থেকেও।

ভিডিও থেকে কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন (, , ) খুঁজে পাওয়া যায়। সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিরণগঞ্জ সীমান্তে ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যবর্তী সংঘাতের দৃশ্যের ভিডিও এটি। এসব প্রতিবেদনের বিভিন্ন দৃশ্যের সঙ্গে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিও-এর দৃশ্য, লাঠিসোঁটা হাতে ব্যক্তিদের পোশাক পুরোপুরি মিলে যায়।

ফ্যাক্টচেক ভারতীয় বিএসএফকে বাংলাদেশিদের পাথর ছোঁড়ার ভুয়া দাবি
মূল ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন।

এছাড়া বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সঙ্গে ভারতের মালদাহ ও মুর্শিদাবাদ জেলার সীমান্ত রয়েছে, শিলিগুড়ি (ফাঁসিদেওয়া) কিংবা কোচবিহার নয়।

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে এ ঘটনা নিয়ে বিবিসির একটি সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএফ-এর ভাষ্য মতে “ফসল চুরির অভিযোগের কারণে” বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের কৃষকদের মধ্যকার বাগ্‌বিতণ্ডার মাধ্যমে এ ঘটনার সূত্রপাত। বিজিবি রাজশাহী সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল ইমরান ইবনে রউফ ও স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজহার আলী বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন, ফসল কাটা নিয়ে বিবাদের জের ধরে ভারতীয় কৃষকরা বাংলাদেশের আম গাছ কাটার চেষ্টা করেছে। সংঘর্ষের এ পরিস্থিতিতে টিয়ারশেল ছুড়েছে বিএসএফ। 

অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের সরকার পরিবর্তনের পর শিলিগুড়ি (ফাঁসিদেওয়া) ও কোচবিহারে সীমান্তে বেড়া নিয়ে সংঘর্ষের দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার। 

আরো কিছু লেখা