
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ওয়াজ করায় মসজিদের ইমামকে পিটিয়ে চাকরিচ্যুত করেছে বিএনপি নেতা ও তার ছেলে- এমন দাবিতে একটি ভিডিও পোস্ট হতে দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। একই ভিডিও যুক্ত করে আরেকটি পোস্টে নিপীড়ককে ‘স্থানীয় ছাত্রদল নেতা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওর ঘটনার সঙ্গে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ওয়াজ করার কোনো সম্পর্ক নেই। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর একটি মসজিদে কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ঘটনায় ইমামকে মারধর করা হয়।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে চলতি বছরের ১২ এপ্রিলে একজন ব্যবহারকারী একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছেন “ইন্না-লিল্লাহ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ওয়াজ করায় মসজিদের ইমামকে পিটিয়ে চাকরিচ্যুত করলেন বিএনপি’র নেতা ও তার ছেলে #তিব্র নিন্দা জানাচ্ছি।” এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ১ হাজারেরও বেশি শেয়ার হয়।
একই ভিডিও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ নামের একটি গ্রুপে এক ব্যবহারকারী একই ভিডিও পোস্ট করেন গত ১৪ এপ্রিলে। পোস্টের ক্যাপশনে নিপীড়ককে স্থানীয় ছাত্রদল নেতা বলা হয়। এই পোস্ট তিন শ বারেরও বেশি শেয়ার হয়।

ভিডিওর শুরুতে নীল জামা পরা একজন ব্যক্তিকে দেখা যায় এবং আরেকজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “অসুবিধা নাই। মারছেন তো! এটার ফয়সালা হইবো।” এরপরের দৃশ্যে মাথায় টুপি পরা একজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে যেভাবে মারছে, আমি সহ্য করতে পারি না। আমি করতাম!” পরবর্তীতে সেই টুপি পরিহিত ব্যক্তিকে কয়েকজনের কাঁধে ভর করে কোনো একটি স্থান থেকে বের হতে দেখা যায় এবং প্রেক্ষাপটে একজনকে বলতে শোনা যায়, “এই ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মুসল্লিরা এই বিষয়ে সুষ্ঠু বিচারের দাবি করে। ইতোমধ্যে…।”
একই ভিডিও ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ২০২৫ সালের ১ জুলাইয়ের একটি পোস্টে ফরিদপুরের চরকমলাপুরের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে, নিপীড়কের রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে বিএনপি নেতা ও তার ছেলের কথা বলা হয়।

২০২৫ সালের ৬ মে একই ঘটনার ভিডিও পোস্ট হতে দেখা যায় নোয়াখালী২৪ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। তবে সেই পোস্টে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ওয়াজের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না। আবার নিপীড়কের রাজনৈতিক পরিচয় বলা হয় জামায়াত কর্মী।
মূল ঘটনা সম্পর্কে জানতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে টুপি পরিহিত ব্যক্তির ভিডিও পাওয়া যায় ইউটিউবে। “নোয়াখালী ,সোনাইমুড়ী মধ্যপাড়া জামে মসজিদের ইমামকে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, ।” শিরোনামে ২০২৫ সালের ৬ মে পোস্ট হওয়া ভিডিওতে ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। (…) সকল ইমামদের অনুরোধ করছি। আমারে যেভাবে মারছে আমি আর সহ্য করতে পারি নাই। আমি কী করতাম। মেহেরবানি করে আপনারা একটু এগিয়ে আসুন। আমার পায়ের ব্যথার জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মানে আমি হাঁটতেও পারি না। মোটা বাঁশ দিয়ে আমাকে মারছে। আমার কী অপরাধ ছিল? আমি কী অপরাধ করছি? আমাকে কেন এরকমভাবে আঘাত করা হইছে। আমি ইমাম হইছি বলে কী এরকমভাবে মাইর খাব?” এরপর তিনি এই ঘটনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান করেন। পুরো ভিডিওতে তাকে কাঁদতে দেখা যায়।
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে নোয়াখালী টিভি নামের ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলের একটি ভিডিও প্রতিবেদন সামনে আসে ডিসমিসল্যাবের। ভিডিওটি পোস্ট করা হয় ২০২৫ সালের ৬ মে। শিরোনামে লেখা, “সোনাইমুড়িতে মসজিদের ইমামকে মা*রধ’রের অ’ভি’যোগ।” প্রতিবেদনে বলতে শোনা যায়, নোয়াখালী সোনাইমুড়ী উপজেলার মধ্যপাড়া জামে মসজিদের ইমামকে জোরপূর্বক অব্যাহতি ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীর নাম মাওলানা নোমান সিদ্দিকী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলীর ব্যক্তিগত রোষানলের কারণে তাকে অব্যাহতির জন্য চাপ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী ইমাম মাওলানা নোমান সিদ্দিকীকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে একজনে বলল আপনি ১৫ তারিখে অব্যাহতি নেন। আমি উনাকে বললাম আমার অপরাধটা কি? উনি আমার কোনো অপরাধ দেয় না, বলে যে আপনি মোবাইলে কথা বলেন, এই সেই বিভিন্ন উল্টাপাল্টা কথা বলে। আমি বললাম যে আমার যদি অপরাধ হয়ে থাকে, আমাকে আমার অপরাধগুলো দেখিয়ে দিতে হবে, যাতে আমি অন্য জায়গায় অপরাধগুলো না করি।” তিনি আরও বলেন, এই ঘটনার পেছনে মোহাম্মদ আলী ওরফে তরকারি ব্যাপারী নামের এক ব্যক্তি জড়িত।
একই ঘটনায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমেও (১, ২, ৩, ৪)। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, মসজিদ কমিটির অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে কমিটির সদস্য আব্দুল হান্নান কন্ট্রাক্টর ইমামকে চাকরি ছাড়তে ও মসজিদ ত্যাগ করার হুমকি দেন। পরবর্তীতে মাওলানা নোমান বিষয়টির সমাধানে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম ও মসজিদের আহ্বায়ক কমিটিকে ৬ মে বিকাল ৩টায় মসজিদে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান। এরপর ৬ মে সকাল ৭টার দিকে নাছির উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী ও মো. ওবায়দুল্লাহ ইমাম মাওলানা নোমানিকে হেনস্তা করার জন্য মসজিদে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে মসজিদের সামনে তাকে মারধর করা হয়। এই ঘটনায় নাছির উদ্দিন ও মো. ওবায়দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অর্থাৎ, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়ার কারণে ইমামকে মারধরের ঘটনাটি সত্য নয়। ভিডিওটি মূলত মসজিদ কমিটির দু’পক্ষের বিরোধের জেরে ইমামকে মারধরের ঘটনার। তবে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।