
কয়েকজন ব্যক্তি মিলে বাড়ি ভাঙচুর করছে— এরকম একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও দাবি করা হচ্ছে ইসলামপন্থীরা এক হিন্দুর বাড়ি ভাঙচুর করছে, আবার কোথাও বলা হচ্ছে বাড়িতে স্তবগান (ধর্মীয় গীত) বাজানোর কারণে এক দরিদ্র খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলার দৃশ্য এটি। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, মাদক ব্যবসার অভিযোগ এনে দুই ব্যক্তির বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার ভিডিও এটি, যাদের কেউই অমুসলিম ছিলেন না।
হিন্দু ভয়েজ নামের এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় বাংলাদেশ সময় ২৮ জুন সকাল ১১টা ২২ মিনিটে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি একত্রে কিছু বাড়ি ভাঙচুর করছেন। পোস্টের ইংরেজি ক্যাপশন বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “#বাংলাদেশে #সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলছে। ইসলামপন্থীরা প্রকাশ্য দিবালোকে একটি হিন্দুর বাড়ি ভাঙচুর করছে। প্রশাসন এবং বাংলাদেশ সরকার নীরব।” অ্যাবাউট সেকশনে গিয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যম দাবি করা এই অ্যাকাউন্টটি ভারত থেকে পরিচালিত।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ১১০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার বার। মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “এটি একটি কাল্ট এবং একে বিশ্বব্যাপী নির্মূল করা উচিত।” ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্স অ্যাকাউন্ট মেনশন করে কয়েকজন লিখেছেন, “ভারত কেন এই ধরনের বাংলাদেশি মানুষকে ভিসা দিচ্ছে?”
এর আড়াই ঘণ্টা পর একই দৈর্ঘ্যের ভিডিও স্মার্ট (সমাচার মান্যতা অ্যাসোসিয়েশন ফর রিসার্চ এন্ড ট্রেইনিং) নামে ভারত থেকে পরিচালিত এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও পোস্ট করা হয়। জাতীয় স্বার্থভিত্তিক গণমাধ্যমের গবেষণা ও সমন্বয়মূলক এই প্ল্যাটফর্মের এক্স হ্যান্ডেল থেকে একই ক্যাপশনে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত ভয়েজ অব বিডি হিন্দুজ নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার দিকে ইঙ্গিত করে পোস্টের ক্যাপশনে হ্যাশট্যাগ দিয়ে লেখা হয়েছে, “অলআইসঅনবিডিহিন্দুজ”। এই পোস্টটি ১৩০বার শেয়ার হয়েছে।
এতে একজন মন্তব্য করেছেন, “বাংলাদেশি মুসলিমরা তাদের বিশ্বাস, ধর্ম ও আদর্শে মারাত্মকভাবে উগ্রপন্থি হয়ে উঠেছে, যা তাদের হেইট জম্বিতে পরিণত করছে। তাদের এই বৈধতা পাওয়া ঘৃণা সহিংসতাকে সক্ষম করে তোলে, আক্রমণের যৌক্তিকতা দেয় এবং হিন্দুদের ওপর চলমান গণহত্যাকে চালিত করে। হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন চালানো বা শিকার করা তাদের ঘৃণ্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে সন্তুষ্ট করে। এই শিক্ষা তাদের গ্রন্থ থেকে আসে।” আরেকজন বলছেন, “এই সমস্যার সমাধানের একমাত্র উপায় হলো ভারত সরকার যদি পার্বত্য অঞ্চলের জনগণকে অস্ত্র দেয় এবং হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।”

একই দিনে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭ টা ১৪ মিনিটে একই ঘটনার ৩ মিনিট ১১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় বাবা বানারাস নামে একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে। ভারত থেকে পরিচালিত এই এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টের ইংরেজি ক্যাপশনে এই ঘটনাকে খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলা বলে প্রচার করা হয়েছে। ক্যাপশনে লেখা, “একটি মুসলিম দেশে অমুসলিমদের জীবন আর একটি অমুসলিম দেশে মুসলিমদের জীবন এক নয়। বাংলাদেশে একদল উগ্র ইসলামপন্থী একটি দরিদ্র খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলা চালায় এবং তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে, কারণ তারা বাড়িতে স্তবগান (ধর্মীয় গীত) বাজাচ্ছিল। বামপন্থী মিডিয়া এবং গাজা গ্যাং কেন নীরব?”
এ পর্যন্ত পোস্টটি দুই শতাধিক বার শেয়ার হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১৩ হাজার বারের বেশি। পোস্টে একজন মন্তব্য করেছেন, “মুসলিমরা গুহামানব ছাড়া আর কিছুই নয়। কুরআন তাদের মন্দ হতে শেখায়। এটি আল্লাহর জন্য তাদের সমস্ত খ্রিস্টানদের হত্যা করতে এবং তাদের মাথা কেটে ফেলতে বলে।”
ভিডিও থেকে কিফ্রেম ও প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড নিয়ে সার্চ করলে দৈনিক সমকাল প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদনের ব্যক্তি, তাদের পোশাক, বাড়ির ডিজাইন ও রং- পুরো দৃশ্য সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। ২০২৬ সালের ২৪ জুন প্রকাশিত এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এটি কিশোরগঞ্জে মাদক ব্যবসার অভিযোগ এনে দুই ব্যক্তির বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার দৃশ্য।

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে কিশোরগঞ্জ প্রেস নামে একটি সংবাদমাধ্যমে ২৪ জুন প্রকাশিত একই ঘটনার একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নে এলাকাবাসীর মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও চোর আটক করে। এসটি বাংলা টিভি ডট বিডি নামের আরেকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনও পাওয়া যায়। এর ক্যাপশনে লেখা, “ইটনায় মাদক ব্যবসার অভিযোগে সুমন ও আইন উদ্দিনের বাড়িতে এলাকাবাসীর ভাঙচুর।”
অধিকতর যাচাইয়ে দৈনিক সমকালের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি বিজয় কর রতন-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি জানান, মাদক ব্যবসার অভিযোগে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নে সুমন মিয়া (৩৫) ও আইন উদ্দিন (৪৫) নামে দুজনের বাড়ি ভাঙচুরের এই ঘটনা ঘটে। ভাঙচুরের এই ঘটনা কোনো হিন্দু বা খ্রিস্টান বাড়িতে ঘটেনি বলে ডিসমিসল্যাবকে নিশ্চিত করেছেন।
অর্থাৎ, মাদক ব্যবসার অভিযোগে গ্রামবাসীর হামলার ভিডিও সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালিত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে। এটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো ঘটনা নয় এবং যাদের বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে তাদের কেউই অমুসলিম ছিলেন না।