মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
misleading claim muslim candidates being excluded

প্রশিক্ষণটি ছিল ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর’ জন্য

ভোলায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণে মুসলিমদের বাদ দেওয়ার দাবিটি বিভ্রান্তিকর

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ভোলার সমাজসেবা কার্যালয় থেকে আয়োজিত কম্পিউটার প্রশিক্ষণে বেছে বেছে মুসলিমদের বাদ দিয়ে হিন্দুদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে ফেসবুকে একটি নামের তালিকা ছড়ানো হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, সমাজসেবা কর্মকর্তা সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় এমন বৈষম্য করেছেন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, দাবিটি বিভ্রান্তিকর। মূলত প্রশিক্ষণটি ছিল ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর’ জন্য। আবেদনকারীদের মধ্যে মুসলিম কেবল সাতজনকে পাওয়া গেছে, যাদের কেউই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বেছে নেননি।

ফেসবুকে ইলিয়াস মুফতি (Eleaus Mufti) নামের প্রোফাইলের একটি পোস্ট ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। গত ১১ জুলাইয়ের ওই পোস্টে একটি নামের তালিকার ছবি দিয়ে লেখা হয়, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে আসলে হচ্ছেটা কি, কাদেরকে আপনি মন্ত্রিপরিষদের অন্তর্ভুক্ত করলেন? দেখুন তো ভোলা জেলার সমাজকল্যাণের একটি নমুনা চিত্র:-অবস্থা দৃষ্টিতে তো মনে হচ্ছে মনে হচ্ছে* পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী* শুভেন্দু অধিকারীর ভগ্নিপতি যেন, বাংলাদেশের ভোলা জেলায় সমাজকল্যান কর্মকর্তা হিসেবে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেয়েছেন!”

পোস্টে আরও লেখা হয়, “সম্প্রতি কম্পিউটার বেসিক ট্রেনিংয়ের অংশগ্রহণকারীদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৯০% নামই এসেছে স”নাতন ধর্মাবলম্বীদের !! অভিযোগ উঠেছে,বেছে বেছে মুসলিম আবেদনকারীদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি এক পরিবারের ৩ জন হিন্দু সদস্যকেও নেওয়া হয়েছে কিন্তু নেই কোন মুসলমানদের নাম !!!!”

এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত পোস্টটি ৪ হাজার ৫০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। প্রতিক্রিয়া এসেছে নয় হাজারের বেশি, মন্তব্যও আছে হাজারের বেশি। একটি মন্তব্যে লেখা, “অবশ্যই সমাজ কল্যাণ অফিসারকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নতুবা জনগন বিচার করতে বাধ্য হবে।” আরেকটি মন্তব্যে বলা হয়েছে, “উগ্রবাদী হিন্দু দল এ দেশে অশান্তির মূল।”

কিওয়ার্ড সার্চ করে দেখেছে, গত ৪ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ, পেজ ও প্রোফাইলে একই ধরনের দাবিতে সাতশ’র বেশি পোস্ট করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাব সবচেয়ে আগে এ সংক্রান্ত কোনো পোস্ট হতে দেখেছে মীর তানু (Mir Tanu) নামের একটি প্রোফাইল থেকে। গত ৪ জুলাই সকাল ৯টা ২১ মিনিটে ভোলার ‘উকিল পাড়া’ নামের একটি জায়গা চেক-ইন দিয়ে পোস্টটি করা হয়। পোস্টে নামের তালিকার ছবি যোগ করে লেখা হয়েছে, “মনে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভগ্নিপতি যেন, ভোলা জেলা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা হিসেবে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেয়েছেন! সম্প্রতি কম্পিউটার বেসিক ট্রেনিংয়ের অংশগ্রহণকারীদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৯০% নামই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। অভিযোগ উঠেছে, বেছে বেছে অনেক মুসলিম আবেদনকারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”

পোস্টে আরও লেখা হয়, “খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট জেলা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তার নাম রজত শুভ্র সরকার, যিনি নিজেও সনাতন ধর্মাবলম্বী। যদি নিয়োগ বা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় এনে বৈষম্য করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে ধর্ম নয়, যোগ্যতাই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত।”

এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত পোস্টটি ৪৫০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। প্রতিক্রিয়া এসেছে এক হাজারের বেশি। তিন শতাধিক মন্তব্যও করা হয়েছে।

কিওয়ার্ড সার্চ করে ফেসবুকের পাশাপাশি এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক ইনস্টাগ্রামেও একই তথ্য ও ছবিযুক্ত পোস্ট খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

বিভ্রান্তিকর দাবিটি ফেসবুক ছাড়াও এক্স, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।

সত্যতা যাচাইয়ে দেখা যায়, তালিকার একদম নিচে অস্পষ্টভাবে লেখা, “অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ ২০২৫- ২০২৬।”

এই সূত্র ধরে কিওয়ার্ড সার্চ করে বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইট থেকে ভোলা সমাজকল্যাণ কার্যালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পাওয়া যায়। বিজ্ঞপ্তির বিষয় হিসেবে লেখা, “অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের বিজ্ঞপ্তি ও আবেদন ফরম।” 

জেলা সমাজসেবা কার্যালয় ২০২৬ সালের ৭ মে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী হিজড়া, বেদে ও বিভিন্ন অনগ্রসর সম্প্রদায়ের সদস্যদের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে বলা হয়। আবেদনের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় ২০ মে।

বিজ্ঞপ্তিতে ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠী’ হিসেবে হিজড়া ও বেদের পাশাপাশি উদাহরণ হিসেবে যে সম্প্রদায়গুলোর নাম উল্লেখ ছিল সেগুলো হল, “নিকারী, সন্ন্যাসী, পাটনী, খামি, তাঁতী, পাটিকর, নরসুন্দর/নাপিত, ডোমার, চুনার/চুনকর, গোয়ালা, ডোম, কুমার, তেলুঙ্গু, হাজাম, রাউত, জলদাস, মালাকার, কামার, বাওয়ালী, বাঁশফোর, মাতা, মৌয়াল, রজকদাস/ধোপা, রবীদাস, শব্দকর, লালবেগী, মাল, সুতার, মালী, বাধ্যকর, কলু, ধুনকর, মাটিয়াল, গাছি ইত্যাদি।”

ভোলা সমাজকল্যাণ কার্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি।

ভোলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রজত শুভ্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বাছাই প্রক্রিয়াটি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের উপস্থিতিতে দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে যারা সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন, ডিসি স্যার তাদেরই সিলেকশন করে দিয়েছেন। এখানে ধর্ম বা জাত দেখার কোনো বিষয় ছিল না।”

এ বিষয়ে ভোলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আরেক কর্মকর্তা কাজী গোলাম কবির ডিসমিসল্যাবকে জানান, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধোপা, মুচি, নাপিত- এরাই মূলত আবেদন করেছেন। এ কারণে নির্বাচিতদের তালিকায় সনাতনীদের নামই বেশি এসেছে। আর যে কয়েকজন মুসলিম আবেদন করেছিলেন, তারা কেউই কম্পিউটার ট্রেডের জন্য আবেদন করেননি। তারা কৃষি বা অন্য ট্রেড চেয়েছিলেন।

ডিসমিসল্যাব ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ইমেইলের মাধ্যমে সমন্বয় সভার কমিটির সভার কার্যবিবরণী, আবেদনকারীদের তালিকা ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন তালিকা সংগ্রহ করে। নথিপত্র ঘেটে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের জন্য মোট ১১৩ জন আবেদন করেছিলেন, যার মধ্যে আবেদনকারী ও তার বাবা-মার নাম যাচাই করে মুসলিম ধর্মাবলম্বী ৭ জনকে পাওয়া যায়।

ভোলা সমন্বয় কমিটির কার্যবিবরণীতে উল্লেখ আছে, ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ ট্রেডের চাহিদা বেশি থাকায়,   প্রশিক্ষণের জন্য এ বিষয়টি বেছে নেওয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করে ওই প্রশিক্ষণে আগ্রহী ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থীকে রাখা হয়েছে চূড়ান্ত তালিকায়। 

আবেদনকারীদের তালিকা দেখা যায়, সাত জন মুসলিম আবেদনকারীর কেউই ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ ট্রেডের জন্য আবেদন করেননি।

নির্বাচিতদের তালিকা ঘেটে দেখা যায়, ২৫ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিলেন রবিদাস সম্প্রদায়ের ৮ জন। এছাড়া হরিজন, ডোম, নাপিত, নমশূদ্র ও গোয়ালা সম্প্রদায়ের প্রার্থীও ছিলেন। 

misleading claim muslim candidates being excluded

সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রজত শুভ্র সরকার নিজে সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তিনি বেছে বেছে হিন্দুদের সুযোগ দিয়েছেন। তবে নথিপত্র বলছে, বাছাই প্রক্রিয়াটি তার একক সিদ্ধান্তে হয়নি। গত ১০ জুন ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমানের সভাপতিত্বে জেলা সমন্বয় কমিটির একটি সভা ও সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ১০০ জন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থসামাজিক অবস্থা ও আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে ৩০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়া হয়। মূল্যায়ন ও ফলাফল তালিকার নিচে থাকা সিল ও স্বাক্ষর থেকে দেখা যায়, দুজন সহকারী কমিশনার মো. আশরাফুল আলম ও মো. নুরুল আলম মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকারে ২৫ জনকে ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ ট্রেডের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি।

অর্থাৎ, ভোলায় সমাজসেবা কার্যালয়ের আয়োজিত প্রশিক্ষণটি নির্দিষ্টভাবে ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর’ জন্য বরাদ্দকৃত ছিল। এছাড়া সাতজন মুসলিম আবেদনকারীর কেউই কম্পিউটার ট্রেডে আবেদন করেননি। বাছাই প্রক্রিয়াটি জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন কমিটির মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। তাই মুসলমানদের তালিকা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এমন দাবি ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।

আরো কিছু লেখা