সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব
This article is more than 2 months old
ফ্যাক্ট চেক: এআই ভিডিওর গরুর বীরত্বে বোকা বনল বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমও

এআই ভিডিওর গরুর বীরত্বে বোকা বনল বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমও

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব

রেল লাইনের একদম ধারে দাঁড়িয়ে আছে একটি কন্যা শিশু। তার পেছন দিক থেকে সাইরেন বাজিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে ট্রেন। কিন্তু ছোট শিশুটি বিপদ টের পাচ্ছে না। আশপাশে কোনো মানুষও নেই। এমন সময় উদ্ধারকর্তা হয়ে হাজির একটি গরু। ধাক্কা দিয়ে একদম শেষ মুহূর্তে সরিয়ে নেয় শিশুটিকে।

অলৌকিকভাবে মেয়ে শিশুটির এভাবে বেঁচে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যম এবং একাধিক গণমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে, ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে নির্মিত। ভারতের একটি তথ্য যাচাইকারী সংস্থার প্রতিবেদন থেকেও ঘটনাটি এআই নির্মিত বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

‘দৈনিক খোলাচোখ’ নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজ থেকে গত ১৬ এপ্রিল ভিডিওটি (আর্কাইভ লিংক) পোস্ট করা হয়। ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, গোলাপি ফ্রক পরা একটি ছোট শিশু রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ দৌড়ে এসে, ট্রেনের ধাক্কার হাত থেকে শিশুটিকে সরিয়ে নিয়ে যায় একটি গরু। ক্যাপশনে লেখা, “নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে শিশুটিকে বাঁচালো একটি গরু।”

এই প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত ভিডিওটি ১৭ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে এবং প্রায় ৩ হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে সত্যি ধরে নিয়ে তাদের মন্তব্য জানিয়েছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটা গরু নয় এটা আল্লাহর ফেরেশতা”। আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “বাঁচানোর মালিক শুধু আল্লাহ তাই ওসিলা হিসেবে গরুকে পাঠায় দিছে ❤️” ( বানান অপরিবর্তিত)। 

নিউজ টেন নামের আরেকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজ থেকেও একই ভিডিও প্রতিবেদনটি (আর্কাইভ লিংক) পোস্ট করা হয়। ভিডিওর ভেতরে লেখা, “ট্রেন আসার আগে গরুর ধাক্কায় বাঁচলো ছোট্ট মেয়ে”। এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ভিডিওটি ১৪ লাখের অধিক দেখা হয়েছে। 

দৈনিক ইনকিলাবও তাদের ফেসবুক পেজে গত ১৬ এপ্রিল এই ভিডিও আপলোড করেছে। “শিশুর প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল গরু! ভিডিও ভাইরাল” ক্যাপশনের ভিডিওতে শুরুতে দর্শকদের সাবধান করে বলা হয়, “সতর্কতা: ভিডিওটির কিছু অংশ আপনার মানসিক চাপের কারণ হতে পারে”। এটিএন নিউজও একই ক্যাপশনে ভিডিও পোস্ট করেছে। তবে তাদের ভিডিওটি অন্য ভিডিওগুলোর মিরর অর্থাৎ এক্ষেত্রে ট্রেনটি স্ক্রিনের ডানদিক থেকে এসেছে।

  • ফ্যাক্ট চেক: এআই ভিডিওর গরুর বীরত্বে বোকা বনল বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমও
  • ফ্যাক্ট চেক: এআই ভিডিওর গরুর বীরত্বে বোকা বনল বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমও

এ দুটি গণমাধ্যম্যের পোস্টে ব্যবহারকারীরা অধিকাংশই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। একজন লিখেছেন, “ভিডিও করলো ওই গরুটা কোথায়।” আরেকজন বলেছেন, “সামনে কুরবানী তো তাই গরু মানবিক কাজ করতেছে যেন…”।

ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল (, , , , ) থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ফেসবুকের একটি পেজ থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়, “ভারতের উত্তর প্রদেশে বিরল এক ঘটনার যা রীতিমত বিষ্ময়কর”।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির বিভিন্ন কিফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে দেখা যায়, ভারতের একাধিক সামাজিক মাধ্যম থেকেও (, , , , , ) একই দাবিতে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। 

ভিডিওটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বেশকিছু দৃশ্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করে ডিসমিসল্যাব। প্রথমত, ট্রেনটিতে মাত্র তিনটি বগি ছিল। অন্যদিকে শিশুটিকে সরিয়ে আনার সময় গরুটি মাথা ট্রেনের একদম ভেতরের দিকে ছিল, তবুও গরুটির শরীরে ট্রেনের কোনো আঘাত লাগেনি। তাছাড়া এতকিছু হওয়ার পরেও পুরো ঘটনায় বাচ্চাটির কোনো প্রতিক্রিয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে না। এসব দেখে ধারণা করা হয়, ভিডিওটি বাস্তব নয় বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।

আরও বিস্তারিত যাচাইয়ে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কয়েকটি কিওয়ার্ড ধরে সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। যাচাইয়ে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল mojilo_vandro ইউজার নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, “ভগবান না চমৎকার 🙏…” অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, ভারত থেকে সেটি পরিচালিত হয়। এছাড়া ব্যবহারকারী তার অ্যাকাউন্টে নিয়মিত এআই নির্মিত ভিডিও পোস্ট করেন। তার কনটেন্টগুলো কাল্পনিক এবং তিনি এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট বানান, সেটি ইনস্টাগ্রামের বায়ো সেকশনেও উল্লেখ করেছেন।

অধিকতর যাচাইয়ে, কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল ডিপফেক-ও-মিটার দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা শতকরা ৯৯.৫ যা প্রায় শতভাগ।

  • ফ্যাক্ট চেক: এআই ভিডিওর গরুর বীরত্বে বোকা বনল বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমও
  • ফ্যাক্ট চেক: এআই ভিডিওর গরুর বীরত্বে বোকা বনল বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমও

অন্যদিকে, গত ১৬ এপ্রিল ভারতের তথ্য যাচাইকারী সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেও প্রচারিত ভিডিওটিতে থাকা নানান অসঙ্গতির কথা বলা হয় এবং ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানো কনটেন্ট বলে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ, এআই দিয়ে নির্মিত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে সেটিকে একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য দর্শকদের বিভ্রান্ত করা। এর আগেও ডিসমিসল্যাব এআই ভিডিও দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা নিয়ে ফ্যাক্টচেক করেছে।

আরো কিছু লেখা