সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ বলে ভুয়া দাবি

ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ বলে ভুয়া দাবি সামাজিক মাধ্যমে

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব

সীমান্তের শূন্যরেখায় ‘মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ এক ব্যক্তিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চাইলে (পুশ ইন) তা রুখে দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)- এমন দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওতে থাকা ওই ব্যক্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের। একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণ নামের ওই ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন এবং প্রায় আড়াই মাস আগে রাজশাহীর নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন।

‘হিন্দু ভয়েজ’ নামের একটি ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে গত ১১ জুন ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ২ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ দাঁড়ানো এক বৃদ্ধকে প্রশ্ন করছে বিজিবি। আর ওই ব্যক্তি সেসব প্রশ্নের অস্পষ্ট উত্তর দিচ্ছেন। অন্যদিকে, তাকে নিয়ে বিজিবি আর বিএসএফ মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হচ্ছে। ক্যাপশনের লেখা বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায়, “ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের একটি দৃশ্য… গতকাল, বিএসএফ কর্তৃক একজন বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীকে পুশব্যাক করার চেষ্টা রুখে দিতে চেয়েছিল বাংলাদেশের বিজিবি। বাংলাদেশ তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করায়, লোকটি এখন নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসে আছে।” (ভাষা অপরিবর্তিত)

ফ্যাক্টচেক ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ বলে ভুয়া দাবি
ভুয়া দাবি করা এক্স পোস্টের স্ক্রিনশট।

এই প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত, ভিডিওটি ১ লাখ ১৮ হাজারের অধিক দেখা হয়েছে এবং ৩৭৫ বার রিপোস্ট করা হয়েছে। ভিডিওতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪০০ ব্যবহারকারী। 

সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওর একাধিক কিফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। যাচাইয়ে সংবাদমাধ্যম যুগান্তরের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা, “সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের তর্কের মাঝে কে এই বৃদ্ধ?” প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবিটির সাথে ছড়িয়ে পড়া পোস্টের লোকজনের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্তে বৃদ্ধ এক ব্যক্তিকে নিয়ে বিএসএফ ও বিজিবির তর্কের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিজিবি তাকে ঠেলে বিএসএফের সঙ্গে পাঠাচ্ছে, আবার বিএসএফ ঠেলে বাংলাদেশের দিকে পাঠাচ্ছে। তাই ওই ব্যক্তি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে পড়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টা নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করেন। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ওই ব্যক্তির নাম ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণ। 

ফ্যাক্টচেক ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ বলে ভুয়া দাবি
মূল ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন।

এ ব্যাপারে অধিক নিশ্চিত হতে একাধিক কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করলে একাধিক গণমাধ্যমে (,,,,) প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণ নামের ওই বৃদ্ধের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দলাই গ্রামে। তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় দুই মাস আগে তিনি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন। এরপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা জানান, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সীমান্তের ভিডিও দেখে তাকে চিনতে পারেন। এরপর বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণকে ফিরে পায় পরিবার।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মকবুল হোসেন বলেন, ওই বৃদ্ধের ছোট ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মণ, জামাতা গৌর চন্দ্র বর্মণ ও ভাগনে অতীশ চন্দ্র বর্মণ থানায় এসেছিলেন। আইনগত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিজিবি, পুলিশ সদস্য ও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

অর্থাৎ, ওই বৃদ্ধকে মুসলিম অনুপ্রবেশকারী বলে দাবি করে সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। 

আরো কিছু লেখা