নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
This article is more than 2 months old
ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের দাবিটি ভুয়া

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ফেসবুকে সম্প্রতি বেশকিছু পোস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্যের ছবি ও ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে ভাস্কর্যটি সংস্কার করা হচ্ছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভাস্কর্য সংস্কারের দাবিটি ভুয়া। এ দাবিতে প্রচারিত ছবি ও ভিডিও পুরোনো এবং এআই দিয়ে সম্পাদনা করা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে কুষ্টিয়া পৌরসভার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্যের কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়। প্রচারিত ছবি-ভিডিওগুলো সে সময় ভেঙে ফেলা ভাস্কর্যের ছবি থেকে নেওয়া, যা বর্তমানে এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়ানো হচ্ছে।

ফেসবুকে “রিযিকের রাস্তা” নামের পেজ থেকে গত ৩০ মার্চ একটি ছবি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে বলা হয়, “বঙ্গবন্ধুর ভাঙ্গা ভাস্কর্য নতুন করে সংস্কার করা হচ্ছে। আপনারা ভালোবাসা দিয়ে পাশে থাকবেন।।” এ পোস্টে ১৮ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মন্তব্য যাচাইয়ে দেখা যায়, অনেকেই পোস্টটিকে সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “সংস্কার করলেই হবে না। যে বা যারা এই কাজ করেছে তাদের বিচার করা জরুরি।” আরেকজন লিখেছেন, “সংস্কার করা হোক। অপরাধীদের বিচার একদিন হবে।”

প্রায় চারদিন পর, ওই একই পেজ থেকে এপ্রিলের ৩ তারিখে আরেকটি ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, “দেশের বিভিন্ন স্থানে তারেক রহমানের নিজের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাঙ্গা ভাস্কর্য গুলো সংস্কার কাজ শুরু করেছে।। আলহামদুলিল্লাহ।” ৬ এপ্রিল পেজটি থেকে একই ভাস্কর্যের ছবি ভিন্ন ক্যাপশনে পোস্ট করা হয়।

ফ্যাক্ট চেক  এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার
“রিযিকের রাস্তা” নামের ফেসবুক পেজের পোস্ট।

ফেসবুকের আরেকটি পেজ “সিমা নিউজ ২৪” থেকে ভাস্কর্য নিয়ে একাধিক ভিডিও (, , , ) শেয়ার করতে দেখা যায়। সেখানে দাবি করা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে ভাস্কর্যটি সংস্কার করা হচ্ছে। ভিডিওগুলোতে মাইক হাতে একজন নারীকে বলতে শোনা যায়, “জানা গেছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিজের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাঙা ভাস্কর্যগুলো নতুন করে সংস্কার করা হচ্ছে। এ কাজটি করার কারণে দেশজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর এ কাজটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে কমেন্টে বলে যাবেন।” এছাড়া ভিডিওতে সম্পাদনা করা ভাস্কর্যের ছবিও দেখা যায়। এছাড়া ফেসবুকের একাধিক (, ) ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকেও ছবিটি একই দাবিতে পোস্ট করা হয়। 

ছবি এবং ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। ভাস্কর্যটির চারপাশে বেশ কিছু বিলবোর্ড দেখা যায়। সবগুলো বিলবোর্ডেই কিছু লেখা দেখতে পাওয়া যায়। এই লেখার অক্ষরগুলো বাংলার সঙ্গে মিল থাকলেও পুরোপুরি মেলে না এবং তা কোনো অর্থবোধক শব্দও তৈরি করে না। এমন ধরনের লেখা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি লেখার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এছাড়া, একটি ছবির নিচের ডান কোণে গুগল জেমিনির লোগো দেখতে পাওয়া যায়।

  • ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার
  • ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার

এছাড়া ছবিগুলো রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে ২০২০ সালের ৫ ডিসেম্বরে প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি প্রতিবেদন। এ প্রতিবেদনে ব্যবহার করা ভাস্কর্যের ছবির সঙ্গে বর্তমানে প্রচারিত ছবি এবং ভিডিওতে ব্যবহার করা ভাস্কর্যের মিল রয়েছে। 

প্রতিবেদনে ব্যবহার করা একটি ছবির সঙ্গে প্রচারিত ছবিটি তুলনা করলে বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন, সংস্কারের দাবিতে ছড়ানো ছবিটিতে ভাস্কর্যের উপরিভাগে কাজ করছে এমন দুজন ব্যক্তিকে যোগ করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবেদনে শুধু একজন ব্যক্তিকে কাজ করতে দেখা যায়, সেটিও ভাস্কর্যের নিচের অংশে। এছাড়া প্রতিবেদনের বিলবোর্ডে দেখতে পাওয়া লেখা পড়া যায়, এবং তা অর্থবহ শব্দ তৈরি করে। 

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “কুষ্টিয়ায় রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর।” সেখানে বলা হয়, “কুষ্টিয়া পৌরসভার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ডান হাত, পুরো মুখ ও বাম হাতের অংশ বিশেষ শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় ভেঙে ফেলা হয়।”

এ বিষয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত একাধিক (, , , ) প্রতিবেদনে ভাস্কর্যের ছবিটি পাওয়া যায়। 

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫টি ছবি এবং ৪টি ভিডিওর সত্যতা যাচাইয়ে সেগুলো গুগল জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল সিন্থআইডির মাধ্যমে পরীক্ষা করে ডিসমিসল্যাব। দেখা যায়, ছবিগুলোতে সিন্থআইডির ওয়াটারমার্ক রয়েছে। এছাড়া দুটি ছবির নিচের দিকে ডান কোণে গুগল জেমিনির লোগোও রয়েছে। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির “ন্যানো বানানা” মডেল ব্যবহার করে ছবি সম্পাদনা করলে সম্পাদিত ছবিতে লোগোটির এমন জলছাপ থাকে। এছাড়া এআই শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

  • ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার
  • ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার
  • ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার
  • ফ্যাক্ট চেক এআই দিয়ে বানানো ছবি শেয়ার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের ভুয়া খবর প্রচার

অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সংস্কারের দাবিতে ছড়ানো ছবিগুলো পুরোনো একটি ঘটনার; তবে বর্তমানে সেই ছবিগুলো এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

আরো কিছু লেখা