
ঝিনাইদহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ টেঁটা-বল্লম নিয়ে শোডাউন করছে দাবিতে সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের বা ঝিনাইদহের নয়, বরং ২০২৪ সালের গোপালগঞ্জ জেলার একটি ঘটনার দৃশ্য।
একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়েছে। ফেসবুকে ‘মোহাম্মদ রাসেল’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “ঝিনাইদহে টেঁ’টা-ব’ল্ল’ম নিয়ে আওয়ামী লীগের ন’জি’রবি’হীন শোডাউন: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে মাঠ দখলের র’ণপ্রস্তুতি। দৈনিক ভোরের পাতা।” ক্যাপশনে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আরও কিছু শব্দ লেখা হয়—
#আওয়ামী_লীগ #ঝিনাইদহ_নিউজ #আওয়ামী_লীগ #প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী #রণসাজ #টেঁটা_বল্লম #শোডাউন #ছাত্রলীগ #রাজপথ_দখল #২৩_জুন

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি সাড়ে তিন হাজারের বেশি বার শেয়ার করা হয়। প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ২৫ হাজারের বেশি। ৯০০-এর অধিক মন্তব্য করা হয়েছে।
ফেসবুকে আরও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয় (১, ২, ৩)। এছাড়া ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামেও ভিডিওটি একই দাবিতে পোস্ট করতে দেখা যায়।
ভিডিওতে দেখা যায়, দুই পাশে ঘন গাছপালায় ঘেরা একটি পাকা রাস্তা ধরে কয়েক শ মানুষের একটি মিছিল সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই পুরুষ এবং বেশিরভাগের হাতেই লম্বা বাঁশের লাঠি, টেঁটা, বল্লম এবং দেশীয় ধারালো অস্ত্রের মতো বস্তু রয়েছে। মিছিলে থাকা ব্যক্তিদের বেশ উত্তেজিত অবস্থায় হাত ও অস্ত্র উঁচিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে দেখা যায়।
ভিড়ের মধ্যে কয়েকজনের হাতে লাল-সবুজ রঙের পতাকাও উড়তে দেখা যায়। ভিডিওর উপরে ডান কোণে ‘দৈনিক ভোরের পাতা’ নামের একটি লোগো দেখা যায়। পুরো ভিডিওটি সংবাদমাধ্যমের আদলে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার অনস্ক্রিন গ্রাফিক্সে লেখা রয়েছে, এটি ঝিনাইদহে একটি রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ‘শোডাউন’ এর দৃশ্য।
ফেসবুকে ‘দৈনিক ভোরের পাতা’ লিখে সার্চ দিলে একটি পেজ সামনে আসে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত ২১ জুলাই হুবহু একই ভিডিওটি একই দাবিতে পেজটি থেকে পোস্ট করা হয়েছে।
সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওর কয়েকটি কিফ্রেম সার্চে ‘লাইট হাউজ জার্নালিজম’ নামের একটি ভারতীয় তথ্য যাচাইকারী সংস্থার ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন সামনে আসে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট। তখন একই ভিডিও সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে যাচাই করে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
এই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে নিজেদের সংবাদমাধ্যম দাবি করা ফেসবুক পেজ ‘চ্যানেল টোয়েন্টি ওয়ান নিউজ’ থেকে পোস্ট হওয়া একই দৃশ্যের ভিডিও সামনে আসে। ভিডিওটি ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট পোস্ট করা হয়েছিল।

পরে চ্যানেল টোয়েন্টি ওয়ান নিউজের ভিডিও বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব। এতে দেখা যায়, ‘ভোরের পাতা’র ভিডিও এবং চ্যানেল টোয়েন্টি ওয়ান নিউজের ভিডিওর মূল দৃশ্যপট প্রায় অভিন্ন। উভয় ভিডিওতেই একই পাকা রাস্তা ও দুপাশের ঘন গাছপালায় ঘেরা পরিবেশ দৃশ্যমান। মিছিলে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং তাদের হাতে থাকা দীর্ঘ বাঁশের লাঠি, টেঁটা ও বল্লমের মতো দেশীয় অস্ত্রগুলো উভয় ভিডিওতে হুবহু এক। এমনকি ভিড়ের মাঝে দূরে উড়তে থাকা লাল-সবুজ রঙের পতাকাটিও দুটি ভিডিওতে একইভাবে পরিলক্ষিত হয়।
তবে ভোরের পাতার ভিডিওতে ভয়েসওভারের মাধ্যমে এটিকে ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ‘শোডাউন’ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল। অন্যদিকে, চ্যানেল টোয়েন্টি ওয়ান নিউজ-এর ভিডিওতে কোনো ভয়েসওভার নেই, তবে ক্যাপশনে ঘটনাটি গোপালগঞ্জের “আজকাঠী কাজুলিয়া মাঝিগাতী ইউনিয়নের” ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকতর যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে ‘দ্য স্টুডেন্ট জার্নাল’ নামের আরেকটি পেজে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট পোস্ট হওয়া হুবহু একই দৃশ্যের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা আছে, “গোপালগঞ্জে ঢাল-বর্শা নিয়ে আওয়ামী লীগের মিছিল।”
এছাড়া, প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে একাধিক মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের মিছিলের একাধিক প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায় (১, ২, ৩)।
অর্থাৎ, ঝিনাইদহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের টেঁটা-বল্লম নিয়ে শোডাউন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি গোপালগঞ্জের পুরোনো ঘটনার।
প্রসঙ্গত, ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ দিনকে কেন্দ্র করে দলটির নেতা–কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল করেছেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগের। ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়।