মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক রাঙ্গামাটিতে আদিবাসীদের ওপর হামলা ও অস্ত্র বিতরণের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও দুটি আসামের চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য

রাঙ্গামাটিতে আরাকান বাহিনীর হামলা ও অস্ত্র বিতরণের ভিডিও চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, আরাকান বাহিনী রাঙ্গামাটির আদিবাসীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আরেকটি ভিডিও পোস্টে দাবি করা হয়েছে, আরাকান বাহিনীর সদস্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিও দুটি প্রকৃতপক্ষে ভারতের আসামে নির্মিত বড়ো ভাষার একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের ফুটেজ।

গত ১৯ আগস্ট ফেসবুকে “পাহাড় ভয়েস” নামের একটি পেজ থেকে ভিডিও দুটি পোস্ট করা হয়। প্রথম ভিডিওতে লেখা ছিল, “রাঙ্গামাটি পাহাড়ি এলাকায় বাঙালি এবং আদিবাসী যারা আছে তাদের উপর প্রতিনিয়ত অত্যাচার করতেছে ভিডিওতে দেখুন আদিবাসীদের উপর হামলা করে কেমন করে পালাচ্ছে আরাকান বাহিনী।” ভিডিওর ওপর যুক্ত লাল ব্যানারেও লেখা হয়, “আদিবাসীদের উপর হামলা করে পালাচ্ছেন আরাকান বাহিনী, এই আরাকান বাহিনীর জন্য আদিবাসীরা শান্তিতে বসবাস করতে পারতেছে না…।” ২৯ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে দেখা যায়, গাছপালাঘেরা একটি স্থানে ধোঁয়ার মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি ছুটে পালাচ্ছেন, পাশে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী তাঁবু। এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত, ভিডিওটি ১৭ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে। 

ফ্যাক্টচেক রাঙ্গামাটিতে আদিবাসীদের ওপর হামলা ও অস্ত্র বিতরণের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও দুটি আসামের চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য
ভুয়া দাবিতে ছড়ানো ফেসবুক ভিডিওর স্ক্রিনশট।

একই পেজ থেকে পোস্ট করা দ্বিতীয় ভিডিওতে দাবি করা হয়, “গতকাল আরাকান বাহিনী তাদের নারী-পুরুষ সবাইকে হাতে পিস্তল দিয়ে আগামীকালের জন্য প্রস্তুত করতেছে…।” ভিডিওর ভেতরে লেখা, “গতকাল আরকান বাহিনী তাদের নারী পুরুষ সবাইকে হাতে পিস্তল দিয়ে ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত করতেছে।” ১৮ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে দেখা যায়, সামরিক ধাঁচের পোশাক ও সরঞ্জাম পরিহিত কয়েকজন নারী-পুরুষ বনের মধ্যে একটি বাঁশের তাঁবুর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এবং রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের প্রত্যেকের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে। 

এই দুই দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিও দুটির কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। তাতে ‘দেরহাসার ব্রামহা’ (Derhasar Brahma) নামের একটি ফেসবুক পেজে ১৭ আগস্ট ও ১৪ আগস্ট (২০২৬) আপলোড হওয়া দুটি পৃথক ভিডিওর সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৭ আগস্ট আপলোড হওয়া ভিডিওটির সঙ্গে প্রথম দাবিতে (হামলা করে পালানো) ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ১৪ আগস্ট আপলোড হওয়া  ভিডিওটির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় দ্বিতীয় দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর (হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুতির দৃশ্য)। এই পেজে ভিডিও দুটির পোস্টে ফিল্ম মেকিং, মুভিজ, অ্যাকশন মুভিজ, শুটিং-এ ধরনের হ্যাশট্যাগ লেখা ছিল।

  • ফ্যাক্টচেক রাঙ্গামাটিতে আদিবাসীদের ওপর হামলা ও অস্ত্র বিতরণের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও দুটি আসামের চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য
  • ফ্যাক্টচেক রাঙ্গামাটিতে আদিবাসীদের ওপর হামলা ও অস্ত্র বিতরণের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও দুটি আসামের চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য

প্রথম দাবির সঙ্গে মিলে যাওয়া মূল ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ৩৩ সেকেন্ড। এর শুরুর দৃশ্যেই দেখা যায়, কমলা রঙের টুপি ও জলপাই রঙের পোশাক পরা একজন ব্যক্তি হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার পাশে ট্রাইপডে বসানো একটি পেশাদার ভিডিও ক্যামেরা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া মূল ভিডিওতে থাকা গাছপালা, ধুলা ও ধোঁয়ার দৃশ্যের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্যের হুবহু মিল পাওয়া যায়, যা নিশ্চিত করে দুটি একই ফুটেজ। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শুধু ধোঁয়া ও ছুটে পালানোর অংশটুকু রেখে পোস্ট করা হয়েছে, যাতে এটি প্রকৃত হামলার দৃশ্য বলে মনে হয়। 

দ্বিতীয় দাবির সঙ্গে মিলে যাওয়া ভিডিওর দৈর্ঘ্যও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সঙ্গে মিলে যায়। এতে দেখা যায়, রাইফেল হাতে সামরিক পোশাক পরা এক নারী বনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার পাশে আরও একজন একই ধরনের পোশাকে অস্ত্র হাতে অবস্থান করছেন। এই একই ভিডিও “sona basumatary” নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলেও পাওয়া যায়।

কিওয়ার্ড সার্চে দেখা যায়, দেরহাসার ব্রামহা ভারতের আসামের উদালগুড়ি এলাকাভিত্তিক একজন ক্যামেরাপারসন। তার ফেসবুক পেজে একই চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণের আরও কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ (,,) পাওয়া যায়, যেখানে অস্ত্রসজ্জিত ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যে দেখা যায়।

অর্থাৎ, রাঙ্গামাটিতে আরাকান বাহিনীর হামলা ও অস্ত্র বিতরণের নামে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দুটি প্রকৃতপক্ষে আসামের একটি বড়ো ভাষার চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের দৃশ্য, বাস্তব কোনো ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।

উল্লেখ্য, আরাকান আর্মি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সক্রিয় একটি সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী, যারা মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে।

আরো কিছু লেখা