নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্ট চেক ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে

ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ঝোপঝাড়ে পড়ে থাকা এক নারীর মরদেহের ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনাটি বাংলাদেশের। অত্যাচার ও নির্মম হত্যার শিকার এই নারীর হত্যাকারীর বিচারও চাওয়া হয় সেখানে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের দাবিতে ছড়ানো ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। মূল ছবিটি ভারতের একটি রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকার দৃশ্য।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ১৮ এপ্রিল কলকাতার পূর্ব রেলের ব্যান্ডেল-কাটোয়া শাখার বিষ্ণুপ্রিয়া হল্ট স্টেশনের আপ প্ল্যাটফর্মের কাছে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকার দৃশ্য এটি। আর সেই নিহত নারীর ছবিটি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে বাংলাদেশের বলে ছড়ানো হচ্ছে।

গত ২৪ এপ্রিল ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ছবিটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “হায়নায় ভরে গেছে বাংলাদেশ বাংলায় সকল মা- বোনে*দের অপর অত্যা*চারের ও নি*র্মম হ*ত্যা কারীদের শাস্তি চাই।” (লেখা অপরিবর্তিত)

ফ্যাক্ট চেক ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে
ছবিটি বাংলাদেশের দাবিতে ছড়ানো ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, ঝোপের মধ্যে এক নারীর দেহ পড়ে আছে। তার পরনে নীল রঙের হাফ-হাতা জামা এবং গাঢ় নীল রঙের পায়জামা। এক হাতে শাঁখা পলা, অন্য হাতেও শাঁখা দেখা যাচ্ছে। কপালে কালো টিপও দেখা যায়। 

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে দেড় হাজারের বেশি। মন্তব্য যাচাইয়ে দেখা যায়, অনেকেই পোস্টটিকে বাংলাদেশের বলে ধরে নিয়েছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটা বাংলাদেশ এ দেশে না আছে কোন আইন না আছে কোন বিচার।,” আরেকজন লিখেছেন, “ভালো নেই বাংলাদেশ ভালো নেই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছে।” 

ছবির সত্যতা যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ফেসবুকের একাধিক (, ) ব্যক্তিগত প্রোফাইলের পোস্ট পাওয়া যায়। সনাতনী হিন্দু উত্তম নামের ভারত থেকে পরিচালিত একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে হুবহু একই ছবি শেয়ার করতে দেখা যায় গত ১৯ এপ্রিল। সেই পোস্টের ক্যাপশনে ভারতের একটি জায়গার নাম উল্লেখ করে লেখা, “শ্রী চৈতন্য দেবের জন্মভূমি নবদ্বীপ ধাম বিষ্ণুপ্রিয়া স্টেশন এলাকা সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গা হিসেবে মনে করি সেখানকার আজ এই দশা দেখে আমি সত্যি খুব চিন্তিত মর্মাহত রাত্রে অন্ধকারে কেউবা কারা এই বউটাকে মেরে ফেলে রেখে গেছে।” ছবির ডান কোণে গুগল জেমিনির লোগো দেখতে পাওয়া যায়।

ফ্যাক্ট চেক ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে
ভারত থেকে পরিচালিত ফেসবুক প্রোফাইলের ফেসবুক পোস্টে একই ছবি পাওয়া যায় যেগুলোর ডান কোণে গুগল জেমিনির লোগো দেখতে পাওয়া যায়।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির “ন্যানো বানানা” মডেল ব্যবহার করে ছবি সম্পাদনা করলে সেই ছবিতে এমন জলছাপ থাকে। এছাড়া এআই শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। 

এ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে, সংশ্লিষ্ট কিওয়ার্ড সার্চ করলে সামাজিক মাধ্যম এক্সের একাধিক (, , , ) পোস্ট সামনে আসে। পোস্টগুলোতে এআই ছবিটির প্রকৃত সংস্করণটি দেখা যায়। একটি পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “রাজ্যের নারী সুরক্ষার বেহাল নির্দশন। বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার মহিলার মৃতদেহ অনুমান করা হচ্ছে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে নবদ্বীপের বিষ্ণুপ্রিয়া হল্ট রেল স্টেশনের পাশে।” 

  • ফ্যাক্ট চেক ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে
  • ফ্যাক্ট চেক ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে

মূল ছবিতে যদিও নারীর চেহারা ও পোশাক অস্পষ্ট করে দেওয়া আছে। তবুও সেখানে দেখা যায়, ঝোপের মধ্যে অর্ধবিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছেন সেই নারী। তার পরনে নীল ও লাল রঙের কাপড় দেখা যায়। দুই হাতে শাখা পলা দেখতে পাওয়া যায়। ছবিতে থাকা ঝোপঝাড়, সেখানে পড়ে থাকা বস্তু, নারীটির হাতের এবং পায়ের অবস্থান; সবই এআই ছবিটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এআই ছবিতে নারীটিকে যে অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়, মূল ছবিতে ঠিক একইভাবে আছেন তিনি। 

ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে একাধিক (, ) ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিও প্রতিবেদন সামনে আসে। “এক্সপ্রেস নদীয়া” নামের চ্যানেলের ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, “ভোটের আগে নবদ্বীপে রহস্যমৃত্যু! নগ্ন মহিলার মৃতদেহ উদ্ধারের পর চাঞ্চল্য,…।” এ ভিডিওটির প্রথম ৫ থেকে ৮ সেকেন্ডে ঝোপের মধ্যে মৃতদেহ পড়ে থাকার দৃশ্যটি দেখা যায়।

ফ্যাক্ট চেক ভারতীয় নারীর মরদেহের ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে
ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

সংশ্লিষ্ট কিওয়ার্ড সার্চ করলে একাধিক (, , , , ) ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যেখানে ঘটনাটি ভারতের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “নবদ্বীপে স্টেশনের ধারে মহিলার বিবস্ত্র দেহ উদ্ধার! স্থানীয়দের দাবি, ধর্ষণের পরে খুন করা হয়েছে।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “শনিবার সকালে বিষ্ণুপ্রিয়া হল্ট স্টেশনের আপ প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে ঝোপের মধ্যে এক মহিলার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা।” 

অর্থাৎ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধারের দৃশ্য এআই দিয়ে সম্পাদনা করে ছড়ানো হচ্ছে বাংলাদেশের দাবিতে, যা সঠিক নয়।  

আরো কিছু লেখা