আহমেদ ইয়াসীর আবরার

সিনিয়র রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Media framing of Pink Bus Feature

পিংক বাসের চালক এবং মিডিয়ার সমস্যাজনক ফ্রেমিং

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

সিনিয়র রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

রাজধানীসহ কয়েকটি শহরে নারীদের জন্য চালু হওয়া বাসের এক নারী চালকের ‘ফ্লাইওভারে উঠতে না পারার’ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম এমন শিরোনাম প্রকাশ করেছে, যেখানে নারী চালকের ব্যর্থতা এবং পুরুষ চালকের সহায়তাকে দৃষ্টিকটুভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের নেতিবাচক ফ্রেমিং লিঙ্গভিত্তিক স্টেরিওটাইপকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়তে পারে।

ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জেলায় চালু হওয়া নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের এসব বাসে চালক ও সহযোগী হিসেবে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। নারী বাস চালকদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের মতামত, মিম ও স্যাটায়ার পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। আর  ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর দ্বিতীয় দিনেই কয়েকটি গণমাধ্যমে নারী চালকদের নিয়ে নেতিবাচক ফ্রেমিং দেখা যায়।  প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে এবং ফেসবুকে পোস্ট করা ভিডিওতে গণমাধ্যমগুলো বলছে, ফ্লাইওভারে বাস নিয়ে উঠতে ‘ব্যর্থ হয়েছে নারী চালক’ আর ‘তাদের উদ্ধার করতে দরকার হয়েছে পুরুষ চালকদের’।

গণমাধ্যমের ফ্রেমিং: নারী চালকের ব্যর্থতা আর পুরুষের সহায়তা 

কয়েকটি গণমাধ্যমে ও তাদের ফেসবুক পেজে দেওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একজন নারী বাস চালকের আসন থেকে উঠে যাচ্ছেন এবং তার স্থানে একজন পুরুষ বসছেন। ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে, নারীটি আসন পরিবর্তনের এই দৃশ্য ধারণ না করতে অনুরোধ করছেন। দৈনিক যুগান্তরের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়, “ফ্লাইওভারে বাস উঠাতে না পেরে পুরুষ চালকের সাহায্য নিলেন নারী চালক।” দৈনিক ইত্তেফাকের ফেসবুক পেজেও একই ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়, “ফ্লাইওভারে বাস উঠাতে ব্যর্থ নারী চালক, নিতে হলো পুরুষ চালকের সাহায্য।” ভিডিওতে  দৈনিক ইনকিলাব বলছে, “ফ্লাইওভারে আটকে গেলো পিংক বাস উদ্ধার করলেন পুরুষ চালক।” এছাড়া দৈনিক নয়াদিগন্ত, দৈনিক গণকণ্ঠ, মিরর নিউজসহ বেশ কিছু গণমাধ্যমের পেজে প্রায় একই ধরনের শিরোনামে ভিডিওটি পোস্ট হতে দেখা যায়।

দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক ইনকিলাবের ফেসবুক পেজ থেকে করা পোস্টের স্ক্রিনশট

আরটিভি নিউজের প্রতিবেদনের শিরোনাম, “ফ্লাইওভারে উঠতে বিপাকে ‘পিংক বাস’, হাল ধরলেন পুরুষ চালক”। প্রতিবেদনে বলা হয়, “জানা গেছে, এ দিন ফ্লাইওভারে ওঠার সময় কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়েন বাসটির চালক ফাহিমা সানজান। ফ্লাইওভারের ঢাল বেয়ে দোতলা বাসটি ওপরে তুলতে ব্যর্থ হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বাসটি থামিয়ে দেন। পরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কিংবা দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি এড়াতে একজন পুরুষ চালকের সহযোগিতা নেওয়া হয়। তার সহায়তায় বাসটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় এবং তিনি বাসটি চালিয়ে ফ্লাইওভারে তোলেন।”

দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের ফেসবুক পেজ থেকে করা পোস্টের স্ক্রিনশট

একই তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর (ফ্লাইওভারে উঠাতে ব্যর্থ পিংক বাসচালক, সহায়তায় পুরুষ ড্রাইভার), বাংলাদেশ টাইমস (‘পিংক বাস’ ফ্লাইওভারে তুলতে ব্যর্থ, সহায়তায় এগিয়ে এলেন পুরুষ চালক), দীপ্ত নিউজ (ফ্লাইওভারে ‘পিংক বাস’ তুলতে ব্যর্থ নারী চালক, সহায়তায় পুরুষ চালক), বৈশাখী অনলাইন (ফ্লাইওভারে উঠতে বিপাকে ‘পিংক বাস’, হাল ধরলেন পুরুষ চালক), দৈনিক আজকালের খবর (ফ্লাইওভারে উঠতে বিপাকে ‘পিংক বাস’, হাল ধরলেন পুরুষ চালক), টাইমস টুডে (ফ্লাইওভারে বাস উঠাতে ব্যর্থ নারী চালক, সহায়তা নিলেন পুরুষ চালকের), দৈনিক গণকণ্ঠ (ফ্লাইওভারে উঠতে বিপাকে ‘পিংক বাস’, সহায়তা করলেন পুরুষ চালক), এনপিবি নিউজ (ফ্লাইওভারে উঠতে বিপাকে ‘পিংক বাস’, সহায়তা করলেন পুরুষ চালক)। প্রায় একই ধরনের শিরোনাম দিয়েছে আরও অনলাইন গণমাধ্যম।

এই ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম

এই বিষয়ে সেই নারী চালক দেশ টিভিকে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি পানি পান করার জন্য চালকের আসন থেকে উঠলে তার প্রশিক্ষক সেখানে গিয়ে বসেন।  তিনি বলেন, “ফ্লাইওভারে যদি আমরা গাড়ি না উঠাতে পারি এমনি এমনি তো স্টিয়ারিং হাতে নেই নাই।”

এছাড়া, চালকের আসন পরিবর্তনের ভিডিও থেকে পাওয়া সূত্র ধরে জিওলোকেশন খুঁজতে গেলে ডিসমিসল্যাব দেখতে পায়, খিলগাঁও ফ্লাইওভারে ওঠার প্রায় ১৫০ মিটার আগে বাসটির অবস্থান ছিল। অর্থাৎ, ভিডিওটি ধারণের সময় বাসটি ফ্লাইওভারের কাছে ছিল না বা ওঠেনি। ফলে ভিডিওটি দিয়ে নারী চালক ফ্লাইওভারে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন, এমন দাবি নিশ্চিত করা যায় না। 

চালক নারী বলেই কি এমন শিরোনাম? 

নারী চালক সত্যিই ফ্লাইওভারে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার পর পুরুষ চালকের সহায়তা নিয়েছিলেন কি না, তা ডিসমিসল্যাব স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। কিন্তু নারী চালক ব্যর্থ হয়ে থাকলেও, সেটি কি সংবাদ হওয়ার বা এমন শিরোনাম দেওয়ার মতো ঘটনা?  কোনো পুরুষ চালক যদি নিজের পেশাদার জীবনের শুরুতে এমন সমস্যার সম্মুখীন হন, তাহলেও কী একইভাবে সংবাদ প্রকাশ হতো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছে ডিসমিসল্যাব।

সাংবাদিক এবং প্রশিক্ষক কুররাতুল-আইন-তাহমিনা মনে করেন, ‘নারী চালক ব্যর্থ’ এটা কোনো নিউজের বিষয় না। তিনি বলেন, “মেয়ে বাস চালাবে এটি নিয়ে আমাদের মনের মধ্যে প্রচলিত ধারণা অন্যরকম। এত বড় ভারী বাস মেয়ে চালাতে পারবে কিনা, এই চিন্তার ভেতরেই এটি আছে।” তিনি বলেন, এই চিন্তা থেকেই ঘটনাটিকে মজা করে হাইলাইট করা যে “মেয়ে পারে নাই”। 

নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার সিনিয়র লেকচারার মার্সি এটে দ্য ইন্টারন্যাশনাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব জেন্ডার, মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন-এর  “জার্নালিজম অ্যান্ড জেন্ডারড মিডিয়েশন” শিরোনামের নিবন্ধে জেন্ডারড মিডিয়েশনের ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, সংবাদমাধ্যম কোনো ঘটনা কীভাবে উপস্থাপন করছে, তা নারী ও পুরুষের ভূমিকা ও সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। 

তিনি লিখেছেন, “কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও সংবাদে নারী-পুরুষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ও অনুমান প্রতিফলিত হলে, সংবাদ উপস্থাপন লিঙ্গভিত্তিক হয়ে ওঠে।”

“সাংবাদিকরা তাদের প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে প্রভাবিত অর্থ ও ব্যাখ্যার কাঠামোর মধ্যে সংবাদ তৈরি করেন। সমাজে প্রচলিত এবং সংস্কৃতিনির্ধারিত অভিন্ন ধারণা ও অর্থের ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকরা তাদের সমাজ সম্পর্কে সম্মিলিত ধারণা তৈরি ও আরও শক্তিশালী করেন।”

কুররাতুল-আইন-তাহমিনা মনে করেন, এই ধরনের প্রতিবেদন আমাদের মধ্যে ইতিমধ্যে থাকা বদ্ধমূল ধারণাকে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি বলেন, “(এ ধরনের প্রতিবেদন) স্টেরিওটাইপটা জোরদার করে। যখন আলাদা করে কোনো যুক্তি ছাড়া, প্রেক্ষাপট ছাড়া এভাবে কোনো কিছুকে হাইলাইট করা হয়, তখন এই চিন্তাটা অন্যদের মধ্যেও যায়।”

তিনি আরও যুক্ত করেন, এমন রিপোর্টিং থেকে কোনো কাঠামোগত সমস্যার কথাও জানা যায় না। এসব প্রতিবেদনে বাসের কারিগরি ব্যবস্থা কেমন ছিল বা রাস্তায় নিরাপত্তার পরিস্থিতি কেমন, সেসব প্রশ্নও উঠে আসছে না।

আরো কিছু লেখা