জান্নাতুল ফিরদাউস

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে পুরোনো ও ভিন্ন দেশের দৃশ্য ব্যবহার করেছে যুগান্তর

ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে পুরোনো ও ভিন্ন দেশের দৃশ্য ব্যবহার করেছে যুগান্তর

জান্নাতুল ফিরদাউস

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ঘটনায় একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম দৈনিক যুগান্তর। প্রতিবেদনটিতে একাধিক দৃশ্য ব্যবহার করা হয় যেগুলো ভিন্ন কোনো দেশের বা ইন্দোনেশিয়ারই পুরোনো কোনো ভূমিকম্পের ভিডিও ফুটেজ। এসব দৃশ্যের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি এগুলো পুরোনো বা ফাইল ফুটেজ।

গত ১৫ আগস্ট শনিবার ভোরে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেদিনই দৈনিক যুগান্তরের অফিশিয়াল পেজ থেকে এক মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বর্ণনায় লেখা, “ইন্দোনেশিয়ায় ভ`য়াবহ ভূ`মিকম্প, নি`হ`ত ২” (বানান অপরিবর্তিত)। একই ভিডিও আপলোড করা হয় সংবাদমাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলেও। পুরো ভিডিওতে একাধিক ফুটেজ একের পর এক দৃশ্যমান হতে দেখা যায়।

ভিডিওর শুরুতে একটি ভূমিকম্পের দৃশ্যে কয়েকটি শিশুকে দেখা যায়। রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, এই ফুটেজটি ফ্রান্সভিত্তিক গণমাধ্যম ইউরো নিউজের দুই মাস পুরোনো একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। সে প্রতিবেদনে এ দৃশ্য ফিলিপাইনে ৮ জুন ২০২৬-এ আঘাত হানা ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের বলে উল্লেখ করা হয়।

ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে পুরোনো ও ভিন্ন দেশের দৃশ্য ব্যবহার করেছে যুগান্তর
যুগান্তরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজ (বামে) এবং ফ্রান্সভিত্তিক গণমাধ্যম ইউরো নিউজের প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

যুগান্তরের ভিডিওতে থাকা দ্বিতীয় ফুটেজে দেখা যায়, একটি সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ। রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায় এটিও পুরোনো একটি ভিডিও। প্রথম আলোর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনে একই দৃশ্য দেখা যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে একে ইন্দোনেশিয়ার প্রদেশ সেন্ট্রাল পাপুয়ায় আঘাত হানা ৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের ভিডিও হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ, এটি পুরোনো ভিডিও।

ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে পুরোনো ও ভিন্ন দেশের দৃশ্য ব্যবহার করেছে যুগান্তর
সাম্প্রতিক দাবিতে ছড়ানো ভিডিও (বামে) এবং ২০২৫ সালে ঘটা ভূমিকম্প নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

যুগান্তরের ভিডিওর ২০ সেকেন্ডে আরেকটি ভূমিকম্পের দৃশ্য দেখা যায়। সূত্র অনুসন্ধান করতে গেলে তুর্কি গণমাধ্যম ইয়েনি সাফাকের চার মাস পুরোনো একটি প্রতিবেদনে ভিডিওতে দৃশ্যটি দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি চলতি বছরের ২ এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর মালুকুতে হওয়া ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের দৃশ্য। এটিও পুরোনো ভূমিকম্পের দৃশ্য।

ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে পুরোনো ও ভিন্ন দেশের দৃশ্য ব্যবহার করেছে যুগান্তর
যুগান্তরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজ (বামে) এবং তুর্কি গণমাধ্যম ইয়েনি সাফাকের পুরোনো প্রতিবেদন (ডানে)।

যুগান্তরের প্রতিবেদনের ২৬ সেকেন্ডের অংশ থেকে নেওয়া কিফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ইউটিউবে ইন্দোনেশিয়ায় সংঘটিত চার মাস পুরোনো ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের ভিডিও পাওয়া যায়। একই ঘটনার বিষয়ে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর একটি পুরোনো প্রতিবেদনও পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত ভিডিওতে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের যে দৃশ্য দেখা যায়, তার সঙ্গে যুগান্তরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজের ভবনের মিল রয়েছে। এর সঙ্গে ১৫ আগস্টে হওয়া ভূমিকম্পের কোনো সম্পর্ক নেই।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজ (বামে) এবং এপির প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

যুগান্তরের ভিডিও প্রতিবেদনের ৪২ সেকেন্ডে উত্তাল ঢেউয়ের একটি দৃশ্য দেখা যায়। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, এই ভিডিওটি ইন্দোনেশিয়ারই নয়, চীনের। ভারত-ভিত্তিক গণমাধ্যম এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। চলতি বছরের ১২ জুলাইয়ে প্রকাশিত এই ভিডিওতে এটিকে চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে আঘাত হানা টাইফুন বাভি বলে উল্লেখ করা হয়। এনডিটিভির প্রতিবেদনের প্রথম ১৮ সেকেন্ড পর্যন্ত ব্যবহৃত ফুটেজের সঙ্গে যুগান্তরের ভিডিওর ৪২ থেকে ৪৭ সেকেন্ডে ব্যবহৃত ফুটেজের মিল পাওয়া যায়। ভিডিওটি চীনের কিনা যাচাই করা না গেলেও এটি ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের নয় বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজ (বামে) এবং এনডিটিভির প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

ভিডিওর এক মিনিট আট সেকেন্ডে একটি ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখা যায়। রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায় এটিও গত এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ায় হয়ে যাওয়া ভূমিকম্পের দৃশ্য, গত ১৫ আগস্টের নয়। ইন্দোনেশিয়া-ভিত্তিক গণমাধ্যম বেরিতা নাসিওনালের ২ এপ্রিলে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই ঘটনার একটি স্থিরচিত্র যুক্ত করা হয়। ক্যাপশনে একে একটি গির্জার দৃশ্য বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, এটিও পুরোনো একটি ভূমিকম্পের দৃশ্য।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ফুটেজ (বামে) এবং এপ্রিলে ঘটা ভূমিকম্প নিয়ে প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

উপরে উল্লেখ করা দৃশ্যগুলোর সঙ্গে গত ১৫ আগস্টে ইন্দোনেশিয়ায় হওয়া ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্পর্ক না থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে কোনো ধরনের লেবেল ছাড়াই। 

পুরোনো ছবি বা ভিডিওর ক্ষেত্রে যথাযথ লেবেলের পরামর্শ

ট্রাস্টিং নিউজ তার একটি নির্দেশনায় বলছে, কোনো সংবাদে আর্কাইভ বা ফাইল ফুটেজ ব্যবহার করতে হলে যথাযথ লেবেল যুক্ত করা উচিত। নির্দেশনায় বলা হয়, “পাঠক/দর্শকের জানতে হবে তারা যা দেখছে সেটি সংবাদের অংশ হিসেবে ধারণ করা হয়নি। একইসঙ্গে, তারিখ এবং স্থান উল্লেখ করাও জরুরি।” এছাড়া ভিডিও বা ছবির ক্যাপশন যুক্ত করাও জরুরি। এক্ষেত্রে সংবাদের সঙ্গে দৃশ্যের সম্পর্ক খুব স্পষ্ট হলেও, কখনো কখনো দর্শকের জন্যে ব্যাখ্যা জরুরি হতে পারে। পাশাপাশি, দৃশ্যটি কে ধারণ করেছে সেটি উল্লেখ করতে হবে। যদি কোনো দৃশ্য সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া হয়, সেটিও উল্লেখ করতে হবে।

আরো কিছু লেখা