মডেল ও রাজনীতিবিদ মেঘনা আলম গত ৮ সেপ্টেম্বর নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। দাবি করেন, তার বর্তমান জীবনধারা ও পছন্দ উপেক্ষা করে সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে অতীতের ছবি।
মেঘনা আলমের এই অভিযোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় জীবনযাপনে গুরুত্ব দেওয়া বাংলাদেশের দুই নারী অভিনয়শিল্পী সাদিকা পারভীন পপি ও পুষ্পিতা পপিকে নিয়ে প্রতিবেদনে ছবির ব্যবহারেও একই চিত্র দেখা গেছে।
সম্প্রতি চলচ্চিত্রশিল্পী সাদিকা পারভীন পপি ধর্মীয় কারণে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গত ৩০ আগস্ট ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “আল্লাহ-খোদার নাম নিয়ে সব পাপ ধুয়েমুছে সুন্দরভাবে মরতে চাই: পপি।” প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু তার বর্তমান জীবনধারা ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে; কিন্তু প্রতিবেদনে পপির ঘোমটা দেওয়া নতুন ছবির পাশাপাশি পুরোনো ছবিও ব্যবহার করা হয়। তবে এই প্রতিবেদন নিয়ে ফেসবুকের জন্য তৈরি করা ফটোকার্ডে ঘোমটা দেওয়া ছবির পাশাপাশি আরও তিনটি ছবি ব্যবহার করা হয়, যার দুটিতে তাকে স্বল্প পোশাকে এবং বিশেষ ভঙ্গিতে দেখা যায়। সংবাদমাধ্যমটি পরে তাদের ফটোকার্ডটি সরিয়ে নেয়। তবে দ্বিতীয় ফটোকার্ডেও বর্তমান ছবির পাশাপাশি একটি পুরোনো ছবি ব্যবহার করা হয়।

ধর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে ২০১৯ সালে চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন অভিনয়শিল্পী পুষ্পিতা পপি। কিন্তু ২০২৩ সালে নতুন করে পুষ্পিতার অভিনয় ছেড়ে ধর্মীয় জীবন বেছে নেওয়া নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে একাধিক সংবাদমাধ্যম (১, ২, ৩, ৪)। সেসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিনয়কে বিদায় জানানোর ছাপ সামাজিক মাধ্যমেও পাওয়া গেছে। নিজের সব ছবি তিনি সরিয়ে ফেলেছেন সেখান থেকে। কিন্তু সবগুলো প্রতিবেদনেই তার অতীতের ছবি ব্যবহার করা হয়। অথচ এই অভিনয়শিল্পীর সামাজিক মাধ্যমে তার ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবি ছিল। কোনো কোনো প্রতিবেদনে সে ছবি ব্যবহার করলেও অতীতের অভিনয় জীবনের ছবি যোগ করা থেকে গণমাধ্যমগুলো বিরত থাকেনি।

কেবল দেশের অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে নয়, ভারতীয় নারী শিল্পীদের অভিনয় ছাড়ার খবরেও সংবাদমাধ্যমে অপ্রাসঙ্গিক পুরোনো ছবি ব্যবহারের এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-এ ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— “শোবিজ ছেড়ে ধর্মের পথ বেছে নেওয়ার কারণ জানালেন সানা খান”। সংবাদটিতে বলিউড অভিনেত্রী সানা খানের বিনোদন জগৎ থেকে বিদায় নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও, প্রতিবেদনের ভেতরে তার বর্তমান ছবির পাশেই একটি পুরোনো অপ্রাসঙ্গিক ছবি জুড়ে দেওয়া হয়। মূল খবরের প্রেক্ষাপটে এই পুরোনো ছবিটির কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি ২০২০ সালের অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী সানা খান ২০২০ সালেই শো বিজ অঙ্গন ছাড়ার ঘোষণা দেন এবং ঐ প্রতিবেদনে তার সে সময়ের ছবিই ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ তার বর্তমান ছবি থাকার পরও ঢাকা ট্রিবিউন ২০২২ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সানা খানের পুরনো ছবি ব্যবহার করে। এছাড়া সানা খানের ব্যক্তিগত সোশাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোতে তার বর্তমান সময়ের ছবি রয়েছে।

অনুরূপভাবে, ২০২২ সালে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অভিনয় ছাড়ার ঘোষণা দেন ভারতীয় ভোজপুরি চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী সাহার আফশা। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত ‘ঢাকা মেইল’-এর একটি প্রতিবেদনের শুরুতে লেখা হয়, “ধর্মের টানে অনেক ভারতীয় চলচ্চিত্র তারকা অভিনয়কে বিদায় জানিয়েছেন। এবার সেই তালিকায় নাম লেখালেন ভোজপুরি সিনেমার আবেদনময়ী নায়িকা সাহার আফশা।” এই প্রতিবেদনে আফশার নতুন হিজাব পরা ছবির পাশাপাশি পুরোনো স্বল্প পোশাক পরা একটি ছবিও ব্যবহার করা হয়।

ব্যক্তির পছন্দ ও বর্তমান অবস্থান উপেক্ষিত
সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের প্রতিবেদন অপ্রাসঙ্গিক ছবি ব্যবহার কেন করা হয়, তার ব্যাখ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৃধা মো. শিবলী নোমান আর্থিক বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি মনে করেন, কনটেন্ট থেকে আয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা বদলে গেছে।
“গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজ-সংস্কৃতি পরিবর্তনের চেয়ে সমাজ-সংস্কৃতির মন-মতো আধেয় তৈরি ও প্রচার করতে হচ্ছে। নারী ও নারীর শরীর সেই দিক থেকে আধেয়র প্রতি বৃহৎ সংখ্যক অডিয়েন্সকে টেনে নেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার।”
চলচ্চিত্র ও অন্যান্য মিডিয়ায় নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও নারী অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে প্রতিবেদনে কখনও কখনও জেন্ডার-অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার করা হয়। কাজ, অভিনয় ও দক্ষতার পরিবর্তে পোশাক ও শারীরিক সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক সময় ওই ব্যক্তির মতও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
মেঘনা আলম অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে পুরোনো ছবি ব্যবহারের বিষয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়েছেন। সে ফটোকার্ডে লেখা ছিল, “আমি মাথায় কাপড় দিয়ে থাকি প্রায় ২ বছর। এদিকে মিডিয়া সব নিউজ করে আমার আগের ক্লিভেজ শো করা। একজন নারীর চয়েস, কমফোর্ট, মডেস্টি সব কিছুর চেয়ে ভিউ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছা থাকলেও পর্দা করা সম্ভব না।”
সংবাদমাধ্যমে নারীদের উপস্থাপনে এ ধরনের বৈষম্য নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও নারীদের ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে। ২০২৩ সালে জার্নালিজম অ্যান্ড মাস কমিউনিকেশন কোয়াটারলিতে প্রকাশিত “লিঙ্গভিত্তিক গৎবাঁধা চিন্তার বিদায়? ১১ বছরের সংবাদে রাজনীতিবিদদের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ” শিরোনামের গবেষণায় দেখা গেছে, নারী রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে ‘সুন্দরী’ বা ‘আকর্ষণীয়’র মতো প্রথাগত নারীসুলভ শারীরিক বৈশিষ্ট্য বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুরুষ রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে নৈতিকতাসূচক শব্দ, যেমন ‘ভদ্র’ ও ‘নৈতিক’ এবং ‘যৌক্তিক’ ও ‘বিশ্লেষণধর্মী’র মতো বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়।
সমাজের ধারণা অনেকটা এমন যে পুরুষ একটা বয়স পর্যন্ত বখাটেপনা-বেলেল্লাপনা করবে আর শেষ বয়সে নিজেকে সংশোধন করে নিবে ও সে জন্য সে প্রশংসার দাবিদার; অন্যদিকে, একবার সমাজের দৃষ্টিতে নারী পথচ্যুত হলে প্রচলিত অর্থে সঠিক পথে ফিরলেও তার অতীতকর্মের দায়মুক্তি ঘটবে না।
মৃধা মো. শিবলী নোমান
সহকারী অধ্যাপক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২০২২ সালে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের নিয়ে করা সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে হওয়া এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কাছ থেকে তোলা ছবি কোনো প্রার্থীকে অধিক বুদ্ধিমান ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। সাধারণত নারীদের ক্ষেত্রে মাঝারি দূরত্ব বা দূর থেকে ছবি তোলা হয় এবং সেখানে তাদের শরীরের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।
ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রেও নারীদের ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতের চেয়ে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নারী ক্রীড়াবিদদের উপস্থাপনায় উন্নতি ঘটলেও, তাদের যৌনবস্তু হিসেবে উপস্থাপন বা ‘অবজেক্টিফিকেশন’-এর ক্ষেত্রে খুব একটা বা কোনো উন্নতিই হয়নি, বিশেষ করে পুরুষ ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে তুলনা করলে।
‘ছবি জনপরিসরে ছিল’—এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
অভিনয়শিল্পীদের পুরোনো ছবি সাধারণত জনপরিসর বা বিভিন্ন আর্কাইভ থেকে সহজেই পাওয়া যায়। তবে কোনো পুরোনো ছবি নতুন একটি প্রেক্ষাপটে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সেটি কতটা প্রাসঙ্গিক এবং তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বর্তমান অবস্থানকে সম্মান করে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুরোনো ছবি ব্যবহারের বিষয়ে মৃধা মো. শিবলী নোমান বলছেন, এ ধরনের প্রতিবেদনে ছবি ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মত গ্রহণ করা উচিত, “পূর্বের ছবি জনপরিসরে উন্মুক্ত রয়েছে, এই যুক্তিতে অনেক সময় এ ধরনের ছবি বা ফুটেজ প্রকাশ করা হয়। তবে সেই যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে খুব সহজেই যোগাযোগের মাধ্যমে এ বিষয়ে সম্মতি নেওয়া সম্ভব।”
মেঘনা আলম পোস্ট অনুযায়ী, পাঠক বাড়াতে নারী শিল্পীর ইচ্ছা ও মত উপেক্ষা করছে সংবাদমাধ্যম, তার বর্তমান ভাবমূর্তির লঙ্ঘনের কথা ভাবা হচ্ছে না। শিবলী নোমান মনে করেন, এর দায় নিতে হবে সমাজকেও। তার মতে ভোক্তাশ্রেণির চাহিদা, ধর্ম ও রাজনীতির প্রভাব এ ধরনের কনটেন্ট সৃষ্টিতে সংবাদমাধ্যমকে উৎসাহিত করছে।
“সমাজের ধারণা অনেকটা এমন যে পুরুষ একটা বয়স পর্যন্ত বখাটেপনা-বেলেল্লাপনা করবে আর শেষ বয়সে নিজেকে সংশোধন করে নিবে ও সে জন্য সে প্রশংসার দাবিদার; অন্যদিকে, একবার সমাজের দৃষ্টিতে নারী পথচ্যুত হলে প্রচলিত অর্থে সঠিক পথে ফিরলেও তার অতীতকর্মের দায়মুক্তি ঘটবে না। এই ব্যাপারটি নারী অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে খুব সহজে কাজ করে তাদের পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও লোক-আলোচনার কারণে।”

