জান্নাতুল ফিরদাউস

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
DBC-old photo

হরমুজে ট্যাংকারে হামলার প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের ছবি ব্যবহার ডিবিসির

জান্নাতুল ফিরদাউস

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম ডিবিসি নিউজ। তবে ওই প্রতিবেদনে এবং সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ফটোকার্ডে ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো ছবি। ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ছবিটি ২০১৯ সালে ওমান উপসাগরে হামলার পর আগুন ধরে যাওয়া একটি তেলবাহী ট্যাংকারের।

ডিবিসি নিউজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে গত ৪ অক্টোবর একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। এতে লেখা ছিল, “হরমুজ প্রণালিতে তেল ট্যাংকারের ইঞ্জিন রুমে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।” ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবিতে একটি জাহাজে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ছবির সূত্র হিসেবে লেখা ছিল, “সংগৃহীত”। মন্তব্যে দেওয়া লিংক থেকে ডিবিসি নিউজের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেদনেও একই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

ছবির সূত্র যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় ২০১৯ সালের ১৫ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ডিবিসির ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবিটির হুবহু মিল পাওয়া যায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে ছবিটির বর্ণনায় বলা হয়, হামলার পর ওমান উপসাগরে আগুন ধরে যাওয়া অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ফ্রন্ট অল্টেয়ার।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে ২০১৯ সালের ১৪ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও একই ছবি ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের একটি প্রধান কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালির কাছে এক মাসের মধ্যে এ ধরনের দ্বিতীয় ঘটনায় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটিতে আগুন ধরে যায়, এবং অপরটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসছিল। ছবির সূত্র হিসেবে বার্তা সংস্থা এপির কথা উল্লেখ করা হয়।

আল জাজিরা এবং দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের ব্যবহৃত ছবির স্ক্রিনশট।

অর্থাৎ, ডিবিসি নিউজে ৪ অক্টোবর হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ২০১৯ সালে ওমান উপসাগরে তেলবাহী একটি ট্যাংকারের ছবি। আল জাজিরার ২০১৯ সালের প্রতিবেদনেও একই ছবিকে ‘ফ্রন্ট অল্টেয়ার’ ট্যাংকারে হামলার পরের দৃশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৪ অক্টোবর হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস-এর (UKMTO) তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ভেতরে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত হানে, এতে জাহাজটির ইঞ্জিন রুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটির ক্রুরা নিরাপদ আছেন এবং পরিবেশগত কোনো ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

পুরোনো ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নিয়ম কী বলে?

সম্প্রচার সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালায় আর্কাইভ থেকে নেওয়া ছবি বা ভিডিও ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নীতিমালার নির্ভুলতা অধ্যায়ের ‘আর্কাইভ উপকরণ’ অংশে বলা হয়েছে, আর্কাইভ থেকে নেওয়া কোনো উপকরণ এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে দর্শক-পাঠক কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্ত হন, প্রয়োজনে তা স্পষ্টভাবে লেবেল করে দিতে হবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, হালনাগাদ থাকার আভাস দেয় এমন যেকোনো সংবাদ বা কনটেন্টে সেটা কবে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল এবং সবশেষ কবে হালনাগাদ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে বিবিসি। যাতে পাঠক প্রকাশের সময় নিয়ে বিভ্রান্ত না হন।

অর্থাৎ, এই নীতিমালা অনুযায়ী, পুরোনো কোনো ছবি নতুন ঘটনার প্রতিবেদনে ব্যবহার করতেই হলে সেটিকে তাৎক্ষণিক ও প্রকৃত দৃশ্য হিসেবে দেখানো যাবে না। স্পষ্টভাবে ‘ফাইল ছবি’ বা আর্কাইভের ছবি হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। সম্ভব হলে ছবিটি ঠিক কবে ও কোথায় ধারণ করা হয়েছিল, তা-ও জানিয়ে দিতে হবে।

প্রসঙ্গত, এর আগেও সংবাদমাধ্যমের পুরোনো ছবি ব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাব।

আরো কিছু লেখা