ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক
সামাজিক মাধ্যম থেকে অর্থ পরামর্শ নিচ্ছেন? ভুয়া তথ্য এড়িয়ে চলুন
This article is more than 2 months old

সামাজিক মাধ্যম থেকে অর্থ পরামর্শ নিচ্ছেন? ভুয়া তথ্য এড়িয়ে চলুন

ডিসমিসল্যাব
অফিসিয়াল ডেস্ক

আমাদের বাবা-মায়েরা অর্থ সংক্রান্ত জটিলতায় পড়লে বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে ব্যাংকে যেতেন, বা কোনো পেশাদার পরামর্শদাতার সহায়তা চাইতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে নতুন প্রজন্মের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।

সামাজিক মাধ্যমগুলোর মধ্যে বিশেষ করে টিকটক সঞ্চয়ের নানা কৌশল থেকে শুরু করে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা বা পুঁজিবাজারে শেয়ার কৌশল- এসব ক্ষেত্রে অর্থ বিষয়ক পরামর্শদানের কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু টিকটকে যেসব তথ্য মিলে সবসময় সেগুলো নির্ভরযোগ্য হয় না। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে ইউটিউবে #স্টকটক হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে শেয়ার করা হয়েছে এমন ৬০ শতাংশের বেশি ভিডিওতে রয়েছে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য।

আগের প্রজন্মের তুলনায় আজকালকার তরুণরা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন বোধ করে। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তরুণরা আর্থিক বিষয় নিয়ে ভাববে, টাকা-পয়সার ব্যাপারে তারা আরও জানতে চাইবে। আমি ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ে তাদের অর্থব্যবস্থাপনা ও লেনদেনের অভ্যাস সম্পর্কে একটি গবেষণা করেছি। আমি ও আমার দল মিলে যে ৮০ জনের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের প্রায় অর্ধেকই জানিয়েছে যে তারা আর্থিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেছে। 

অর্থ নিয়ে তরুণরা যা ভাবছেন

তরুণরা সামাজিক মাধ্যম থেকে অর্থবিষয়ক যেধরনের তথ্য পাচ্ছিল আমরা সেগুলোর প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেছি। আমরা দেখেছি, তাদের অনেকেই সঞ্চয়ের গুরুত্বটা বোঝে, তবে বিনিয়োগ নিয়ে তাদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। অনেকেরই এমন ধারণা ছিল যে তারা যদি শেয়ার বাজার কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ না করে তাহলে সমবয়সীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়বে। ২৪ বছর বয়সী এক অংশগ্রহণকারী বলেন, বিনিয়োগ মানেই এক রকমের ‘ইদুঁর দৌড়’। রাজনীতিবিদদের বক্তব্য ও মুদ্রাস্ফীতি বিষয়ক সংবাদ তরুণদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আমরা দেখেছি, সাক্ষাৎকারদাতাদের অনেকেরই বাড়ির মালিকানা নিয়ে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে। তা হচ্ছে সম্পত্তি ক্রয় মানেই ‘বিনিয়োগ’, আর ভাড়ায় থাকা হচ্ছে ‘অপচয়’। আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা বলেছে, বাড়ি কেনাটা জরুরি, এর ফলে হুট করে বড় অঙ্কের ভাড়া বাড়ানো বা ভাড়া নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বাড়ি ক্রয় সঞ্চয়ের সুযোগ আরো বাড়িয়ে দেয় বলেও ধারণা তাদের।

আবার তাদের অনেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের কথা বলেছেন, ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট-ফোমো’ বা বাদ পড়ে যাওয়ার দুঃশ্চিন্তা থেকে বাঁচতে। তারা সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ্য করছেন যে, ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের বিলাসী জীবনযাপন, যাচ্ছেতাই কেনাকাটা, ছুটিতে ভ্রমণ বা নতুন গাড়ি দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন, যেসবের অর্থ এসেছে সম্ভবত কোনো বিনিয়োগ থেকেই।

তবে আমাদের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা এই বিষয়েও সচেতন যে, এর অনেকটাই লোক-দেখানো।  ইনফ্লুয়েন্সাররা ক্রিপ্টো থেকে নয়, বরং বিনিয়োগের কোর্সের বিজ্ঞাপন থেকেই এসব অর্থ পেয়েছেন। 

অংশগ্রহণকারীদের একজন বলেন, “এমনকি আমার (ছোট) বোনও ক্রিপ্টোকয়েনের মতো খাতে বিনিয়োগ করেছে, অথচ সে এ বিষয়ে কিছুই জানে না। আমার মনে হয় আমাদের থেকে যারা ছোট, তাদের প্রজন্ম এই বিষয়গুলো ভালোই জানে। তবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান এখনো আমার নেই।”

অন্যরা করছে, তাই আমাকেও করতে হবে- এমনটা বিনিয়োগ করার যুক্তি হতে পারে না। যে কোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই ঝুঁকি কিংবা সম্ভাব্য মুনাফা সম্পর্কে না বুঝে তাতে জড়ানো বিপজ্জনক। ক্রিপ্টোকারেন্সিকে প্রায়শই অর্থোপার্জনের একটি সহজ উপায় হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখানো হয়, কারণ প্রতিমুহূর্তে এর দাম বাড়ে বা কমে। ক্রিপ্টোকয়েনের দামের এই নাটকীয়তার কারণেই একজন বিনিয়োগকারী তার সমস্ত পুঁজি খুইয়ে বসতে পারেন। 

গবেষকরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত #ফিনটক বা #স্টকটকের মতো উঠতি ট্রেন্ডগুলো নজরে রাখা- যাতে প্রয়োজনের সময় ভোক্তাদের অর্থ ও পণ্য সংক্রান্ত তথ্য কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। 

“এখন কিনুন, পরে দাম শোধ করুন” (বাই নাও, পে লেটার –বিএনপিএল) হলো পণ্য বেচাকেনার অনিয়ন্ত্রিত একটি পণ্য যা সামাজিক মাধ্যমে বিপণন করা হয়। মানুষ যদি না জানে যে বিএনপিএলও এক ধরনের ঋণ এবং এর ব্যবহার আগে থেকেই জানতে হবে, তাহলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিতে পড়তে পারেন। এমন উদাহরণও মিলে যে ক্রেডিটের মাধ্যমে বিএনপিএল লোন পরিশোধ করা হচ্ছে, যা ঋণের বোঝা আরো ভারি করে দেয়।

অনলাইনে অর্থ পরামর্শ গ্রহণের আগে যাচাই করুন

আমার গবেষণায় আমি দেখেছি, তরুণরা জানেই না আর্থিক পরামর্শ নিতে কোথায় যেতে হবে। তবে এটা অবশ্যই তাদের দোষ নয়। যুক্তরাজ্যের অর্থসেবা ব্যবস্থা বেশ জটিল। আর তাই কাকে বিশ্বাস করা যাবে বা কোথায় সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে, তা না জানলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এক্ষেত্রে যাত্রা শুরুর একটি ভালো জায়গা হলো ব্রিটিশ সরকারের সহায়তাপুষ্ট ওয়েবসাইট ‘মানিহেল্পার’ (MoneyHelper)। তরুণরা যেন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে সে কথা মাথায় রেখে সাইটটি নতুনদের জন্য একটি বিনিয়োগ নির্দেশিকা তৈরি করেছে।

মানিহেল্পার টুইটার, ফেসবুকইউটিউবে সক্রিয়। তবে টিকটক ও ইন্সটাগ্রামেও তাদের কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে সুপরামর্শ দিয়ে তারা তরুণদের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করতে পারে।

টিকটক তার ব্যবহারকারীদের #ফ্যাক্টচেকইওরফিড হ্যাশট্যাগ ব্যবহারে আহ্বান জানিয়েছে। অ্যাপটিতে সংবাদসহ অন্যান্য তথ্যের সংস্পর্শে এসে মানুষ যেন গভীরভাবে চিন্তা করে টিকটক এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে চাইছে। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা যে কোনো আর্থিক পরামর্শ গ্রহণের আগে সবসময় পাঁচটি প্রশ্ন করতে পারে, প্রশ্নগুলো সব ‘ক’ দিয়ে:

  • কে এই ব্যক্তি? তারা কি জবাবদিহির আওতায় থাকা অর্থ-পরামর্শক?
  • কী বলছেন তারা?
  • কখন এই পোস্ট করা হয়েছে?
  • কোথা থেকে তারা এসব তথ্য পেয়েছেন?
  • কেন তারা পরামর্শগুলো দিচ্ছেন? এটা কি কোনো বিজ্ঞাপন, নাকি তারা আমাকে কোনো কিছুতে যুক্ত হতে বলছেন?

চিন্তা করুন, আপনার আর্থিক লক্ষ্যগুলো কি, সেসব লক্ষ্যে পৌঁছাতে কী কী ছোট পদক্ষেপ আপনি নিতে পারেন। যেমন, আপনার বয়স যদি ৪০ বছরের কম হয় তাহলে আপনি লাইফটাইম আইএসএ-র মতো প্রোগ্রামে যুক্ত হয়ে প্রতি বছর চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত কর ছাড় পাবেন। এর পাশাপাশি সরকারও (ব্রিটিশ ) প্রতি বছর ২৫ শতাংশ বোনাস (এক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত) দেবে। 

আর্থিক বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণের আগে হয় আপনার আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলুন অথবা ‘মানি হেল্পার’, ‘স্টেপচেঞ্জ’ কিংবা ‘সিটিজেনস অ্যাডভাইস’ এর মতো কোনো স্বাধীন বা অলাভজনক সংস্থার ওয়েব সাইট ঘুরে দেখুন। 


এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় ডিসিমসল্যাবে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন তামারা ইয়াসমীন তমা।

আরো কিছু লেখা