তামারা ইয়াসমীন তমা

রিসার্চার, ডিসমিসল্যাব

তৌহিদুল ইসলাম রাসো

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
আজ তকের শিরোনাম যেভাবে বিভ্রান্তি, বিভাজন ও বিদ্বেষ ছড়ালো

আজ তকের শিরোনাম যেভাবে বিভ্রান্তি, বিভাজন ও বিদ্বেষ ছড়ালো

তামারা ইয়াসমীন তমা

রিসার্চার, ডিসমিসল্যাব

তৌহিদুল ইসলাম রাসো

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ভারতের সংবাদমাধ্যম আজ তক বাংলা গত পহেলা মে তাদের ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল এমন: “হিন্দুস্তানকে বয়কটের ফল, ৭৩% বাংলাদেশী পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না।” ভিডিওটির থাম্বনেইলেও একই শিরোনাম, যা দেখে মনে হতে পারে, ভারতীয় পণ্য বয়কটের ফল হিসেবে বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। কিন্তু ভিডিওটির ভেতরের বক্তব্য তেমন নয়।

মূল ভিডিওতে প্রতিবেদক মূলত দুটি আলাদা সংবাদকে জুড়ে দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি খবর হলো, ৭৩ শতাংশ বাংলাদেশি পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছেন না এবং তথ্যটি তারা তুলে ধরেছেন একটি আলোচনা সভার বরাতে। দ্বিতীয় খবরটি হলো, সামাজিক মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য বয়কটের যে ডাক দেওয়া হয়েছে আমদানি-রপ্তানিতে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

প্রতিবেদনের ভেতরে ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাকের সঙ্গে পুষ্টিহীনতার সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক তুলে ধরা হয়নি, যেমনটা শিরোনামে দেখা গেছে। আর এই বিভ্রান্তি ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমজুড়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিদ্বেষ উস্কে দিয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যায় খবরটির অসংখ্য স্ক্রিনশটে, বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের পোস্টে এবং সেই ভিডিও ও অন্যান্য পোস্টে করা ঘৃণাসূচক মন্তব্যে।

একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ও থাম্বনেইল কীভাবে বিভাজন ও ঘৃণা ছড়ায় তার কয়েকটি নজির তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। 

আজ তকের ভিডিওটিতে যা আছে

আজ তক ভারতের সুপরিচিত গণমাধ্যমগুলোর একটি। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে, টিভি টুডে নেটওয়ার্কের সংবাদ চ্যানেল হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে তাদের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা আছে। যেমন: আজ তকের মূল ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার বা গ্রাহক সংখ্যা ছয় কোটির বেশি, আর আজ তক বাংলার ১৩ লাখের মতো।

আলোচ্য ভিডিওটি প্রকাশিত হয়েছে পহেলা মে, আজ তক বাংলার ইউটিউব চ্যানেলে। এটি ভেরিফায়েড, অর্থাৎ ইউটিউব তাদের পরিচিতি যাচাই ও নিশ্চিত করে নামের সঙ্গে ধূসর বর্ণের একটি টিক চিহ্ন জুড়ে দিয়েছে। 

এবার দেখা যাক, ভিডিওটিতে কী বলা হয়েছে।

খবরটি শুরু হয় এভাবে: “সম্প্রতি ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক দেয় বাংলাদেশ। আর এবার সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ৭৩ শতাংশ বাংলাদেশি পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছেন না। পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন বাংলাদেশের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ। কৃষি এবং পুষ্টিখাতে অর্থায়ন শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক ছবি।” এরপর ধাপে ধাপে, বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টিহীনতা, খর্বাকৃতি ও রক্তাল্পতাসহ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়।

এরপর আসে “ইন্ডিয়া আউট” বা ভারতীয় পণ্য বর্জন প্রসঙ্গ এবং এক পর্যায়ে বলা হয়, “বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশনও জানাচ্ছে যে দুই দেশের মধ্যে আমদানি এবং রপ্তানি, দুটিই বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও জানাচ্ছেন যে ঈদের বাজারে ভারতীয় পণ্য বয়কটের কোনোও প্রভাব নাকি সেইরকমভাবে পড়েনি বাংলাদেশের বাজারগুলিতে।”

শিরোনামের সঙ্গে পরস্পরবিরোধী এই ভিডিওতে আরো দাবি করা হয়, ভারতীয় পণ্য বর্জনের প্রচারণায় “পরোক্ষ মদদ রয়েছে (বাংলাদেশের) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং একই সঙ্গে কিন্তু বেশ কয়েকটি কট্টরপন্থী দলের।” 

ভিডিওটি যেভাবে বিদ্বেষ ছড়ালো

গবেষণা বলে, সামাজিক মাধ্যমে বেশিরভাগ ব্যবহারকারী সাধারণত শিরোনাম দেখেই সত্য-মিথ্যা সিদ্ধান্ত নেন এবং খবরটি শেয়ার করেন। বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই লিংকে ক্লিক করে মূল খবর পড়েন না। 

আজ তকের ভিডিওটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভিডিওটি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং তাতে প্রায় দেড় হাজার মন্তব্য পড়েছে। মন্তব্যগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশ ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক। 

যেমন, আজ তকের ভিডিওটির মন্তব্যে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা না করে নিচের চিন্তা করুন। পরিবেশ রক্ষা করতে ভাল মানের টয়লেট ব্যবহার করুন।” আরেকজন লিখেছেন, “বাংলাদেশ এবার বুঝতে পেরেছে ওদের বাবা ভারত।” ধর্মীয় অনুভূতি টেনে একজন লেখেন, “এ মুসলমান কোনো দিন সুদ্রাবে (শুধরাবে) না। এদের মধ্যে নাই কিছু, কিন্তু অহংকার সব।”

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক (,,, , ,,, , , ১০) ও টুইটারেও (এক্স) (, ) অনেকেই এর স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন এবং পুরো ভিডিও না দেখেই এর শিরোনামকে সঠিক ধরে নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত প্রকাশ করছেন। 

সামাজিক মাধ্যম এক্সেও (টুইটার) স্ক্রিনশট দিয়ে পাল্টাপাল্টি বিদ্বেষমূলক পোস্ট করতে দেখা যায়। সাংঘি (মোদি কা পরিবার) নামের একটি হ্যান্ডেল থেকে স্ক্রিনশটটি পোস্ট করে লেখা হয়, “এমনি কি কই বাংলাদেশ”। বেলায়েত হোসেন নামের একজন লিখেন, “বাংলাদেশীরা খায় গরুর মাংস,,তারা খায় গরুর গোবর,, এখন ভিটামিনের ঘাটতি কার থাকতে পারে.!?”

অন্যদিকে, এই ভিডিওর জবাবে বাংলাদেশি ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য ফেসবুকে স্ক্রিনশটটি পোস্ট করেন এবং একে হাস্যকর বলে অভিহিত করেন। তিনি লেখেন,  “তার মানে ৭৩% বাংলাদেশী ভারতীয় পণ্য বয়কট করেছে। যেই দেশের শিশুরা বাংলাদেশের চাইতে অধিক মাত্রায় পুষ্টিহীনতায় ভোগে তারা নাকি বাংলাদেশের শিশুদের পুষ্টি জোগায়। কেউ আমারে ধরেন এট্টূ হাইস্যা নেই।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পিনাকীর পোস্ট প্রায় ১৪৬ বার শেয়ার হয়েছে এবং কমেন্ট পড়েছে প্রায় পাঁচশটি যার অধিকাংশই আবার ভারত ও হিন্দু ধর্মের প্রতি বিদ্বেষমূলক।

পোস্টটিতে একজন মন্তব্য করেন, “গদি মিডিয়ার কাজ হলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়ানো আর হিন্দুদের ব্রেনওয়াশ করা।” একই পোস্টে আরেক ব্যবহারকারী লেখেন, “ইসলাম একটি বিদেশিদের কোম্পানি। ইসলাম বয়কট করুন…।” জবাবে আরেকজন বলেন, “ভারতীয়রা একটা গাজাখোর জাতি।”

বয়কট ইন্ডিয়ান প্রডাক্ট, বয়কট ইন্ডিয়া আন্দোলন, বঙ্গমিত্র, বাংলাদেশ ১৯৭১-সহ বেশ কিছু ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ থেকে আজ তকের আলোচিত শিরোনামটি ব্যবহার করে পোষ্ট দিতে দেখা গেছে। এসব পেজের কমেন্ট সেকশন থেকেও দেখা গেছে, শিরোনামটি অনেক ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত করেছে।

২০২০ সালের অক্টোবরে সায়েন্স জার্নালের একটি গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক আলোচনায় একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে, রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতাকে তীব্র করে তুলেছে।” পরের বছর, জার্নাল ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সের একটি নিবন্ধে গবেষকেরা বলেন: “যদিও মেরুকরণের প্রধান চালক হওয়ার সম্ভাবনা সামাজিক মাধ্যমের কম, কিন্তু আমরা মনে করি যে এটি প্রায়ই সহায়ক হিসেবে মূল ভূমিকায় থাকে।”

পুষ্টিহীনতার তথ্য পুরোনো, পণ্য বর্জনের প্রচারণা নতুন

দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ পুষ্টিকর খাবার পায় না এই তথ্যটি নতুন করে সামনে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নাসিরুজ্জামানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত ২৯ এপ্রিল পুষ্টিখাতে অর্থায়ন শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, “জরিপ বলছে দেশের ৩৬ শতাংশ মানুষ খর্বাকার। ৭৩ শতাংশ মানুষ পুষ্টিকর খাবার পায় না। পুষ্টি বলতে সাধারণত মানুষ বুঝে থাকে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমকে। কিন্তু শাকসবজিতেও যে পুষ্টি রয়েছে তার ধারণা নেই।”

নাসিরুজ্জামানের এই উক্তি থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদটি প্রচার করে। কিন্তু, আজ তক তাদের ভিডিওতে সেই খবরের সঙ্গে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য বয়কটের সাম্প্রতিক প্রচারণার বিষয়টি জুড়ে দেয়।

অবশ্য পুষ্টিহীনতার তথ্যটি আরো পুরোনো। এর সূত্র মেলে ‘বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি’ শিরোনামে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থা (ইফাদ), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি যৌথ প্রতিবেদনে, যা প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২০ সালে বাংলাদেশে পুষ্টিকর খাবার কেনার সক্ষমতা নেই এমন মানুষ ছিল ৭৩.৫ শতাংশ। ওই বছর ভারতে ৭০.৫ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য ছিল না বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়।

অর্থাৎ, ৭৩.৫ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারার হিসাবটি ২০২০ সালের। কিন্তু ভারতীয় পণ্য বর্জনের প্রচারণাটি সাম্প্রতিক, যা শুরু হয়েছে মূলত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে।

গত ফেব্রুয়ারিতে আল-জাজিরার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগে ব্যাপক পরিসরে “ইন্ডিয়া আউট” প্রচারণা শুরু হয়।” একই মাসে বিবিসি জানায়, সেসময় এই হ্যাশট্যাগ প্রচারণাটি ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইন্সটাগ্রামেও শীর্ষে চলে আসে।

আরো কিছু লেখা