তৌহিদুল ইসলাম রাসো

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
সংবাদমাধ্যমের ক্লিকবেইট শিরোনাম যেভাবে বিভ্রান্তি ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়
This article is more than 2 months old
Clickbait headline media literacy Feature Image

সংবাদমাধ্যমের ক্লিকবেইট শিরোনাম যেভাবে বিভ্রান্তি ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়

তৌহিদুল ইসলাম রাসো
রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি মেট্রোরেলের দরজায় শাড়ি আটকে নারীর করুণ মৃত্যু শিরোনামের একটি খবর ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়াতে দেখা গেছে ফেসবুকে। একাধিক গণমাধ্যমও খবরটি প্রকাশ করেছে। তবে খবরের শিরোনামে স্থানের নাম উল্লেখ না থাকায় সেটি পাঠকদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। নারী মৃত্যুর এই ঘটনাটি আসলে ভারতে ঘটলেও, শিরোনামে স্থানের উল্লেখ না থাকায় সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই খবরটি শেয়ার করেছেন বাংলাদেশের ভেবে। খবরটির শিরোনামে যে স্থানের উল্লেখ থাকা উচিৎ ছিল– এমন মন্তব্যও করেছেন অনেকে।  

গত ১৪ ডিসেম্বর ভারতের রাজধানী দিল্লির ইন্দরলোক স্টেশনে ঘটেছিল দুর্ঘটনাটি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ ডিসেম্বর মৃত্যু হয় মেট্রোরেলের দরজায় শাড়ি আটকে যাওয়া সেই নারীর। সেই সূত্র ধরেই সংবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যম (, , )। কিন্তু সংবাদের শিরোনামে তারা উল্লেখ করেনি যে ঘটনাটি ভারতের।

পরবর্তীতে দ্য বাংলাদেশ মোমেন্টস নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে এ সংক্রান্ত একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। একাধিক পেজ (, ), গ্রুপ (, ) ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে (, , ) দ্য বাংলাদেশ মোমেন্টস-এর ফটোকার্ডটি শেয়ার হতে দেখা যায়। সেখানেও ভারতের নাম উল্লেখ না থাকায় বিস্তারিত প্রতিবেদন না পড়েই অনেকে ফটোকার্ডটি শেয়ার করেছেন বাংলাদেশের ঘটনা মনে করে। আবার অনেকে সেই পোস্টে খবরটি বাংলাদেশের বলে বিভিন্ন মন্তব্যও করেন। 

“বাংলাদেশের এই অবস্থায় হবে” লিখে মন্তব্য করেন এক ব্যবহারকারী। আরেকজন লিখেছেন “বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে, কিন্তু জনগণের ক্ষতি হবে না। তা কি কখনো হয়?”। “ওইটা ও বিএনপি করছে বাংলাদেশের পুলিশ বলবে” লিখে কমেন্ট করেছেন আরেক ব্যবহারকারী। পরবর্তীতে এটি নিয়ে যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার।

সংবাদের শিরোনাম সংক্রান্ত বিভ্রান্তির এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়। চলতি মাসেই ভারতের কর্ণাটকের একটি ঘটনার ক্ষেত্রে এমনটি দেখা গেছে। আর্থিক সংকটের কারণে একটি পরিবারের সদস্যদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে সেখানে। পরবর্তীতে এ নিয়ে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে (, ) প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ও ফেসবুকে প্রচারিত ফটোকার্ডে ঘটনাটির স্থানের নাম উল্লেখ না করে সংবাদটি প্রচার করা হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা (, , ) বিষয়টি বাংলাদেশের ঘটনা মনে করে ফেসবুকে প্রচার করতে থাকেন। এই বিভ্রান্তি নিরসনে সে সময়ও একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার।

ডিসেম্বরের আরেকটি সংবাদেও দেখা যায় এমন বিভ্রান্তি। সেটিও প্রকৃতপক্ষে ভারতের ঘটনা। তবে এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামে স্থানের উল্লেখ না থাকায় ব্যবহারকারীরা ঘটনাটিকে বাংলাদেশের মনে করে বিভ্রান্ত হন। মূলত, ভারতের ঝাড়খন্ডের কংগ্রেস রাজ্যসভার এমপি ধীরাজ প্রসাদ সাহু’র বাড়ি থেকে ৪৬৬ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে মূলধারার গণমাধ্যম কালবেলা। যার শিরোনাম ছিল, “এমপির বাড়ি থেকে উদ্ধার ৪৬৬ কোটি টাকা!” পরে উক্ত ঘটনা নিয়ে নিজেদের ফেসবুকে পেজে ফটোকার্ডও শেয়ার করে তারা। সেখানেও বলা হয়নি যে ঘটনাটি ভারতের। ফলে পুরো প্রতিবেদন না পড়ে একাধিক ফেসবুক ব্যবহারকারী (, , ) ঘটনাটি বাংলাদেশের বলে শেয়ার করতে থাকেন। বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্যও দেখা যায় উক্ত ফটোকার্ড পোস্টে।

স্থানের নাম উল্লেখ না থাকায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আরেকটি খবর বাংলাদেশের বলে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল গত মার্চে। সে সময় ঝাড়খণ্ডে মুরগির এইচ৫এন১ ভাইরাস বা বার্ড ফ্লু ভাইরাস ছড়ানোয় সতর্কতা জারি করেছিল দেশটির স্থানীয় সরকার। কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশে প্রচারিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর শিরোনামে (, , ) ভারতের নাম উল্লেখ ছিল না। এক্ষেত্রেও এটিকে বাংলাদেশের ঘটনা ধরে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট (, , ) দিয়েছিলেন অনেকে। সে সময় ঘটনাটি ভাইরাল হয় ফেসবুকে।

শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবেদন নিয়েও দেখা গেছে এমন বিভ্রান্তি ছড়ানোর চিত্র। কোনো শিক্ষিকা বাচ্চা নিলে প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিতে হবে- এমন একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনামে গত মার্চে খবর প্রকাশিত করে দৈনিক যুগান্তর। খবরটি ছিল মূলত বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার একটি স্কুলের যৌন হয়রানি সংক্রান্ত বিষয়কে ঘিরে। কিন্তু শিরোনামে ঘটনাস্থলের নাম উল্লেখ না করার কারণে পাঠকের মনে শঙ্কা তৈরি হয় যে বাংলাদেশের সব স্কুলের শিক্ষিকাকেই হয়তো বাচ্চা নেয়ার আগে তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিতে হবে। সে সময়ে সরকারি নির্দেশনা ভেবে অনেকেই খবরটি শেয়ার করছেন ফেসবুকে।

বিস্তারিত সংবাদ না পড়ে শুধু শিরোনাম দেখে এমন সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ব্যবহারকারীর সংখ্যা একবারেই কম নয়। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের বরাতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা লিঙ্কগুলোর ৫৯ শতাংশ কখনোই ক্লিক করা হয়না; অর্থাৎ বেশিরভাগ ব্যবহারকারী খবর না পড়ে শুধু শিরোনাম দেখেই সেটি আবার শেয়ার করেন। যার কারণে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। 

গবেষণাটির সহ-লেখক আহনো লোগু বলেছেন, “ব্যবহারকারীরা একটি প্রতিবেদন পড়ার চেয়ে শেয়ার করতে ইচ্ছুক বেশি থাকে। এটি আধুনিক তথ্য প্রবাহের ধরন। এখন ব্যবহারকারীরা কোনো ঘটনার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা না করে একটি সারাংশ বা একটি সারাংশের আরও ছোট সারাংশর উপর ভিত্তি করে মতামত তৈরি করে।”

এছাড়া এসব বিভ্রান্তিকর বা ক্লিকবেইট শিরেনামগুলো ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতেও ব্যবহার করা হয়। একটি সংবাদে হেডলাইন বা শিরোনামের একটি আলাদা গুরুত্ব থাকে। শিরোনামই পাঠককে সংবাদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয় এবং তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের ক্লিকবেইট সম্পর্কিত গবেষণা বলছে অনলাইন মাধ্যমে শিরোনাম আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরাসরি আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনলাইন মাধ্যমে আয় করে ভিউয়ের মাধ্যমে আর সেটির লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংবাদমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার মানদণ্ডকে উপেক্ষো করে ক্লিকবেইটে ঝুঁকে পড়ছে।

এ সম্পর্কে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সুমন রহমান বলেন, “মিডিয়ার এমন ক্লিকবেইট শিরোনাম করার অন্যতম কারণ পাঠকদের আকর্ষণ ও আয় করা। অনলাইনে মনিটাইজেশন থেকে আয় করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে– তার কারণেই এমনটি ঘটে। যত বেশি মানুষ ক্লিক করবে তত বেশি টাকা। এজন্য ফলোয়ার ও শেয়ার বাড়ানোর জেন্য অনলাইন মিডিয়া এমন ক্লিকবেইট শিরোনাম করে থাকে। সাধারণ কোনো নিউজ হলেও চটকদার শিরোনাম দিলে মানুষ ক্লিক করে আর সেখান থেকে আয়ের সুযোগ বাড়ে।”

সাংবাদিকতায় ও সংবাদ প্রকাশে ‘নৈকট্য’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘নৈকট্য’ দর্শকদের সঙ্গে খবরে সম্পর্কিত ঘটনার অবস্থান বিবেচনা করে। অন্য দেশের কোনো ঘটনা মানুষকে তেমন উদ্বেলিত করেনা যতটা নিজ দেশের কোনো ঘটনা করে থাকে। দর্শকদের তাদের কাছাকাছি ঘটে যাওয়া গল্পগুলিতে মনোযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই কারণেই স্থানের নাম উল্লেখ না করে এমন ক্লিকবেইট শিরোনামে খবর প্রচার করা হয়। এ প্রসঙ্গে সুমন রহমান বলেন, “ভারতের বেশিরভাগ ঘটনার স্থানের নাম উল্লেখ না করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারের কারণ প্রেক্ষাপটের সাদৃশ্যতা। পশ্চিমা দেশের কোনো ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের সাদৃশ্য কম। তবে ভারতের সঙ্গে সেটি বেশি। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সাদৃশ্যতার কারণে ভারতের এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের মানুষকে বেশি বিভ্রান্ত করে। দুই দেশের প্রেক্ষাপট অনেকটা কাছাকাছি হওয়ায় খবরগুলোর স্থান উল্লেখ না করলে সেটি বাংলাদেশের মনে হয়।”

কিন্তু এমন বিভ্রান্তিকর বা ক্লিকবেইট শিরোনাম থেকে রক্ষা পেতে সংবাদের কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে নজর রাখতে পারেন ব্যবহারকারীরা। সংবাদ ফটোকার্ড শেয়ার করার আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে এমন বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব। এ সম্পর্কে ফ্যাক্টচেক বিশেষজ্ঞ রহমান বলেন, “পাঠকদের মিডিয়া সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। চটকদার শিরোনাম দেখে সেটি সঠিক বলে বিবেচনা না করে নিউজের ধরন বুঝতে হবে। কারণ প্রচলিত খবরগুলো থেকে চটকদার এসব শিরোনামের খবর একটু ভিন্ন রকমের হয়। সেটি পাঠকদের উপলব্ধি করতে হবে। ক্লিক বা শেয়ার করার আগে এই সচেতনতা বাড়ালে বিভ্রান্তি অনেকাংশে কমে যাবে।”

“আরেকটি উপায় হতে পারে মূলধারার গণমাধ্যম যাচাই করা। ফেসবুকের এসব ভূঁইফোড় বা অখ্যাত পোর্টালের খবর দেখে সেটি শেয়ার করার আগে মূলধারার গণমাধ্যমে খুঁজে দেখা। বড় ঘটনাগুলো মূলধারার গণমাধ্যম কখনোই উপেক্ষা করে না। কিন্তু এমন ঘটনা যদি মূলধারার গণমাধ্যমে না থেকে শুধু ফেসবুকে বা অনলাইন পোর্টালে থেকে থাকে, তাহলে সেখানেই পাঠকদের সন্দেহ করা এবং যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করা উচিৎ।”

আরো কিছু লেখা