মোহাম্মদ আল মুকিত

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
factcheck patiya blasphemy hindu youth murder

দুই বছর আগের ছবি দিয়ে পটিয়ায় হিন্দু তরুণকে পিটিয়ে হত্যার ভুয়া দাবি

মোহাম্মদ আল মুকিত

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রামের পটিয়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক হিন্দু তরুণকে পিটিয়ে হত্যার ফলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ছবির ঘটনাটি দুই বছর আগের। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পটিয়ায় মহানবী (স.)-কে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পার্থ বিশ্বাস পিন্টু নামের যুবককে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল।

ফেসবুকে ইন্ডিয়ান ডিফেন্স পলিসি অ্যান্ড রিয়েলিটি (Indian Defence Policy And Reality) নামের একটি পেজ থেকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর একটি ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, “চট্টগ্রামের পটিয়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু তরুণকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়।” স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে পোস্টে দাবি করা হয়, “একদল মুসলিম ব্যক্তি ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী পার্থ বিশ্বাস নামে হিন্দু তরুণকে মারধর করে গুরুতর আহত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় পার্থ বিশ্বাসকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।” এ  প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত পোস্টটি প্রায় পাঁচশ বার শেয়ার করা হয়েছে।

ফেসবুকে একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও পেজ (১, ২, ৩, ৪, ৫) থেকে একই দাবি পোস্ট করতে দেখা গেছে। 

অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। “ফেইসবুকে ‘কটূক্তি’: আসামিকে নিয়ে যেতে পটিয়া থানায় হামলা” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মহানবী (স.)-কে কটূক্তির অভিযোগে চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা পার্থ বিশ্বাস পিন্টু নামের এক যুবককে পটিয়া থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে একদল মানুষ তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। ওই সময় পটিয়া থানায় হামলার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতেও হামলা চালানো হয়।

একই দিনে ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বরাতে জানানো হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক ফেসবুকে ধর্মীয় কটূক্তি করার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

ছড়িয়ে পড়া ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমকালের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। “ফেসবুকে ‘কটূক্তি’ আসামিকে নিয়ে যেতে পটিয়া থানায় হামলা” শিরোনামের ৪ মিনিট ৯ সেকেন্ডের ওই প্রতিবেদনের ২ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের দৃশ্যের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির মিল পাওয়া যায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের অনলাইন সংস্করণ (বামে) ও সমকালের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট।

তবে ছবিটির কিছু অংশে অসামঞ্জস্য থাকায় এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পাদিত কি না তা পরীক্ষা করে দেখে ডিসমিসল্যাব। ওপেনএআইয়ের তৈরি নিজস্ব কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল দিয়ে পরীক্ষা করা হলে ফলাফলে জানানো হয়, ছবিটি তৈরিতে ওপেনএআইয়ের টুল ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে সিনথআইডি ওয়াটারমার্কের উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া এআই ছবি শনাক্তকারী টুল সাইটইঞ্জিনও ছবিটি ৯৯% এআই-জেনারেটেড বলে জানায়।

ওপেনএআইয়ের নিজস্ব কন্টেন্ট শনাক্তকারী টুল দিয়ে যাচাইয়ের ফলাফল (বামে) ও এআই ছবি শনাক্তকরণ টুল সাইটইঞ্জিনে যাচাইয়ের ফলাফলের (ডানে) স্ক্রিনশট।

এ বিষয়ে জানতে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ডিসমিসল্যাবকে নিশ্চিত করেছেন, সম্প্রতি পটিয়ায় হিন্দু তরুণকে পিটিয়ে হত্যার কোনো ঘটনা ঘটেনি। জেলা কোর্ট ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমানও জানিয়েছেন, ওই ঘটনায় পার্থ বিশ্বাস কিছুদিন কারাভোগ করে পরে জামিন পেয়েছেন। এখনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।

অর্থাৎ, ২০২৪ সালে পটিয়ায় গ্রেপ্তার হওয়া পার্থ বিশ্বাস পিন্টু আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরিত হন এবং তিনি মারা যাননি। ওই ঘটনার একটি ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে সম্প্রতি ওই যুবককে পিটিয়ে হত্যার ভুয়া দাবি করা হচ্ছে।

আরো কিছু লেখা