
ফিলিস্তিনি দুই শিশু নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পর বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে দাবিতে একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচকে দেখা যায়, ছবিটি বলিভিয়ার পোটোসি শহরে অবস্থিত মিন্ট মিউজিয়ামে মমি করা দুই স্প্যানিশ শিশুর মৃতদেহের ছবি, যা ২০০৬ সালে তানিয়া নাইট নামের একজন আলোকচিত্রী তুলেছিলেন। ছবিটি এর আগেও ফিলিস্তিনি শিশুদের দাবিতে ছড়িয়েছে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ২০ এপ্রিল একটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “অতঃপর দুই মাস পরে তাদের বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে তাদের পাওয়া গিয়েছিল।আহ জান্নাতি পাখিদুইটা।” ছবিটির ভেতরে লেখা, “ফিলিস্তিনি এই দুই শিশুকে নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পর তাদের ঘরের ধবংসস্তূপের নিচেই পড়ে থাকলো নিথর দেহ।”
ছবির এক অংশে দুই মেয়ে শিশুকে পানির বোতল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দুজনের পরনেই গোলাপি রঙের জামা। ছবির আরেক অংশে দুই শিশুর মৃতদেহের ছবি রয়েছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি শেয়ার করা হয়েছে ১২৫ বারের বেশি। দুই হাজার দুই শর বেশি ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল, গ্রুপ (১, ২, ৩, ৪) ইনস্টাগ্রাম এবং থ্রেডেও একই দাবিতে ছবিটি শেয়ার করা হয়েছে।

ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে অনলাইন ছবি শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লিকারে প্রকাশিত একটি ছবি সামনে আসে। ছবিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালে তানিয়া নাইট নামের একজন আলোকচিত্রী বলিভিয়ার পোটোসি শহরে অবস্থিত মিন্ট মিউজিয়ামে তুলেছিলেন।
ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, “জাদুঘরে গেলে সবসময়ই অবাক হওয়ার মতো কিছু না কিছু পাওয়া যায়। বলিভিয়ার পোটোসিতে অবস্থিত মিন্ট মিউজিয়ামে আমি ১৮০০ সালের মমি করা দুই স্প্যানিশ শিশুর মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছি। ভয়াবহ ব্যাপার।” বিস্তারিত অংশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ছবিটি তানিয়া নাইট তুলেছেন ২০০৬ সালের ২২ ডিসেম্বরে, এবং ওয়েবসাইটে আপলোড করেছেন ২০০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বরে। ছবিটির শিরোনাম ছিল, “মমি করা শিশু।” এ ছবিটিতে একটি কাঁচের বাক্সের মধ্যে দুই শিশুর মৃতদেহ দেখা যায়। একজনের শরীরে গোলাপি রঙের জামা এবং টুপি দেখা যায়। এই ছবিটিই ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃতদেহ দাবিতে শেয়ার করা হয়েছে।
অধিকতর যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কিওয়ার্ড সার্চ দিলে একাধিক (১, ২) আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন সামনে আসে। ২০২৫ সালের ২৬ মে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছবিটি একটি জাদুঘরে থাকা মমির ছবি, ফিলিস্তিনি শিশুদের নয়।
রয়টার্স এ বিষয়ে আলোকচিত্রী তানিয়া নাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রয়টার্সকে জানান, “এ ছবিটি আমি তুলেছি এবং গাজার ঘটনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানাই, তবে তাদের বার্তা প্রচারের জন্য এই ছবিটির ব্যবহার সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।” এছাড়াও, রয়টার্স মিন্ট জাদুঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, “এই ছবিতে দুটি মমি দেখা যাচ্ছে এবং এটি ‘কাসা নাসিওনাল দে মোনেদা’ (মিন্ট জাদুঘর) জাদুঘরের সংগ্রহের অংশ। এই মমিগুলো আনুমানিক ১৭শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী ঔপনিবেশিক আমলের। আন্দিজ অঞ্চলের জলবায়ু এবং পরিবেশগত পরিস্থিতির কারণে প্রাকৃতিক মমিকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই দুটি শিশুকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।”

অর্থাৎ, ফিলিস্তিনি দুই শিশুর মরদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের দাবিতে ছড়াচ্ছে বলিভিয়ার জাদুঘরের মমির ছবি। এর আগেও ফিলিস্তিনকে জড়িয়ে ভুল তথ্য নিয়ে একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব।
প্রসঙ্গত, ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী ইসরায়েল-হামাস সংঘাতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাতে ২১ হাজার ২৮৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।