
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের নৌবাহিনী বিধ্বস্ত— এই দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।
পিএসপি নিউজ নামে গণমাধ্যম পরিচয় দেওয়া এক ফেসবুক পেজ থেকে সম্প্রতি একটি ভিডিও পোস্ট করা হত। ১১ সেকেন্ডের এই জানানো হয়, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের নৌবাহিনী বিধ্বস্ত”। ভিডিওতে দেখা যায়, তীরে ভেড়ানো কিছু জাহাজে আক্রমণ চালিয়ে বিধ্বস্ত করে দেওয়া হয়েছে। পোস্টটি এ পর্যন্ত ১৭৯ বার শেয়ার করা হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৬০ হাজার বারের বেশি।

কিফ্রেম সার্চে দেখা যায়, একই ভিডিও এর আগেও বিভিন্ন দেশ থেকে চালানো এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে ছড়িয়েছে। ভারত থেকে পরিচালিত এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ৪ মার্চ ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়েছিল, বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর বহরে ইরানের হামলার দৃশ্য এটি। জানানো হয়েছে, এলাকাটি থেকে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যাওয়ার সময় খোদ মার্কিন সৈন্যদের নিজেদের ধারণ করা ফুটেজ এটি।
৯ মার্চ গণমাধ্যম দাবি করা আল-আহদাস আল-ইরানিয়্যাহ নামের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এর ক্যাপশনে লেখা, “ব্রেকিং: উপসাগরের উপকূলের সামনে অবস্থান করা মার্কিন নৌবহরের একটি ধ্বংস করা হয়েছে।” ১১ মার্চও একই দাবিতে তুর্কী ভাষায় আরেকটি পোস্ট পাওয়া যায় এক্সে। তাতে লেখা, “বসরা উপসাগরে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজে হামলা হয়েছে!”
ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওতে দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক পর্যবেক্ষণে একাধিক ইনস্টাগ্রাম আইডি (১, ২, ৩) খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব, যাদের সূত্র থেকে ছড়িয়েছে এসব ভিডিও। ৬ মার্চ ভিডিওটি ইনস্টাগ্রামে রেইনাল্ডো ফার্নান্দেজ নামের এক প্রোফাইল থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয়, ভিডিওটি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার। ক্যাপশনে লেখা হয়, ইরানের নৌ অবকাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভুল হামলায় শাসকগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে জাহাজ ধ্বংস হয়েছে, ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড হয়েছে এবং পৃথিবীর অন্যতম কৌশলগত অঞ্চলে শক্তিশালী সামরিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে, আর ইরান তার সামরিক সক্ষমতার ওপর একের পর এক কঠোর আঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে।”
তবে সবচেয়ে পুরোনো ভিডিও পাওয়া যায় প্যারালালভার্স ডটনেট নামের এক ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে। ৩ মার্চ প্রকাশিত এই ভিডিওতে কোন দেশের হামলার বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। বরং ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এবং শুধুমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণেও নানা অসঙ্গতি নজরে আসে ডিসমিসল্যাবের। ভিডিওতে বিস্ফোরণের তীব্রতা সত্ত্বেও পাশের যুদ্ধজাহাজ বা পানিতে কোনো প্রভাব পড়তে দেখা যায় না। এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল ডিপফেক-ও-মিটার দিয়ে যাচাই করেও দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা শতভাগ।
এর আগে মার্কিন নৌবহর ধ্বংসের দাবিতে ভিডিওটি ছড়ানোর পর ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল আরবভিত্তিক তথ্যযাচাইকারী সংস্থা মিসবার। যাচাইয়ে মিসবার জানায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি। তাদের যাচাই অনুযায়ী, ভিডিওতে যানবাহনটি সরাসরি একটি নৌঘাঁটির পাশ দিয়ে যাচ্ছে যেখানে যুদ্ধজাহাজ রাখা আছে, অথচ সাধারণত নৌঘাঁটিগুলো বন্ধ সামরিক এলাকা হয়, যা দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকে এবং জনসাধারণের রাস্তা থেকে দূরে অবস্থান করে। ভিডিওতে একটি রাস্তার সাইনবোর্ডে মাইল লেখা দেখা যায় যায়, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর সড়কচিহ্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ সেখানে মেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় এবং দূরত্ব মাইলের পরিবর্তে কিলোমিটারে দেখানো হয়।

অর্থাৎ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের নৌবাহিনী বিধ্বস্ত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।