ফামীম আহমেদ

রিসার্চার, ডিসমিসল্যাব
এটি কিডনির পাথর অপসারণের ভিডিও, হার্টের চিকিৎসার নতুন কোন প্রযুক্তি নয়
This article is more than 1 year old

এটি কিডনির পাথর অপসারণের ভিডিও, হার্টের চিকিৎসার নতুন কোন প্রযুক্তি নয়

ফামীম আহমেদ
রিসার্চার, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি অ্যানিমেটেড ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, “হার্টের রিং পরানোর দিন শেষ, এলো নতুন প্রযুক্তি”। সেখানে আরো উল্লেখ আছে, “Plz see this video. . New method of angiography which directly removes block. Only at  the cost of Rs.5000 at J. J. HOSPITAL. MUMBAI. … Please help someone.. Many are waiting for it.”

যার অর্থ দাঁড়ায়, “দয়া করে ভিডিওটি দেখুন… এনজিওগ্রাফির নতুন পদ্ধতি যা সরাসরি ব্লক দূর করে। মাত্র ৫০০০ রুপিতে জে .জে. হসপিটালে. মুম্বাই… দয়া করে সাহায্য করুন… অনেকে এর জন্যে অপেক্ষা করছে।”

ভিডিওটি এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি বার শেয়ার হয়েছে এবং এতে ১৩ হাজারের বেশি রিঅ্যাক্ট পড়েছে। এছাড়াও ২০১৮ সাল থেকে প্রতি বছরই ভিডিওটি ফিরে এসেছে এবং ভাইরাল হয়েছে (২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩)। ইউটিউবেও এটি পাওয়া যায়।

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি এনজিওগ্রাফির নয়, হার্টের চিকিৎসা পদ্ধতিরও নয়। এতে কিডনির পাথর অপসারণের ভিডিওকে হার্টে রিং পরানোর নতুন প্রযুক্তি বলে প্রচার করা হয়েছে। জে. জে. হাসপাতালে কম খরচে এই চিকিৎসা লাভের যে দাবিটি করা হয়েছে, তা-ও সঠিক নয়।

ফ্যাক্টচেক

ফেসবুকে প্রচারিত ২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের ভিডিওটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হার্ট (Heart), রিং (Ring) বা এনজিওগ্রাফি (Angiography) শব্দগুলো কোথাও ব্যবহৃত হয়নি বা উল্লেখ নেই। এতে উৎস হিসেবে বোস্টন সায়েন্টিফিক ইউরোলজি (Boston Scientific Urology) এবং Accordion Medical এর নাম উল্লেখ রয়েছে।

অ্যাকর্ডিয়ন মেডিকেল বোস্টন সায়েন্টিফিক ইউরোলজি নামে সার্চ করলে দুইটি ইউটিউব চ্যানেল পাওয়া যায়। ভাইরাল ভিডিওর প্রথম ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের অংশের সঙ্গে অ্যাকর্ডিয়ন মেডিকেল চ্যানেলের দুইটি (, ) ভিডিও হুবহু মিলে যায়। চ্যানেলটিতে ভিডিও দুটি আপলোড করা হয়েছিল ২০১২ সালে।

বোস্টন সায়েন্টিফিক ইউরোলজির ইউটিউব চ্যানেলেও ২০১৬ সালের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির ১ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড থেকে শেষ পর্যন্ত অংশের সঙ্গে বোস্টন সায়েন্টিফিকের ভিডিওটির (৫০ সেকেন্ড হতে ১ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড পর্যন্ত) হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

অ্যাকর্ডিয়নের ভিডিও দুটির শিরোনামে ১০ এম এম স্টোন কন্ট্রোল ক্যাথেটার ও ১৫ এম এম স্টোন কন্ট্রোল ক্যাথেটার নামে দুইটি মেডিকেল ডিভাইসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় ভিডিওতে PercSys নামে একটি কোম্পানির লোগোও চোখে পড়ে। ব্লুমবার্গ অনুযায়ী, পার্কিউটেনাস সিস্টেমস ইনকরপোরেটেড (PercSys) মূলত মেডিকেল সামগ্রী ও সেবা সরবরাহ করে থাকে।

কোম্পানিটির ওয়েবসাইট এখন আর সচল নয়, তবে এর আর্কাইভ বা পুরনো সংস্করণে (, ) ক্যাথেটার ডিভাইস দুটির বিবরণ পাওয়া যায়। বিবরণ অনুযায়ী, ১০ এমএম স্টোন কন্ট্রোল ক্যাথেটার লিথোট্রিপসির জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৫ এম এম স্টোন কন্ট্রোল ক্যাথেটার পারকিউটেনাস নেফ্রোলিথোটমির (পিসিএনএল) জন্য ব্যবহৃত হয়।

সর্বশেষ ভিডিওটি ছিল বোস্টন সায়েন্টিফিক ইউরোলজির। ক্যাপশন অনুযায়ী, ডাকোটা স্টোন রিট্রিভাল ডিভাইসের অ্যানিমেশন। এর সঙ্গে একটি কোম্পানির লিংকও যুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও একই ভিডিও এবং ডিভাইসের বিবরণ দেয়া আছে। 

এই রিট্রিভাল ডিভাইসটি ইউরেটেরোস্কোপি করতে ব্যবহৃত হয়। ইউরেটেরোস্কোপিতে এর ব্যবহারে প্রক্রিয়ার তুলে ধরা হয়েছে “Flexible Ureteroscopy with Dr. Sur, Small Stone Procedure” শীর্ষক একটি অ্যানিমেশন ভিডিওতে। কোম্পানির ওয়েবসাইটেই ভিডিওটি যুক্ত করা আছে।

আমেরিকার স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইন অনুযায়ী, লিথোট্রিপসি, পিসিএনএল ও ইউরেটেরোস্কপি কিডনির পাথর অপসারণের চিকিৎসা পদ্ধতি, যা ভিডিওটিতে দেখানো হয়েছে।

আর পোস্টে যে এনজিওগ্রাফির কথা লেখা হয়েছে, তা মূলত রক্তনালীর ভেতরের ছবি ধারণ বা ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি, যার সাহায্যে চিকিৎসক চাইলে, এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে, রক্তনালীর বাধাও খুলে দিতে পারেন। বলে রাখা ভালো, এনজিও শব্দটির অর্থই হচ্ছে রক্তনালী সম্বন্ধীয়।

অর্থাৎ, কিডনীর পাথর অপসারণের তিনটি আলাদা ভিডিওকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে সেটি হার্টে রিং পরানোর চিকিৎসা বা এনজিওগ্রাফি বলে দাবি করা হয়েছে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে।

মুম্বাইয়ের জে জে হসপিটালের প্রতিক্রিয়া

এর আগেও একই ক্যাপশনে, আলাদা ভিডিও দিয়ে, একটি পোস্ট ছড়িয়েছিল। পাঁচ বছর আগের একটি প্রতিবেদনে এই প্রচারণাকে ভুয়া বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল স্থানীয় গণমাধ্যম, মুম্বাই লাইভ। 

জে. জে, হাসপাতালের চিকিৎসক নরেন্দ্র ভানসাল তখন তাদেরকে বলেছিলেন, “ভিডিওটি ভুয়া কারণ ভিডিওটিতে দেখানো প্রযুক্তিটি বিদ্যমান নেই। এবং, এই সার্জারিটি মাত্র ৫০০০ রুপিতে করা সম্ভব নয়। এর প্রকৃত খরচ ৪০-৫০ হাজার পর্যন্ত পড়ে। আমি জনগণকে আহবান করছি যে, এই ভিডিওটি বিশ্বাস না করে হাসপাতালে খোঁজখবর নিন।” 

ভারতের স্বাস্থ্যসেবামূলক খরচের তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট মেডিফি অনুযায়ী, মুম্বাই শহরে এনজিওগ্রাফি করতে গড়ে ৩৫,৬৭৪ রুপি খরচ হতে পারে। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন শহরে এনজিওগ্রাফির খরচের তালিকাও এখানে পাওয়া যায়। 

উল্লেখ্য, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই লাখ ৭৩ হাজার রোগী মেডিকেল ভিসায় ভারতে গেছেন বলে বিডিনিউজ২৪ কে জানিয়েছে ভারতীয় দূতাবাসের প্রেস রিলেশন বিভাগের এক কর্মকর্তা। 

আরো কিছু লেখা