নীতি চাকমা

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
সিরিঞ্জ দিয়ে গরুর মাংসে তরল ঢোকানোর ভিডিওটি বাংলাদেশের না

সিরিঞ্জ দিয়ে গরুর মাংসে তরল ঢোকানোর ভিডিওটি বাংলাদেশের না

নীতি চাকমা
ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে- যেখানে দেখা যায়, এক ব্যক্তি সিরিঞ্জ দিয়ে গরুর মাংসে কিছু একটা মেশাচ্ছেন। পোস্ট, কমেন্ট ও ক্যাপশনে নেটিজেনরা দাবি করছেন, ওজন বাড়ানোর জন্য মাংসে কোনো উপাদান মেশানো হচ্ছে হীন ব্যবসায়িক স্বার্থে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি বাংলাদেশেরই নয়। এছাড়া বিদেশি ভিডিও নির্মাতার দাবি, ওজন বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং শক্ত হাড় সহজে রান্না করার জন্য এতে পানি ও লবণ ঢোকানো হচ্ছিল। 

পোস্টগুলো (,,) যাচাই করে দেখা যায়,  ভিডিওটি বিদেশি হতে পারে এমন সন্দেহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকের মনেই কাজ করেনি। বাংলাদেশের কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর কাজ মনে করে তারা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন। “আহা জাহান্নামের পথ বেছে নিয়েছে ওরা। জানিনা ওদের ভাগ্যে কি আছে। আল্লাহ এদের হেদায়েত করো”- একজন কমেন্ট করেন। আরেকজন লিখেন, “হে আল্লাহ্ এসব মানুষরুপি কসাইদের হেদায়েত দান করুন।” অবশ্য কেউ কেউ বলছিলেন ভিডিওটি দেখে বিদেশি মনে হচ্ছে।

গত ১৬ মার্চ ‘সত্যানুসন্ধ্যানে প্রকৌঃ আ.কা.আজাদ’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি শেয়ার হতে দেখা যায়। এতে সংযুক্ত টেক্সট ছিল, ‘ভিডিও টা পোষ্ট করলাম বাকি দায়িত্ব আপনাদের। এক কেজি ৭০০ গ্রামই পাবেন।’ 

ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, ‘কি খাচ্ছেন আসলে গরুর মাংশের নামে? দেখুন ব্যবসায়ীদের কারবার! ওরা মনে করে ওরা কখনোই মরবেনা।’ ইতোমধ্যে ভিডিওটি ১০ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে, প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার ব্যবহারকারী এবং এতে মন্তব্য রয়েছে ১৮৩টি। 

এর আগে ভিডিওটির পোস্ট পাওয়া যায় একই মাসের ১ তারিখে। মো জিয়ারুল ইসলাম নামক ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা একই টেক্সটযুক্ত ভিডিওটিতে বলা হয়, ‘বাকি দায়িত্ব আপনাদের।’ ৭০ লাখ বারের বেশি দেখা এই ভিডিওতে প্রায় আট হাজার ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। মন্তব্য করা হয়েছে ৭১৮টি। 

ফেসবুক ছাড়াও ইউটিউবে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির টি-শার্টে লেখা উনিয়ন লাতিনোআমেরিকানা আসাদোরেস ই আফিনেস (Unión Latinoamericana Asadores Y Afines) যার ইংরেজি তর্জমা দাঁড়ায় লাতিন আমেরিকান ইউনিয়ন অফ স্টেকহাউজেস অ্যান্ড রিলেটেড ইন্ডাস্ট্রিজ (Latin American Union of Steakhouses and Related Industries)। এটি নির্দেশ করে যে ভিডিওটি লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে করা।

রিভার্স ইমেজ সার্চ করে পাওয়া যায় মূল ভিডিওটি। এল তাপেক কনদিমেনতোস (El Tapeque Condimentos) নামক একটি টিকটক অ্যাকাউন্টে গত বছরের (২০২৩) ২৩ জুলাই এটি পোস্ট করা হয়। মাংসে তরল ঢোকানোর দৃশ্য দেখে মূল ভিডিওর নিচেও কেউ কেউ উদ্বেগ বা সন্দেহ ব্যক্ত করেছেন। ভিডিওটির কমেন্ট অংশে একজনের প্রশ্নের উত্তরে কনদিমেনতোস লিখেছেন, ‘পানি এবং লবণ মেশানো হচ্ছে। মাংস পুরোটাই রোস্ট করা হবে। কিন্তু কিছু অংশ আছে যেমন পেছনের হাড়।  ঠিকমতো রান্নার জন্য এর ভেতরে ১৬ ঘন্টা লবণ থাকার দরকার আছে।

ভিডিওর ক্যাপশন হচ্ছে টেইয়ার মায়েস্ত্রো পারিয়েরো কারলোস (TALLER MAESTRO PARRILLERO CARLOS, ইংরেজি করলে যা দাঁড়ায় Master Grill Workshop Carlos)।

এল তাপেক কনদিমেনতোস – এর টিকটক অ্যাকাউন্ট এবং ফেসবুক পেইজ থেকে বোঝা যায়, তিনি বার্বিকিওর মসলা বিক্রি প্রতিষ্ঠানের জন্য পোস্ট দিয়ে থাকেন। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার সান্টা ক্রুজ দে লা সিয়েরা নামক শহরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি।

এক কথায়, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি বাংলাদেশের নয় বা এতে ওজন বাড়ানোর জন্য কোনো উপাদান মেশানো হচ্ছে না। 

অপতথ্য কিভাবে মানুষের কেনাকাটাকে প্রভাবিত করে তা উঠে এসেছে কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক গিয়াডোমেনিকো ডি ডোমেনিকোর গবেষণায়। দ্য কনভার্সেশনে এক প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, “ভোক্তা পর্যায়ে পরোক্ষ অপতথ্যের প্রভাব গভীর হয়। অপতথ্য তাদের মনে বিভ্রান্তি, সন্দেহ এবং দুর্বলতার সাধারণ অনুভূতি তৈরি করে। মূলধারা এবং ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম ব্র্যান্ডগুলোর ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস কমে যাওয়ারও সম্পর্ক রয়েছে ক্রমাগত অপতথ্য প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে”। 

গিয়াডোমেনিকো আরো লিখেন যে, এর ফলে মানুষ সমস্ত তথ্যের উৎস এবং এমনকি সহভোক্তাদের ব্যাপারেও সতর্ক হয়ে যেতে পারে। অবচেতনভাবে অপতথ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা ক্রয়ের ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে; ব্র্যান্ড ও পণ্যগুলোর ব্যাপারে তাদের যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হলো সেটাও তারা ধরে রাখতে পারে।

আরো কিছু লেখা