পার্থ প্রতীম দাস

এনগেজমেন্ট এডিটর, ডিসমিসল্যাব
১০১টি মিথ্যা যা বারবার ফিরে আসে
This article is more than 2 months old

১০১টি মিথ্যা যা বারবার ফিরে আসে

পার্থ প্রতীম দাস
এনগেজমেন্ট এডিটর, ডিসমিসল্যাব

বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে: দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে এই প্রবাদের সমার্থক হতে পারে নাৎসি জার্মানির প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রধান জোসেফ গোয়েবলসের এই উক্তি: “একটি মিথ্যাকে বারবার বল, সেটিই সত্য হয়ে যাবে।”

গত এক বছরে বাংলাদেশ নিয়ে যত ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেদিকে ফিরে তাকালে বারবার বলা মিথ্যার কিছু উদাহরণ সামনে আসে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওপরের প্রবাদকেই ফের সত্য বলে প্রমাণ করে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সংক্রান্ত ৭টি ফ্যাক্টচেকিং ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব এমন ১০১টি মিথ্যা খুঁজে পেয়েছে, যার কোনো কোনোটি ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসছে, এবং টিকেও থাকছে। এদের মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ যেমন আছে, তেমনি আছে জাতীয়তাবাদী ভাষ্য এবং স্পর্শকাতর স্বাস্থ্যতথ্য যা সাধারণের ক্ষতিরও কারণ হতে পারে।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ডিসমিসল্যাবের মাসিক নিউজলেটারের ফেব্রুয়ারি সংস্করণে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বারবার ফিরে আসা এসব মিথ্যা অনেক সময় “সত্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যখন সেটি সম্পাদকীয় যাচাইয়ে দুর্বলতার কারণে প্রথাগত গণমাধ্যমে চলে আসে। ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাগুলো একাধিকবার যাচাই ও “ফ্ল্যাগ” (ফেসবুকের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষীয় ফ্যাক্টচেকার হিসেবে ভুল তথ্যটিকে প্লাটফর্মে চিহ্নিত) করার পরও এগুলো টিকে থাকে, কারণ সামাজিক মাধ্যমগুলোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যাচাই হওয়া ভুল তথ্য ফিরে এলে অনেক সময় সেগুলোকে শনাক্ত করতে পারে না।

ভুয়া তথ্য পুনরাবৃত্তির প্রবণতা ও প্রভাব

বিশ্লেষণে যে ১০১টি পুনরাবৃত্তিমূলক ভুল তথ্য পাওয়া গেছে তার মধ্যে ৪টি চলে আসছে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে। আর ৫ থেকে ১০ বছর ধরে চলছে প্রায় ৩৩টি। সাধারণ ভুল তথ্য ও পুনরাবৃত্তিমূলক ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রবণতায়ও পার্থক্য আছে। পুনরাবৃত্তিমূলক ভুল তথ্যের ক্ষেত্রে রাজনীতির পরই স্বাস্থ্য এবং বিজ্ঞান বিষয়ক ভুয়া খবর বেশি ছড়াতে দেখা যায়, কিন্তু সাধারণ ভুল তথ্যের ক্ষেত্রে রাজনীতির পর সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য দেখা যায় ধর্ম, ক্রীড়া ও দুর্যোগ নিয়ে।

রাজনীতিতে বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা, এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে কিছু ভুয়া খবর বারবার ফিরে আসতে দেখা গেছে।

যেমন: শেখ হাসিনা বিশ্বের তৃতীয় সৎ সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন অথবা তিনি বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন – এই দুইটি মিথ্যা দাবি ২০১৭-১৮ সাল থেকে প্রতিবছর কোনো না কোনোভাবে সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসছে যদিও সেগুলো নিয়ে একাধিক যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে গণধোলাই খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে একটি ভুয়া খবর ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রথম সামাজিক মাধ্যমে আসে, যা ২০২৩ সালের শেষনাগাদ, আরেকটি সংসদ নির্বাচনের আগে আবার ছড়াতে দেখা যায়। রাজনীতি বিষয়ক ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে নির্বাচন এবং আন্দোলন কর্মসূচি প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে।

স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্যান্সার নিরাময়ের টোটকাসহ বেশ কিছু ক্ষতিকর ভুয়া খবর ফ্যাক্টচেক হবার পরও বারবার ফিরতে দেখা গেছে। যেমন, পিরিয়ডের সময় নারীদের নারিকেল, শসা ও ঠাণ্ডা পানি খাওয়া উচিৎ নয়; চিনি খাওয়া বাদ দিলে এবং গরম পানিতে লেবুর সরবত খেলে ক্যান্সার নিরাময় করা যায়; নারকেলের টুকরা পানিতে ফুটিয়ে সেই গরম পানি খেলে ক্যান্সারের কোষ নষ্ট হয়

২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আরেকটি ভুয়া দাবি ছড়াতে দেখা যায় ডেঙ্গু জ্বর প্রসঙ্গে। যেখানে বলা হয়: ডেঙ্গু মশা সাধারণত হাঁটুর নিচে কামড়ায়। তাই হাঁটুর নিচের অংশে নারকেল তেল মেখে রাখলে তা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। যদিও যে চিকিৎসকের বরাত দিয়ে খবরটি এসেছে, তিনিই ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাটিকে বলেছেন, “ডেঙ্গু থেকে বাঁচার জন্য নারকেল তেল কোনোভাবেই সাহায্য করে না। এক্ষেত্রে আপনার (রোগীর) যৌক্তিক চিকিৎসা দরকার।”

বারবার একই তথ্যের পুনরাবৃত্তির ফলে সেটির প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। “দ্য ইফেক্টস অব রিপিটেশন ফ্রিকোয়েন্সি অন দি ইলিউশরি ট্রুথ ইফেক্ট” শীর্ষক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, “স্পষ্টভাবে অপ্রমাণিত হওয়ার পরও কেন আমরা বিভিন্ন মিথ, ভুল তথ্য ও সংবাদে বিশ্বাস করি? এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো মানুষকে সেসব তথ্য বারবার দেখানো হয়।” এটি ইলিউশরি ট্রুথ ইফেক্ট নামে পরিচিত।

ভুল তথ্যের বিস্তারে ইলিউশরি ট্রুথের ভূমিকা নিয়ে একটি গবেষণায় ২৬০ জন ব্যক্তিকে নতুন ও আগে দেখানো তথ্য দিয়ে বলা হয়েছিল, তারা কোনটি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করবেন; ফলাফলে দেখা যায় যে অংশগ্রহণকারীরা আগে দেখানো তথ্য শেয়ার করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।

যাচাই হয়, ফ্ল্যাগ হয়, তবু ফিরে আসে

পুনরাবৃত্তিমূলক ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হলো সামাজিক মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। ফেসবুক তাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড, কমিউনিটি রিপোর্টিং ও এআইভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষীয় ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার সহায়তা নিয়েও ভুল তথ্য শনাক্ত করে। ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাগুলো কোনো ভুয়া খবরকে চিহ্নিত করার পর প্লাটফর্মটি সেই ভুয়া তথ্যের সঙ্গে একটি সতর্কীকরণ লেবেল জুড়ে দেয়। লেবেলটিতে বলা হয় তথ্যটি সঠিক নয় এবং তাতে ক্লিক করলে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনটি পাওয়া যায়। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, পুনরাবৃত্তিমূলক ভুল তথ্য ঠেকানোর ক্ষেত্রে তাদের এই ব্যবস্থা প্রয়োগে দুর্বলতা ও অসঙ্গতি রয়েছে।

যেমন: ফেসবুকের তৃতীয় পক্ষীয় ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা বুম বাংলাদেশ, গত বছর ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের সময় মাথায় সিঁদুর পরানো হয়েছিল বলে দাবি করা একটি অপতথ্য ও ভুয়া ছবিকে যাচাই ও মিথ্যা প্রমাণ করে। উল্লেখ্য যে, বিবাহিত হিন্দু নারীরা সাধারণত কপালে সিঁদুর পরেন এবং শেখ হাসিনার এই ভুয়া ছবি পোস্ট করে দাবি করা হয় যে, তিনি ভারতে গিয়ে হিন্দু নারীদের মতো সিঁদুর পরছেন এবং দেশে রাজনীতিতে আবার ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছেন। এরপর ফেসবুক ২০১৬ সাল থেকে পোস্ট হওয়া প্রায় প্রতিটি ভুয়া ছবিতে সতর্কীকরণ লেবেল বসায় এবং গত বছর জানুয়ারির পর যেসব ব্যবহারকারী ছবিটি শেয়ার করেছেন সেখানেও লেবেলটি জুড়ে দেয়।

কিন্তু সব অপতথ্য শনাক্তকরণ ও লেবেলিংয়ের বেলায় এমনটা দেখা যায় না। যেমন: ২০১৮ সালে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তার পুরনো একটি বক্তব্য থেকে বিভিন্ন অংশ কেটে নিয়ে আলাদাভাবে জোড়া দিয়ে তৈরি করা ভিডিওটিতে খালেদা জিয়াকে নিজ পরিবার ও রাজনৈতিক আন্দোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়। এই সম্পাদিত ভিডিও নিয়ে ২০২১ (, ), ২০২২২০২৩ সালে অন্তত চারটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনটি আলাদা ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা। কিন্তু এটি সামাজিক মাধ্যমে প্রতি বছরই আসে, এবং এই গবেষণায় ফ্যাক্টচেকিং প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ও পরে পোস্ট করা অন্তত ৮০টি ভুয়া ভিডিও চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোতে ফেসবুকের সতর্কীকরণ লেবেল পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ দিয়ে এই ভুয়া ভিডিওটি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন আকারেও প্রচারিত হয়।

অবশ্য ফেসবুক বলছে, তারা শুধু সতর্কীকরণ লেবেলই যুক্ত করে না, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ফ্যাক্টচেকারদের কাজকে আরো বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারিত করে। “আমাদের এআই টুলগুলো পর্যালোচনার জন্য সম্ভাব্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এবং পূর্বে চিহ্নিত ভুল তথ্যের নতুন নজিরগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুঁজে বের করে।”

কিন্তু ডিসমিসল্যাবের এই গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ভুয়া তথ্য তৃতীয় পক্ষীয় ফ্যাক্টচেকারেরা ফ্ল্যাগ করার পর, অতীতে বিভিন্ন বছরে প্রকাশিত একই ভুল তথ্যে ফেসবুক সতর্কীকরণ লেবেল বসিয়ে দেয়। কিন্তু ভুল তথ্যকে ফ্ল্যাগ করার পরবর্তী মাসে বা বছরে যদি সেই তথ্যটি ফের পোস্ট করা হয়, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফেসবুকের সতর্কীকরণ লেবেল থাকে না এবং এমন অন্তত ১৫টি নজির এই গবেষণায় উঠে এসেছে।

কোমলপানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পেপসিকে নিয়ে অনেকদিন ধরে চলে আসা একটি অপতথ্য হলো: “পেপসি শব্দের পূর্ণরূপ, ‘পে এভরি পেনি টু সেভ ইসরায়েল’” – অর্থাৎ ইসরায়েলকে বাঁচাতে প্রতিটি পয়সা দাও।” দাবিটি যে অসত্য তা একাধিকবার একাধিক ফ্যাক্টচেক সংস্থা প্রমাণ করেছে। অথচ, রিউমর স্ক্যানার বলছে, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছর কোনো না কোনোভাবে (অন্তত ১৫ বছর ধরে) এটি সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তথ্যটি যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তৃতীয়-পক্ষীয় ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা ফ্যাক্টওয়াচ, যাতে ভুল তথ্যের লেবেলও বসানো হয়। কিন্তু ভুয়া খবরটি ২০২৪ সালেও ছড়াতে দেখা গেছে এবং কোনো সতর্কীকরণ লেবেল ছাড়াই।

একইভাবে, ২০১৭ সাল থেকে সামাজিক মাধ্যমে চলে আসা একটি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অপতথ্য হলো: বাড়তি বিল করতে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে মৃত রোগীকে গরুর ইনজেকশন দিয়ে জীবিত দেখানো হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিষয়টি ভুয়া প্রমাণ করে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফ্যাক্টওয়াচ। কিছু ফেসবুক পোস্টে লেবেলও দেখা যায় যে, তথ্যটি ভুল। কিন্তু এখনও সামাজিক মাধ্যমটিতে এমন একাধিক পোস্ট সতর্কীকরণ লেবেল ছাড়াই পাওয়া যায় এবং ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও ভুয়া খবরটি নতুন করে ছড়িয়েছে।

ফেসবুকের দুইটি থার্ড পার্টি ফ্যাক্টচেকিং সংগঠনের সঙ্গে কাজ করা একজন বাংলাদেশি ফ্যাক্টচেকার ব্যাখ্যা করেছেন যে এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে: ফ্যাক্টচেকাররা কোনো ভুল তথ্য পেলে সেটি যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং এরপর তারা ফেসবুকের সিস্টেমে প্রবেশ করে সেখানে ভুয়া তথ্যের পোস্টগুলোকে, তাদের ভাষায় ‘রেটিং’ করেন এবং এরপরই ফেসবুক সাধারণত সেটিতে সতর্কীকরণ লেবেল বসায়। এরপর ফেসবুকের এআই ব্যবস্থা তাদের প্লাটফর্মে সেই নির্দিষ্ট বিষয় সংক্রান্ত পোস্টগুলোকে শনাক্ত করে এবং শনাক্ত করা পোস্টের তালিকা থেকে কোনটি ভুল তথ্য এবং কোনটি ভুল নয় সেটি তৃতীয় পক্ষীয় ফ্যাক্টচেকারদের ফের চিহ্নিত করতে বলে। এবং এই রেটিংয়ে সাধারণত একই বিষয়ে অতীতে যে কোনো সময় একই ভুয়া খবর ছড়ালে সেটি ধরা পড়ে এবং তাতেও সতর্কীকরণ লেবেল বসে।

তবে এই ফ্যাক্টচেকারের মতে, “এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যে একই বিষয়ের ওপর অতীতে পোস্ট হওয়া সব ভুয়া খবরগুলোকে শনাক্ত করতে পারে তা নয়, এবং অনেক সময় কিছু পোস্ট বাদ পড়ে যায়।” আবার দ্বিতীয় দফার এই রেটিং বাধ্যতামূলকও নয়। কোনো কোনো সময় ফ্যাক্টচেকারেরা এটি করেন আবার কোনো কোনো সময় সেটি এড়িয়েও যেতে পারেন। এবং এটি প্রযোজ্য শুধু অতীতের পোস্টের বেলায়। আগে ভুল হিসেবে রেটিং বা চিহ্নিত হওয়া পোস্ট যদি নতুন করে ফিরে আসে তখন কি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সেটিকে ধরে নিজে থেকেই সতর্কীকরণ লেবেল বসাতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন থার্ড পার্টি ফ্যাক্টচেকিং সংগঠনে কাজ করা দুইজন ফ্যাক্টচেকার বলেছেন যে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন। কারণ এমন কোনো নজির তাদের মনে পড়ছে না।

ফেসবুকের ক্ষেত্রে, দুই ফ্যাক্টচেকারই বলেছেন যে, বারবার ফিরে আসা ভুল তথ্য আরও ভালোভাবে মোকাবিলার জন্য বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে তোলা প্রয়োজন। একজন বলেছেন, “ভুল তথ্য শনাক্তের ব্যবস্থায় পক্ষপাতিত্বের বিষয়টিও আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিৎ।”

ইউটিউবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো অস্বচ্ছ। তারা কীভাবে তাদের প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্য মোকাবিলা করে তা এতোটাই অস্বচ্ছ ও অপর্যাপ্ত যে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন ফ্যাক্টচেকাররা ইউটিউবকে আখ্যায়িত করেছেন “অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানোর অন্যতম প্রধান বাহক” হিসেবে। প্রায় ৮০টি ফ্যাক্টচেকিং গ্রুপ একটি যৌথ চিঠিতে বলেছিল যে, ইউটিউব “তাদের প্ল্যাটফর্মে অসৎ কর্মকাণ্ডের সুযোগ করে দিচ্ছে, যার মাধ্যমে অন্যরা প্রতারিত বা বিভ্রান্ত হচ্ছে।”

গণমাধ্যমের ভুল যখন মিথ্যাকে টিকিয়ে রাখে

গত ১৪ বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে প্রচলিত এবং জনপ্রিয় একটি ভুল তথ্য হচ্ছে: “ইউনেস্কোর এক জরিপে বাংলা বিশ্বের সবচেয়ে মিষ্টি ও শ্রুতিমধুর ভাষা নির্বাচিত হয়েছে”। ২০১০ সালে এমন দাবি প্রথমে ছড়ায় টুইটারে। সেটির ভিত্তিতে একটি সংবাদ প্রকাশ করে ভারতীয় গণমাধ্যম, টাইমস অব ইন্ডিয়া। এরপর বিভিন্ন সময়ে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। বাংলাদেশের অন্তত তিনজন মন্ত্রী এমন তথ্য উল্লেখ করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বা বক্তব্য দিয়েছেন।

পরবর্তী বছরগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এই ভুয়া খবর ছড়াতে মূলধারার গণমাধ্যমের স্ক্রিনশট ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলেই ভুয়া খবরটি সামাজিক মাধ্যমে চলে আসে। খবরটি নিয়ে ইউটিউবে কুড়িখানেক ভিডিও পাওয়া যায়, যা কখনো সংবাদ, কখনো শিক্ষামূলক তথ্য এবং কখনোবা কুইজ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

২০১৯ সাল থেকে, বাংলা ভাষা নিয়ে আরেকটি ভুল তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে আসছে, যেখানে বলা হয় বাংলা লন্ডনে দ্বিতীয় সরকারি ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে। যদিও রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি এবং সিটি লিট নামের যে দাতব্য সংস্থার গবেষণার ভিত্তিতে এমন তথ্য সামনে এসেছিল— সেটিও ছিল অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। ছোট-বড় অনেক গণমাধ্যম এটিকে যাচাই ছাড়াই খবর হিসেবে প্রকাশ করে এবং ২০১৯ সালে এই ভুল তথ্যটি তখনকার একজন মন্ত্রীও শেয়ার করেন।

সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কীভাবে একটি ভুয়া তথ্য বছরের পর বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার প্রচারিত হতে থাকে— তার একটি উদাহরণ হলো পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ মাওলানা ফজলুর রহমানের একটি ভুয়া উদ্ধৃতি। এতে দাবি করা হয় যে তিনি বলেছেন, নারীরা জিন্স পরছে বলেই এতো ভূমিকম্প হচ্ছে। আসলে ২০১৫ সালে এই বক্তব্যটি পাকিস্তানের একটি সাইটে প্রকাশিত হয়েছিল স্যাটায়ার হিসেবে। সেই স্যাটায়ারটি ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম হয়ে চলে আসে বাংলাদেশে। ২০১৫ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠে সেই মওলানার কল্পিত উদ্ধৃতিটি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর সেটি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। এখন বিশ্বের কোথাও বড় ভূমিকম্প হলেই ভুয়া খবরটি সামাজিক মাধ্যমে নতুনভাবে ছড়াতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গে যুক্ত থাকে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুনরাবৃত্তিমূলক ভুল তথ্যের ১৭ ভাগেরই উৎস হলো প্রথাগত গণমাধ্যম। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সটন ইলেকশন কসোর্টিয়ামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে, লেখক স্যাম ওয়াং বলেছেন, “মানুষের একটি মিথ্যা বিশ্বাসকে মেনে নেওয়ার যে ঝুঁকি তা আরো খারাপ হয় যখন আস্থাভাজন গণমাধ্যমগুলো কখনো কখনো যাচাই না করে [খবর প্রকাশ করে]।” লেখায় তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অন্যতম সমাধান হলো, মিথ্যাটিকে যাচাইয়ের পাশাপাশি সংবাদ প্রতিবেদনে সঠিক তথ্যসহ একটি ঘোষণা দিয়ে দিয়ে ভুল তথ্যটিকে প্রতিস্থাপন করা।

আরো কিছু লেখা