বাংলাদেশের আওয়ামী লীগপন্থী বানোয়াট সংবাদ তৈরি ও প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা একটি স্বয়ংক্রিয় অপতথ্য নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও বন্ধ করার কথা জানিয়েছে এনথ্রোপিক। এআই প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গাইবান্ধায় অবস্থানরত এক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বয়ান এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করেছেন।
এনথ্রোপিকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট’-এ বলা হয়েছে, ওই কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার চালানো এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বানোয়াট তথ্য ছড়ানো।
কনটেন্টগুলো ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকের লাইভস্ট্রিমে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। এসব কনটেন্ট মূলত সীমিত সাক্ষরতার গ্রামীণ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল।
তবে এই কার্যক্রম পরিচালনা বা অর্থায়নে আওয়ামী লীগ নিজে জড়িত ছিল — এমন কোনো প্রমাণ এনথ্রোপিক পায়নি।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, তৈরি করা কিছু বয়ান ভারতপন্থী ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ এনথ্রোপিক পায়নি।
ভুয়া খবরের বিষয়বস্তু
এনথ্রোপিকের তদন্তে দেখা গেছে, তৈরি করা কনটেন্টগুলো ছিল আওয়ামী লীগপন্থী এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নিশানা করে তৈরি।
নেটওয়ার্কটি বানোয়াট অপপ্রচার চালিয়ে এসব প্রতিপক্ষকে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত করেছে এবং বিরোধীরা তালেবান-ধাঁচের শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে বলে দাবি করেছে। একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট হত্যার ষড়যন্ত্র ও হিট স্কোয়াডের গল্পও তৈরি করা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে লক্ষ্য করে বানোয়াট আর্থিক দুর্নীতি ও গোপন আন্তদলীয় জোটের দাবিও তৈরি করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এসব কনটেন্টকে “ভুয়া খবর” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কনটেন্টগুলোকে “উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক” রাখার পাশাপাশি এমন সহজভাবে তৈরি করতে বলা হয়েছিল, “যাতে গ্রামের মানুষও বুঝতে পারে”। দর্শকেরা এগুলোকে আসল খবর বলে বিশ্বাস করবে — এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই মূলত তাদের লক্ষ্য করা হয়েছিল।
| বয়ানের ধরন | কৌশল | লক্ষ্য |
| ধর্মীয় উগ্রবাদকে কেন্দ্র করে বয়ান | বিরোধীরা তালেবান ধাঁচের শরিয়াহ আইন চালুর পরিকল্পনা করছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে ঢুকে পড়ছে — এমন দাবি | জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, এনসিপি |
| সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র | হত্যার ষড়যন্ত্র ও হিট স্কোয়াডের বানোয়াট গল্প | অন্তর্বর্তী সরকার, ছাত্র আন্দোলনের নেতারা |
| বিদেশি এজেন্ট হিসেবে অপপ্রচার | ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা | জুলাই আন্দোলন |
| দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্র | বানোয়াট আর্থিক দুর্নীতি ও গোপন আন্তদলীয় জোটের দাবি | আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো |
স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি ও প্রচারের ব্যবস্থা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাইবান্ধায় অবস্থানরত ওই ব্যক্তি “fake_news_3.py” নামে একটি কাস্টম সফটওয়্যার ব্যবহার করে ক্লডে সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রোগ্রামটি একেক দফায় ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানোয়াট বয়ান এবং ১৫টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করার জন্য কোড করা হয়েছিল। প্ল্যাটফর্মের সীমা ও শনাক্তকরণ এড়াতে তিনি ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট পালাক্রমে ব্যবহার করতেন।
ওই ব্যক্তি অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বয়ান এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করেছেন। যেহেতু ক্লডে এখনও ছবি তৈরির সুবিধা যুক্ত হয়নি, তাই মিথ্যা বয়ানের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য দৃশ্যমান কনটেন্ট তৈরি করতে এসব প্রম্পট অন্য এআই মডেলে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

এনথ্রোপিকের ভাষ্য অনুযায়ী, কার্যক্রমটি একবার সেটআপ করার পর খুব কম মানবীয় তদারকিতে আধা-স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলত। ক্লডের এপিআই ব্যবহার করে বানোয়াট শিরোনাম, বিস্তারিত বয়ান ও ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হতো। কম সাক্ষরতার গ্রামীণ দর্শকদের লক্ষ্য করার জন্য প্রোগ্রামটিতে আবেগঘন বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছিল। তৈরি কনটেন্টগুলো নির্দিষ্ট ক্লাউড স্টোরেজ ফোল্ডারে রাখা হতো, সেখান থেকে অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর করা হতো।
এরপর একটি পৃথক আপলোড স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ইউটিউবের এপিআইয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভিডিও পোস্ট করতে পারত। তৃতীয় পক্ষের একটি কন্টিনিউয়াস-ইন্টিগ্রেশন সার্ভিসের মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি আগেই নির্ধারণ করা হতো। একই ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই ব্যক্তির আইপি ঠিকানাও আড়াল করা হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ভিডিও ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে বাংলাদেশের দর্শকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত একাধিক চ্যানেল ও প্রোফাইলে দেখা গেছে। তবে সব আউটপুট প্রকাশ করেছে, এমন নির্দিষ্ট চ্যানেল শনাক্ত করতে পারেনি এনথ্রোপিক। এসব অ্যাকাউন্টের বাইরে কনটেন্ট আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছিল, এমন কোনো প্রমাণও তারা পায়নি।
এনথ্রোপিক জানিয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্তের অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম শনাক্ত করা হয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই ধরনের আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে ভবিষ্যতে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা ঠেকাতেও তারা ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে তারা তথ্য শেয়ার করেছে।
এনথ্রোপিকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট’-এ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির শনাক্ত ও ব্যাহত করা বিভিন্ন এআই অপব্যবহারের কয়েকটি ঘটনা তুলে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সাইবার কার্যক্রম, প্রভাব বিস্তার, নজরদারি, প্রতারণা ও জালিয়াতিসহ এআই অপব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
এনথ্রোপিকের মূল প্রতিবেদন থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ডিসমিসল্যাবের সিনিয়র রিসার্চ অফিসার আহমেদ ইয়াসীর আবরার।

