(সতর্কীকরণ: অনলাইন আক্রমণের প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত কিছু আপত্তিকর শব্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)
ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গত ৭ সেপ্টেম্বর হেনস্তার শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে উল্লাস ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করতে দেখা গেছে একটি পক্ষকে।
এই পোস্টগুলোতে বাঁধনকে “জুলাই জঙ্গি”, “ডলার খোর” ও “ডিপস্টেটের দালাল” বলার পাশাপাশি চরম নারীবিদ্বেষী গালি ও হুমকিও দিতে দেখা গেছে। আর এ প্রবণতা দেখা গেছে ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজগুলোর ক্ষেত্রে।
এই প্রতিবেদনে ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ বলতে সেসব অ্যাকাউন্টকে বোঝানো হয়েছে, যেগুলোর নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির মতাদর্শের ইঙ্গিত আছে, প্রোফাইল ছবিতে দলটির উল্লেখযোগ্য নেতার ছবি বা লোগো রয়েছে অথবা নিয়মিত ওই অ্যাকাউন্ট থেকে দলটির পক্ষে পোস্ট করা হয়।
যা ঘটেছিল ইতালিতে
সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে যাওয়া বাঁধন গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে ভেনিসের মেস্ত্রে এলাকায় একটি পার্কে হামলার শিকার হন।
বাঁধনের অভিযোগ, কয়েকজন তার গায়ে পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন। তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। হামলাকারীরা নিজেদের “বঙ্গবন্ধুর সৈনিক” দাবি করে তাকে জোর করে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।

এছাড়া ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে এসে বাঁধন জানান, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে এ ধরনের হামলা করে তাকে দমানো যাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ছড়ানো ভিডিওতে কী দেখা যায়?
টেলেন্ট কান্তি দাস (Telent Kanti Das) নামের ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিও ছড়ানো হয়। সে পোস্টে লেখা, “ইতালিতে বাধোনের হু”গা লাল করে দিচ্ছে🤣 গা”লি দিচ্ছে এই সুদানির জি খানকির জি😁 এ কোন ধরনের গা”লি🤔।”
ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের বেলায় রাস্তার পাশের একটি খোলা জায়গায় বাঁধনকে কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে ধরেছেন। বাঁধনের পরনে রঙিন ছাপার পোশাক, চোখে চশমা ও হাতে মোবাইল ফোন।
ভিডিওতে নীল টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তির কোলে একটি কান্নারত শিশু ছিল। কয়েক ব্যক্তিকে বাঁধনের খুব কাছে এসে উত্তেজিতভাবে কথা বলতে এবং তার দিকে তেড়ে যেতে দেখা যায়। ধাক্কাধাক্কি ও হুড়োহুড়ির কারণে মোবাইল ক্যামেরাও বারবার নড়ে ওঠে। আক্রমণকারীদের কেউ কেউ তাকে “জুলাই জঙ্গি” বলে সম্বোধন করেন। এছাড়াও ভিডিওতে বাঁধনের গায়ে বিভিন্ন তরল পদার্থ নিক্ষেপ করতে ও মুখমণ্ডলে আঘাত করতে দেখা যায়।
হেনস্তাকারী যখন “দেশপ্রেমিক”
হেনস্তার ঘটনায় জড়িত ইতালি প্রবাসীদের দেশপ্রেমিক বলে সম্বোধন করতে দেখা গেছে কিছু পোস্টে। যেমন, জয়নাল আবেদিন (Joynal Abedin) নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে হেনস্তার ভিডিও শেয়ার করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “জুলাইয়ের ডলার খোর ডিপস্টেটের দালাল লাল বদর জুলাই জঙ্গি বাঁধনের বাধন খুলে দিয়েছে ইটালীর ভেনিসে অবস্থানরত প্রবাসী দেশপ্রেমিক বাঙালিরা! 🤣🤣🤣🤣”।
এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ওই পোস্টে ৩ হাজার ২০০-এর বেশি প্রতিক্রিয়া, চারশর বেশি মন্তব্য এবং দেড়শর অধিক শেয়ার দেখা যায়।

একইভাবে ধানমন্ডি-৩২ (Dhanmondi-32) নামের একটি পেজে বাঁধনকে হেনস্তার ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “জুলাই জ’ঙ্গি আজমেরী হক বাঁধনকে উত্তম মাধ্যম দিয়েছে, ভেনিসে ইতালি ছাত্রলীগ………।” সরকার মিলন (Sarkar Milon) নামের অ্যাকাউন্ট থেকেও বাঁধনকে গালিগালাজ করে একই ধরনের পোস্ট দেওয়া হয়।
গালি দিয়ে উল্লাস
রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে বাঁধনকে তার নারী পরিচয়ের কারণেও গালিগালাজ করা হয়েছে। তারাগুজামান রাজিব (Taragujaman Razib) নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিও শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “যা করার কর রোন্ডি মাতারি রে 🥺।।” মেহেদী হাসান (Mehedi Hasan) নামের একটি অ্যাকাউন্টে বাঁধনের ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, “জুলাই খানকি বাঁধন শালীরে ধর ধর 😁🤣🤣🤣”।
জয়নাল আবেদিন হাজারী (Zoynal Abedin Hazari) নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে বাঁধনকে “জঙ্গিদের বেশ্যা” বলা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “জ’ঙ্গি’দের বেশ্যা বাঁধন কে ইতালিতে প্রবাসীরা শাওয়া মাওয়া প্রায় ছেড়ি ফেলছিলো। এমন অবস্থা করেছে তার বর্তমানে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো কিন্তু এদের লজ্জা নাই।”
‘নারীদের সম্মান’, তবে বাঁধনকে নয়
কিছু পোস্টে নারীর প্রতি সম্মানের কথা বলা হলেও, নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে বাঁধনকে সেই সম্মান পাওয়ার অযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মো. মঞ্জুরুল ইসলাম (MD Monjurul Islam) নামের একটি অ্যাকাউন্টে কয়েকজন নারীর ছবি দিয়ে লেখা হয়, “নারীদের প্রতি আমাদের এমন সম্মান আচরণ থাকবে..! কিন্তু বাঁধন পতিতাদের জন্য নয়…….”।
এছাড়া “চট্টগ্রাম সন্দ্বীপ বঙ্গবন্ধুর সৈনিক” নামের একটি অ্যাকাউন্টে দেশ টিভির একটি সংবাদ শেয়ার করা হয়। ওই সংবাদটির শিরোনাম ছিল, ‘ইতালিতে ছাত্রলীগের আক্রমণের শিকার বাঁধন’। সে প্রতিবেদন শেয়ার করে পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, “জুলাই নামের জঙ্গি মাগী, খানকি মাগী, সাজানো গোছানো বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে এরা, কি সুন্দর বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করে দিল তারা এই মাগীরা। ইতালির ভেনিসে ছাত্রলীগ দ্বারা আক্রমণের শিকার আজমেরী হক বাঁধন।”
গালাগালির পাশাপাশি সরাসরি হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে কোনো কোনো পোস্টে। চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের একটি সংবাদ শেয়ার করেন মিজানুর রহমান (Mizanur Rahaman) নামের এক ব্যবহারকারী। সংবাদে বাঁধনের একটি উদ্ধৃতি ছিল— তাকে “দমানো সহজ না”। এটি শেয়ার করে মিজানুর ক্যাপশনে লেখেন, “তুদের কে কুত্তা করে ঝুলানো হবে।পতিত খানকি।” (বানান অপরিবর্তিত)।
কারণ রাজনৈতিক, আক্রমণ নারীবিদ্বেষী
‘পলিটিক্যাল স্টাডিজ’ সাময়িকীর এক গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে করা হামলাও অনেক সময় লিঙ্গভিত্তিক রূপ নিতে পারে। হামলায় যৌন গালি বা নারী-পুরুষের প্রচলিত ধারণা ব্যবহার করা হলে তা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় পরিণত হয়।
এ ক্ষেত্রেও কিছুটা তেমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ফেসবুকে তাকে প্রথমে “জুলাই জঙ্গি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, পরে নারী পরিচয়কে লক্ষ্য করে দেওয়া হয় লিঙ্গভিত্তিক গালি।
অন্যদিকে ‘ক্রিয়েটিভিটি রংড’ (Creativity Wronged) শীর্ষক এক প্রতিবেদনে নারী শিল্পীদের অধিকার লঙ্ঘনের ৯০টির বেশি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, শিল্প বা সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে অধিকারের পক্ষে কথা বললে অনেক নারী শিল্পীকেই এমন হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়।
ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এর নজির রয়েছে। ‘কনটেম্পোরারি পলিটিকস’ সাময়িকীর এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২২ সালে ইরানের ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় থাকায় অভিনেত্রী নাজানিন বনিয়াদিকে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় যৌন অবমাননাকর শব্দে আখ্যায়িত করা হয়। পরে তা সরকারপন্থী অ্যাকাউন্টগুলোতেও ছড়ায়। গবেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল তাকে হেয় করে জনসম্মুখে তার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করা।
উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে অবস্থান নেওয়া কোনো নারীকে আক্রমণের সময় তার রাজনৈতিক সমালোচনার পাশাপাশি নারীত্ব ও যৌনতাকে অবমাননার হাতিয়ার করার প্রবণতা দেখা গেছে।
মেটার নীতি লঙ্ঘন
ফেসবুকে করা এই ধরনের পোস্ট ও মন্তব্যগুলো মেটার নির্দিষ্ট কমিউনিটি গাইডলাইনের লঙ্ঘন। মেটার ‘বুলিং অ্যান্ড হ্যারাসমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী, কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে যৌন কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। বাঁধনকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া লিঙ্গভিত্তিক গালিগুলো এই নীতির সংজ্ঞার সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়।
এছাড়া, মেটার ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড ইনসাইটমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী সহিংসতার হুমকি দেওয়া নিষেধ। বাঁধনকে উদ্দেশ্য করে “কুত্তা করে ঝুলানো হবে” ধরনের বক্তব্য হুমকির আওতায় পড়ে, যা মেটার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

