কদরুদ্দীন শিশির

অতিথি লেখক
সিলেটের নির্বাচন নিয়ে জরিপ: একটি ইউরোপভিত্তিক গবেষণা সংস্থার সন্ধানে
This article is more than 11 months old

সিলেটের নির্বাচন নিয়ে জরিপ: একটি ইউরোপভিত্তিক গবেষণা সংস্থার সন্ধানে

কদরুদ্দীন শিশির

অতিথি লেখক

গত ১৮ জুন থেকে ২০ জুনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে একটি জরিপের খবর প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে একটির উদাহরণ দিচ্ছি।

জরিপটি নিয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘সারাবাংলা ডটনেট’ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তার শিরোনাম ছিল, “সিলেটে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জিততে পারে নৌকা: জরিপ”।

প্রতিবেদনের প্রথম অনুচ্ছেদটি হুবহু উল্লেখ করছি: “দুই দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে ভোটারদের কাছে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তিনিই সিটির নগর পিতা হতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন মেন্যুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা) নামে ইউরোপভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।”

আসন্ন মেয়র নির্বাচন নিয়ে ‘ইউরোপভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ এর ‘জরিপ’ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করেছে ডেইলি স্টার (ইংরেজি), ডেইলি স্টার (বাংলা), দৈনিক সমকাল, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক কালবেলা, দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক আমাদের সময়, ঢাকা টাইমস, সিলেটের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক উত্তর পূর্ব, এবং সাদাকালো নিউজ

মূলধারার এতগুলো সংবাদমাধ্যমে খবরটি পড়ে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন ম্যান্যুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা)’ এর ব্যাপারে আগ্রহ জাগলো।

প্রাথমিকভাবে গুগল এবং বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ায় সার্চ করে এই নামের কোনো গবেষণা সংস্থার সন্ধান মিললো না।

উল্লিখিত সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে দুটির (ডেইলি স্টার ও ঢাকা টাইমস) প্রতিবেদনে একটু ভিন্ন তথ্য দেয়া হয়েছে।

ডেইলি স্টার এর বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে এভাবে: “ইউরোপভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াইজ গভ (Wise GOV) এর সহযোগী সংস্থা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন ম্যানুভারিং আর্কিটেকচার সিলেটে ‘ভোট জরিপ’ করেছে।”

এবার ওয়াইজ গভ নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সন্ধানে নামলাম। কিন্তু সার্চ ইঞ্জিন গুগল বা সোশাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ফেসবুক, লিংক্ডইন, টুইটার ইত্যাদির কোথাও এমন নামের কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ মিললো না।

এরপর খবরটি প্রকাশকারী দুুটি সংবাদমাধ্যমের সিলেটে প্রতিবেদকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেল তারা সিলেট (অর্থাৎ নির্বাচনী মাঠ) থেকে এ সংক্রান্ত কোন খবর পাঠাননি, বরং তাদের ঢাকা অফিস থেকে খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে।

অত‍ঃপর দুটি সংবাদমাধ্যমের ঢাকা অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরটির সূত্র জানতে চাইলে তারা ওয়াইজ গভ এর একজন কর্তাব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি প্রেস রিলিজের কথা জানান।

প্রেস রিলিজের একটি সফট কপি হাতে পাওয়ার পর দেখা যায় সেখানে ইংরেজিতে শাকির উদ্দিন ( S Shakir Uddin) নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষর রয়েছে। এরপর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে (যার শুরুর কোড +44) এস শাকির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করি।

শাকির উদ্দিনের কাছে আমার ৫টি প্রশ্ন ছিল:

১. সিমা বা ওয়াইজ গভ এর ওয়েবসাইটের ঠিকানাগুলো কী?

২. এই সংস্থাগুলো কোন দেশে নিবন্ধিত এবং এগুলোর প্রধান ব্যক্তি কারা?

৩. আলোচ্য নির্বাচনী জরিপের সঙ্গে শতাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রধান গবেষকবৃন্দ ও বিশ্লেষকদের নাম পরিচয় কী?

৪. আপনাদের জরিপের মূল রিপোর্টটি কি শেয়ার করা যাবে?

৫. ওই সংস্থা/সংস্থাগুলোতে আপনার ভূমিকা কী?

প্রশ্নগুলোর উত্তরে জনাব শাকির উদ্দিন জানান, ওয়াইজ গভ এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনি একজন এবং বর্তমানে এটি তারই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। 

তিনি আরও জানান, ওয়াইজ গভ এতদিন ইনতেরেসা অ্যাসোসিয়েশন (inTeresa Association) নামক সংস্থার একটি প্রকল্প ছিল এবং “সম্প্রতি বাড়তি কাজের কারণে ওয়াইজ গভ একটি আলাদা স্বাধীন সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করেছে এবং যুক্তরাজ্যে এটির নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।” অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি এখনও নিবন্ধিত নয়।

interesa.org ডোমেইনটি ২০২১ সালের ৭ মার্চ তারিখে নিবন্ধন করা হয়, যা ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে নবায়ন করা হয়েছে।

ওয়েবসাইটের হোম পেজ থেকে জানা যায়, ইনতেরেসা অ্যাসোসিয়েশন পর্তুগাল ভিত্তিক একটি ‘নার্সিং কেয়ার’ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। ওয়েবসাইটটিতে ‘অ্যাবাউট’, ‘মিশন’, ‘ভিশন’, ‘গোল’, ‘সার্ভিসেস’ ও ‘মেম্বারশিপ’ নামে বিভিন্ন ট্যাব আছে, তবে সেগুলোতে ক্লিক করলে কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

ওয়েবসাইটটি আমার কাছে সাধারণ অপেশাদার কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মতো মনে হয়েছে।

শাকির উদ্দিন জানিয়েছেন, তার সংস্থা ‘ওয়াইজ গভ’ সিলেটের স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সঙ্গে মিলে চলতি মেয়র নির্বাচন উপলক্ষে একটি পাইলট জরিপ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেই যৌথ প্রকল্পের নাম: সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন ম্যান্যুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা)। এই প্রকল্পটিকেই তারা ওয়াইজ গভ এর ‘সিস্টার কনসার্ন’ বলছেন। এটিরও কোন ওয়েবসাইট নেই, এবং এটিও কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নয়।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে যেভাবে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন ম্যানুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা)-কে একটি ইউরোপভিত্তিক ‘গবেষণা সংস্থা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেই তথ্যটি সঠিক নয়।

এবং ওয়াইজ গভ-এরও গবেষণা সংস্থা হিসেবে আগের কোন কাজ নেই, এমনকি এটির প্রধান শাকির উদ্দিন জানিয়েছেন যে, ওয়াইজ গভ-এর নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন এবং এটির কোনো ওয়েবসাইট নেই।

সিলেটের নির্বাচনী জরিপের মূল জরিপ/গবেষণা রিপোর্টটি শেয়ার করা যাবে কিনা একাধিকবার জানতে চাইলে জনাব শাকির জানান, সংবাদমাধ্যমে (প্রেস রিলিজ আকারে) পাঠানো ৪ পৃষ্ঠার একটি ডকুমেন্টই (এখানে পিডিএফ যুক্ত) তাদের মূল জরিপ রিপোর্ট।

সেই রিপোর্টের শিরোনাম হিসেবে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে “সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন ম্যানুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা)” এবং এর নিচে একটি স্লোগান রয়েছে: “উই ম্যানেজ পাবলিক রিলেশন্স ফর ইউ”।

এ থেকে বোঝা যায় সংস্থাটির কাজের ধরন জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের মতো।

ওয়াইজ গভ-কে পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজমেন্ট ফার্ম বলা যায় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে জনাব শাকির উদ্দিন বলেন, ”ইয়েস, দ্যাট ইজ পার্ট অব আওয়ার প্রজেক্ট, বাট নট দ্যাট ইজ দি অনলি অরগান।” অর্থাৎ, এটি তাদের প্রকল্পের একটি অংশ তবে তাদের কাজের একমাত্র শাখা নয়।

শাকির উদ্দিন জানান, সিমা-এর জরিপে আরও যেসব ব্যক্তিরা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জহির উদ্দিন।

তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জরিপের মেথডোলোজি বা গবেষণা পদ্ধতি বোঝার জন্য মূল প্রতিবেদনটি চাওয়া হলে তিনি জানান চার পৃষ্ঠার নথিটিই তাদের জরিপ প্রতিবেদন। এর চেয়ে বেশি জানতে চাইলে নির্বাচনী ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচনের পরে যোগাযোগ করলে তিনি তাদের উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে কথা বলতে পারবেন।

চার পৃষ্ঠার যে নথি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে সেটি মূলত একটি প্রেস রিলিজ, এবং সেখানে জরিপের উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত কোনো বিস্তারিত আলোচনা নেই। শুধু একটি লাইনে বলা হয়েছে: “বি:দ্র: এই গবেষণায় স্নো-বল, সট অ্যানালিসিস, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, পর্যবেক্ষণ এবং জরিপ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।”

কদরুদ্দীন শিশির

বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত ফ্যাক্টচেকার। বর্তমানে তিনি এএফপি ফ্যাক্টচেকের বাংলাদেশ সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

আরো কিছু লেখা