মৌ দাস

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
Bdnews ai feature

জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরি নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে এআই-সম্পাদিত ছবি

মৌ দাস

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

নাটোর রেলওয়ে স্টেশনে এক জার্মান পর্যটকের ল্যাপটপ, ক্যামেরাসহ ব্যাগ চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এক যুবককে শনাক্ত করা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর। তবে প্রতিবেদনের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবিটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদনা করা হয়েছে। এতে পর্যটকের চেহারাসহ বেশ কিছু দৃশ্যমান উপাদান বদলে গেছে। ছবিটি এআই দিয়ে সম্পাদনার কোনো তথ্য ছবির ক্যাপশনে অথবা প্রতিবেদনের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে (আর্কাইভ) বলা হয়, জার্মানির ১৮ বছর বয়সী নাগরিক ক্রিল ল্যান্ডার বাংলাদেশে ঘুরতে এসে ভারতে যাওয়ার আগে নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে অবস্থান করছিলেন। এ সময় ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক যুবক তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে পরে তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় নাটোর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ওই পর্যটক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে এআই সম্পাদিত ছবি

প্রতিবেদনে সান্তাহার রেলওয়ে থানার ওসির বরাতে বলা হয়, পুলিশ নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেছে। সেখানে বুধবার বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটের একটি ফুটেজে হলুদ কোটি পরা এক যুবককে জার্মান পর্যটককে ডেকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এর ১৬ মিনিট পর ওই যুবককে কোটি খুলে একটি ব্যাগ নিয়ে চলে যেতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনের ভেতরে সিসিটিভির প্রকৃত ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি ব্যবহার করা হলেও প্রচ্ছদের ছবিতে কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। মূল ফুটেজে জার্মান পর্যটকের বাঁ হাতের কাছে একটি বস্তু দেখা যায়, কিন্তু প্রচ্ছদের ছবিতে তা গায়েব হয়ে গেছে। তার চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে প্রচ্ছদের ছবিতে। চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন হলুদ কোটি পরা ব্যক্তির শার্টের প্যাটার্ন বদলে লম্বালম্বি চেক হয়ে গেছে। ওই ছবিতে তার মুখ মূল ফুটেজের তুলনায় অনেক স্পষ্ট হলেও, দুই ছবির মুখের মধ্যে মিল আছে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ ধরনের পরিবর্তনের কারণে ছবিটি কীভাবে সম্পাদিত হয়েছে, তা আরও যাচাই করে দেখা হয়।

সিন্থআইডি ডিটেক্টরের ফলাফলে দেখা যায় ছবিটি ওপেনএআই-এর সাহায্যে সম্পাদনা করা হয়েছে

বাড়তি যাচাইয়ে ছবিটি সিন্থআইডি শনাক্তকরণ টুল দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে বলা হয়, “This media was made or edited with OpenAI”। অর্থাৎ, যাচাই করা মিডিয়াটিতে ওপেনএআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রচ্ছদের ছবিটি সিসিটিভি মূল ফুটেজ থেকে পাওয়া ফ্রেমের সরাসরি, অপরিবর্তিত উপস্থাপন নয়। প্রতিবেদনটিতে ছবিটি এআই দিয়ে সম্পাদনার কোনো তথ্য বা ডিসক্লেইমার দেওয়া হয়নি। 

সিসিটিভি ফুটেজ বিশেষ করে কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ছবি বা ভিডিওকে উজ্জ্বল করা, কনট্রাস্ট বাড়ানো কিংবা আকার পরিবর্তনের মতো সম্পাদনা এবং এআই দিয়ে অস্পষ্ট অংশকে নতুন করে তৈরি করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এআই কোনো ছবির কম দৃশ্যমান অংশকে অনুমানের ভিত্তিতে নতুন পিক্সেল বা বিস্তারিত তৈরি করে পূরণ করতে পারে। ফলে মূল ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্যের বাইরে নতুন কোনো দৃশ্যমান তথ্যও ছবিতে যুক্ত হতে পারে।

তদন্তাধীন বিষয়ে এআই দিয়ে সম্পাদিত ছবি ব্যবহার কেন ঝুঁকিপূর্ণ 

চলতি বছরের ৯ জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদন দেখিয়েছে, অস্পষ্ট ছবি বা ভিডিওকে এআই দিয়ে ‘স্পষ্ট’ করার ঝুঁকি কতটা গুরুতর। ৭ জানুয়ারির ওই ঘটনায় মিনিয়াপোলিসে এক আইসিই কর্মকর্তার গুলিতে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে এআই ব্যবহার করে কর্মকর্তার মুখ ‘উন্মোচনের’ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একই ভিডিও থেকে তৈরি বিভিন্ন এআই ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন মুখ দেখা যায় এবং সেগুলোর ভিত্তিতে ভুল ব্যক্তিকে কর্মকর্তা হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

একই সমস্যা দেখা গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল অ্যাক্টিভিস্ট চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ডেও। অস্পষ্ট ভিডিও বা ছবিকে এআই দিয়ে উন্নত করার ফলে সন্দেহভাজনের চেহারা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এআই শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠান ‘গেটরিয়াল সিকিউরিটি’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাট ময়নাহান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন, “এআই টুলগুলো কেবল অতীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবতাকে পুনর্গঠন করতে পারে। এটি কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা নয়। আপনি যদি এআই বিশেষজ্ঞ না হন, তবে উপকারের চেয়ে ক্ষতি করার সম্ভাবনাই বেশি।”

মিনিয়াপোলিসেই গত ২৪ জানুয়ারি ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে নার্স অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হন। সে ঘটনায় একটি ঝাপসা ভিডিও থেকে এআই ব্যবহার করে একটি ‘উচ্চ রেজল্যুশনের’ ছবি তৈরি করা হয়। ছবিটি দেখে অনেকে দাবি করেন, প্রেটির হাতে থাকা বস্তুটি একটি অস্ত্র। কিন্তু এএফপি মূল ভিডিও যাচাই করে দেখতে পায়, তার হাতে একটি ফোন ছিল। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির অধ্যাপক হ্যানি ফারিদ এএফপিকে বলেন, “এসব ছবির ক্ষেত্রে সমস্যা হলো এআই দিয়ে ছবি পরিষ্কার করতে গেলে বাড়তি বস্তু যোগ (হ্যালুসিনেশন) করে।”

থাই পিবিএস ভেরিফাইয়ের একটি সাম্প্রতিক ফ্যাক্টচেকও দেখিয়েছে, তদন্তের কাজে এআই দিয়ে ঝাপসা ছবি পরিষ্কার করা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে থাইল্যান্ডের নারাথিওয়াত প্রদেশে এক হামলার পর সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া একটি ঝাপসা ছবিকে এআই দিয়ে সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। ছবিটিতে সন্দেহভাজনের হাতে একটি অস্ত্র এবং হাতে একটি ট্যাটু দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু থাই পিবিএস ভেরিফাই মূল সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখতে পায়, আসলে কোনো ট্যাটু ছিল না।

চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর জেতসাদা সালাথং এই ঘটনার ব্যাখ্যায় বলেছেন, এআই আপস্কেলিং ঝাপসা ছবির ‘লুকানো তথ্য’ উদ্ধার করে না; বরং অস্পষ্ট পিক্সেল কী হতে পারে, তার “পরিসংখ্যানভিত্তিক অনুমান” করে অতীত তথ্যের ওপর নির্ভর করে নতুন করে আঁকে। ফলে ছবিটি দেখতে পরিষ্কার হলেও সেটি মূল ছবির বিশ্বস্ত সংস্করণ নাও হতে পারে।

আরো কিছু লেখা