সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

ইন্টার্ন, ডিসমিসল্যাব
Fact-check: Fake RTV and Channel 24–branded photocards falsely claim an NCP activist’s death and crowds at Tasnim Jara’s home, verified as misleading.

তাসনিম জারার বাড়িতে পাওনাদারের ভিড় ও চুরির সময় এনসিপি কর্মীর মৃত্যু-গণমাধ্যমের নামে ভুয়া ফটোকার্ড

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

ইন্টার্ন, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে আরটিভি এবং চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের আদলে তৈরি করা দুটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে। আরটিভির বলে ছড়ানো ফটোকার্ডে দাবি করা হচ্ছে, ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে এনসিপি কর্মী প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নামে প্রচারিত ফটোকার্ড বলা হচ্ছে বিকাশে টাকা পাঠানো ব্যক্তিরা ভিড় করছেন তাসনিম জারার বাড়িতে। তবে, ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, এই দুটো ফটোকার্ডই ভুয়া।

চুরি করতে গিয়ে এনসিপি কর্মীর মৃত্যুর দাবিতে আরটিভির নামে ভুয়া ফটোকার্ড

গত ২ জানুয়ারি ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। সংবাদমাধ্যম আরটিভির আদলে সেই ফটোকার্ডের একটি ট্রান্সফরমারের ছবি সংযুক্ত করে ভেতরে লেখা, “ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল এনসিপি কর্মীর” ফটোকার্ডের উপরের অংশে “০২ জানুয়ারি ২০২৬” তারিখ এবং নিচে আরটিভির লোগো, কিউআর কোড এবং ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া আছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ফটোকার্ডটিতে ৯ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবং ৩৫০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে।

ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল,পেজ এবং গ্রুপ (, , , , ) থেকে একই দাবিতে ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়েছে। ক্যাপশনে লেখা, “বিএনপির যোগ্য উত্তরসূরী এমসিপি 😁”(বানান অপরিবর্তিত)।

ফটোকার্ডের সত্যতা যাচাই করতে আরটিভির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজটি যাচাই করতেই চলতি বছরের ২ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। ফটোকার্ডের ভেতরে লেখা, “ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল চোরের।” ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডের সঙ্গে আরটিভিতে প্রকাশিত ফটোকার্ডের শেষের “এনসিপি কর্মী” ছাড়া বাকি সবকিছু হুবহু মিলে যায়। ফটোকার্ডের মধ্যে “এনসিপি কর্মী” অংশটুকুর ফন্ট বাক্যের আগের অংশের চেয়ে একদম ভিন্ন।

আরটিভিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের খানপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানায়, রাতের কোনো এক সময় সংঘবদ্ধ চোর চক্রটি খানপাড়া এলাকার একটি ফাঁকা স্থানে অবস্থিত বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে ট্রান্সফরমার খুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ট্রান্সফরমার সঙ্গে লাগানো শিকল ও তালা কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন চোর চক্রের এক সদস্য। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় চোর।

ফটোকার্ড সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আরটিভির সাথে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। সংবাদমাধ্যমটির অনলাইন ইনচার্জ আবু আজাদ জানান, ফটোকার্ডটি ভুয়া। কার্ডের ফন্ট ভিন্ন। তিনি আরও জানান, মূল খবরের লিংক তাদের ফটোকার্ডে থাকা কিউআর কোডে সংযুক্ত থাকে। যখন ভুয়া কার্ডে থাকা কোডটি যাচাই করা হয়, আরটিভির মূল প্রতিবেদনই পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, আরটিভি নামে ছড়ানো ফটোকার্ডের লেখায় চোরের জায়গায় এনসিপি কর্মী বসিয়ে ফটোকার্ডটি সম্পাদিত করে প্রচার করা হচ্ছে।

টাকা ফেরত চেয়ে তাসনিম জারার বাড়িতে মানুষের ভিড় বলে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া

ফেসবুকে গত ৩ জানুয়ারি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারার নামে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। কার্ডে অনেক মানুষের ভিড়ে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বসে থাকতে দেখা যায়। ফটোকার্ডের ভেতরে লেখা, “বিকাশে টাকা পাঠানো ব্যক্তিদের ভীড় তাসনীম জারার বাড়িতে।”

ফটোকার্ডের উপরে মাঝামাঝি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের লোগো দেওয়া। এছাড়া কার্ডের নিচে বাম পাশে তারিখ হিসেবে “৩ জানুয়ারি ২০২৬” লেখা এবং ডানপাশে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “যৌন চিকিৎসা দিয়ে টাকা শোধ দেয়া যেতে পারে” (লেখা অপরিবর্তিত)।

ফটোকার্ডের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। নির্দিষ্ট এই তারিখে এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড বা প্রতিবেদনের লিংক সংবাদমাধ্যমের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। সংবাদমাধ্যমটির জয়েন্ট নিউজ এডিটর ও অনলাইন ইনচার্জ মাজহার খন্দকার জানিয়েছেন, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর থেকে ৩ জানুয়ারি  এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়নি। 

আরও বিস্তারিত যাচাইয়ে ফটোকার্ডের ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ঢাকা পোস্টের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাসনিম জারা গত বছর ঈদ পালন করেছেন শ্বশুরবাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার ভান্ডারিয়াতে। ঈদের পরের দিন তিনি সেখানেই ছিলেন। ওইদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক শ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন। সেখানে এক বাড়ির ঘরের উঠোনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মত বিনিময় সভা করার সময় তোলা হয়েছিল ছবিটি। তাসনিম জারার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকেও ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল এই ছবিটি আপলোড  করা হয়।

সে ছবিটি ব্যবহার করেই ভুয়া ফটোকার্ড বানানো হয়েছে। এবং দাবি করা হচ্ছে বিকাশে টাকা পাঠানো ব্যক্তিরা ভিড় করছেন তাসনিম জারার বাড়িতে।

অর্থাৎ, তাসনিম জারা প্রসঙ্গে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নামে ছড়ানো ফটোকার্ডটি ভুয়া। 

প্রসঙ্গত,ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির নেত্রী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে জনসাধারণ থেকে ‘ক্রাউড ফান্ডিংয়ের’ (গণ–অনুদানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছেন তাসনিম জারা। ওই অর্থের পরিমাণ ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।

আরো কিছু লেখা