
শায়খ আহমাদুল্লাহ বা মিজানুর রহমান আজহারিকে নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী হিসেবে এবং আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনানকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দাবি করে যমুনা টিভির লোগোযুক্ত একাধিক ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেক বলছে, এসব ফটোকার্ড ভুয়া। এছাড়া ফটোকার্ডে ব্যবহার করা সকল ছবি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
সম্প্রতি এক ফেসবুক পেজ থেকে ফটোকার্ড পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী শায়খ আহমাদুল্লাহ এবার আমরা হাদি…”। যমুনা টিভির লোগো সম্বলিত এই ফটোকার্ডের ভেতরেও লেখা, নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী শায়খ আহমাদুল্লাহ।

ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবিতে দেখা যায়, চেয়ারে বসা শায়খ আহমাদুল্লাহর পেছনের দেয়ালে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” এর লোগো ও পাশে বাংলাদেশের পতাকা। তার সামনে নেমপ্লেটে লেখা, “শেখ আহমাদুল্লাহ। মাননীয় ধর্মমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার”। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ৩ হাজার সাতশত বারের বেশি শেয়ার হয়েছে।
ভিন্ন আরেকটি প্রোফাইল থেকে যমুনা টিভির লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে মিজানুর রহমান আজহারিকে নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী দাবি করে। ফটোকার্ডে লেখা, “নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী মিজানুর রহমান আজহারী।” ছবিতে দেখা যায় নেমপ্লেটে লেখা, “ধর্মমন্ত্রী মিজানুর রহমান আজহারি, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ” (অনুবাদিত)।
নাম ব্যতীত শায়খ আহমাদুল্লাহকে ধর্মমন্ত্রী দাবি করা পোস্টের ক্যাপশনের সঙ্গে এই পোস্টের ক্যাপশন হুবহু মিলে যায়। এখানে লেখা হয়েছে, “আলহামদুলিল্লাহ নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী মিজানুর রহমান আজহারী। এবার আমরা হাদির…”। ছবিতে পেছনের দেয়ালে ভিন্ন একটি লোগো দেখা যায়। সামনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বুমও দেখা যায়। পোস্টটি এখন পর্যন্ত ২ হাজার নয় শতবারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে।
আরেকটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে যমুনা টিভির লোগো দেওয়া একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ নবনির্বাচিত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান এখন থেকে শিক্ষা…”। তবে ফটোকার্ডে লেখা, “মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান”।

ফটোকার্ডের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড শায়খ আহমাদুল্লাহকে ধর্মমন্ত্রী দাবি করা ছবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনানের সামনে রাখা নেমপ্লেটে লেখা, “আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার”। ক্যাপশন, কার্ড ও নেমপ্লেটে দাবি করা পদমর্যাদার অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এ পর্যন্ত পোস্টটি দেড় হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়েছে।
শায়খ আহমাদুল্লাহ ও মিজানুর রহমান আজহারিকে ধর্মমন্ত্রী দাবি করা ফটোকার্ডের পোস্ট দুইটির এডিট হিস্টোরিতে দেখা যায়, একই পোস্ট একাধিকবার এডিট করে বিভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হয়েছে। আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনানকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দাবি করে করা পোস্ট পৌনে ছয় ঘণ্টা পর এডিট করে মিজানুর রহমান আজহারিকে ধর্মমন্ত্রী বলে দাবি করা হয়েছে। একই ক্যাপশনে কেবল নাম সম্পাদনা করে ফটোকার্ড বদলে দেওয়া হয়েছে।
প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে যমুনা টেলিভিশনের ফটোকার্ডের সঙ্গে কিছু অমিল লক্ষ করা যায়। ছড়িয়ে পড়া প্রথম ফটোকার্ডের ব্যাকগ্রাউন্ডের রং কিছুটা ভিন্ন এবং লেখার আকারও স্বাভাবিকের তুলনায় বড়। প্রথম দুইটি কার্ডের লেখার ফন্টের সঙ্গেও যমুনা টিভির ফটোকার্ডের ফন্টের অমিল আছে। তাছাড়া যমুনা টিভির ফটোকার্ডে তারিখ দেওয়া থাকে যা এসব ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। সাধারণত শিরোনাম কিংবা ফটোকার্ডে বিরামচিহ্ন ব্যবহার করা না হলেও ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডে দাঁড়ি-কমা ব্যবহার করা হয়েছে। যমুনা টিভির ফটোকার্ডে একটি ওয়াটারমার্ক থাকে যা ছড়িয়ে পড়া কোনো ফটোকার্ডেই নেই।

ফটোকার্ডের সত্যতা নিশ্চিত করতে যমুনা টিভির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো এবং ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। তবে এই ধরনের কোনো ফটোকার্ড বা প্রতিবেদনের লিংক সংবাদমাধ্যমের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সংবাদমাধ্যমটির সাথে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। যমুনা টিভির নিউ মিডিয়া বিভাগের সম্পাদক রুবেল মাহমুদ ডিসমিসল্যাবকে নিশ্চিত করেছেন, ছড়িয়ে পড়া এসব ফটোকার্ড ভুয়া।
এছাড়াও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সবকয়টি ফটোকার্ডে ব্যবহার করা ছবির নিচের দিকে ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের একটি লোগো রয়েছে। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির “ন্যানো বানানা” নামের একটি মডেল ব্যবহার করে ছবি সম্পাদনা করলে সম্পাদিত ছবিতে লোগোটির এমন জলছাপ থাকে। গুগল জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল “সিন্থ-আইডি” ব্যবহার করে এটি এআই দিয়ে তৈরি কি না জানতে চাওয়া হয়। জেমিনির সিন্থ-আইডি ফিচার জানায়, প্রত্যেকটি ছবির সম্পূর্ণ বা বেশিরভাগ অংশই গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, শায়খ আহমাদুল্লাহ বা মিজানুর রহমান আজহারিকে নবনির্বাচিত ধর্মমন্ত্রী দাবি করে কিংবা আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনানকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দাবি করে যমুনা টিভির আদলে প্রকাশিত ফটোকার্ড তিনটি ভুয়া।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন কুমিল্লা-৩ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এবং শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ঢাকা-১৩ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ।