নোশিন তাবাসসুম

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
সেনাবাহিনী দ্বারা প্রায় ২০০০ এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে বানানো ফ্যাক্টচেক

সেনাবাহিনী দ্বারা প্রায় ২০০০ এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে বানানো

নোশিন তাবাসসুম

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

রাজধানীর একটি বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে প্রায় ২০০০টি এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ফেসবুকে একটি ছবি ছড়িয়ে করা হচ্ছে এমন দাবি। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি।

গত ২০ জানুয়ারি ফেসবুকে “রাজু ভাই” নামের একটি পেজ থেকে ছবিটি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয়, “চারিদিকে যখন গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য হাহাকার, ১২ কেজি LPG গ্যাসের সিলিন্ডার ২০০০ টাকাতেও মিলছে না। সাধারণ মানুষের রান্নাঘর যখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম, ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে আশার আলো হয়ে দাঁড়ালো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। রাজধানীর একটি বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২০০০টি LPG গ্যাসের সিলিন্ডার। যেখানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু চক্র লাভের চেষ্টা করছিল, সেখানে সেনাবাহিনীর এই অভিযান সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এক সাহসী পদক্ষেপ। দেশের মানুষের পাশে থাকার এই দৃষ্টান্ত আবারও প্রমাণ করলো— বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানেই আস্থা, নিরাপত্তা ও সাহস। স্যালুট জানাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।” 

সেনাবাহিনী দ্বারা প্রায় ২০০০ এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে বানানো
“রাজু ভাই” নামের পেজের দুটি পোস্টের স্ক্রিনশট।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ৭ হাজার ৬০০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে। পোস্টের কমেন্টে দেখা যায় অনেকেই ছবিটিকে সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “সেলুট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হোক। এভাবে হাজার হাজার সিলিন্ডার বেড়িয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ।” আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “এগুলো বিনামূল্যে জনগণের মাঝে বিতরণ করে দেওয়া হউক।” 

ছবিতে দেখা যায়, একটি বিল্ডিং এর ছাদে অসংখ্য গ্যাস সিলিন্ডার সারিবদ্ধ করে রাখা। সিলিন্ডারগুলোতে লেখা, “যমুনা এলপিজি।” সিলিন্ডারগুলোর সামনে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একাধিক সেনা সদস্য দাঁড়িয়ে আছেন। 

একই পেজ থেকে একাধিক (, ) ছবি পাওয়া যায়। সব ছবিতেই ভবনের ছাদে অসংখ্য গ্যাস সিলিন্ডার দেখা যায়। একটি পোস্টের ক্যাপশনের একটি অংশে বলা হয়, “ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক পরিত্যক্ত ভবনের ছাদে, গোপনে মজুত করে রাখা হয়েছিল প্রায় ২০০০ LPG সিলিন্ডার! তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে হানা দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, আর উন্মোচিত হয় কৃত্রিম সংকটের ভয়ংকর চিত্র।” 

ফেসবুকের একাধিক (, , , , ) ব্যক্তিগত প্রোফাইল, পেজ, গ্রুপ থেকেও একই দাবিতে ছবিটি পোস্ট করা হয়।

সত্যতা যাচাইয়ে ডিসমিসল্যাব যমুনা গ্যাসের ওয়েবসাইটে থাকা সিলিন্ডারের গ্যাসের ছবি পর্যবেক্ষণ করে দেখে। দেখা যায়, যমুনা এলপিজি সিলিন্ডারগুলো “যমুনা গ্যাস” লেখা থাকে, তার নিচে “অফ রেগুলেটর আফটার ইউজ” কথাটিও দেখা যায়। নিচে সিলিন্ডারে গ্যাসের পরিমাণ নির্দেশ করার জন্য কত কেজি (৫.৫ কেজি, ১২ কেজি, ৩৫ কেজি বা ৪৫ কেজি) তা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া সিলিন্ডারের হ্যান্ডেলেও “যমুনা” লেখা থাকে। এছাড়া সেনাবাহিনীর পোশাকেও বাম হাতে একটি লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙের ব্যাজ দেখা যায়। এরকম ব্যাজ সেনাবাহিনীর কোনো পোশাকেই দেখা যায় না। ব্যাজগুলোর ক্ষেত্রে অসঙ্গতিও লক্ষ্য করা যায়। একজন সেনাসদস্যের হাতে দুটি ব্যাজ দেখা যায়। আবার একটা ব্যাজের সাথে আরেকটা ব্যাজের অমিলও লক্ষ্য করা যায়। 

সেনাবাহিনী দ্বারা প্রায় ২০০০ এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে বানানো
যমুনা গ্যাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে থাকা সিলিন্ডারের গ্যাসের ছবি।

প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে সেনাবাহিনী ২০০০টি এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধার করেছে এ ধরনের কোনো সংবাদ গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত, গত ৮ জানুয়ারি মাদারীপুরের শিবচর থেকে লুটকৃত গাড়িসহ এলপিজি গ্যাসের ৪৬২ পিস খালি গ্যাস সিলিন্ডার গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকার আশুলিয়া থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

এছাড়া বৈশাখী টিভি ১৩ জানুয়ারি তাদের ইউটিউব চ্যানেলে একটি শর্টস পোস্ট করে। সে ভিডিওতে দেখা যায় একটি বাড়ির ছাদে বেশ কিছু গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হয়েছে। ভিডিওর ভেতরে লেখা “পুরান ঢাকা।” তবে এ নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। 

তাছাড়া এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে, ছবিটির এআই দিয়ে তৈরির ৯২.৩ শতাংশ পর্যন্ত সম্ভাবনা আছে। এ থেকে বোঝা যায় ছড়ানো ভিডিওটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরির সম্ভাবনা অনেক বেশি। 

সেনাবাহিনী দ্বারা প্রায় ২০০০ এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে বানানো
হাইভ মডারেশন টুল বলছে ছবি দুটির এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর দুই হাজার এলপিজি সিলিন্ডার উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর আগেও পুলিশ সদস্যকে জড়িয়ে এআই কন্টেন্ট নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব। 

আরো কিছু লেখা