তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
জিয়া পরিবারের সদস্যদের আদলে এআই চরিত্র দেখাচ্ছে টাকার প্রলোভন

জিয়া পরিবারের সদস্যদের আদলে এআই চরিত্র দেখাচ্ছে টাকার প্রলোভন

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্টেজে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, “প্রিয় দেশবাসী, আমি আপনাদেরকে ১২ তারিখ নির্বাচন উপলক্ষ্যে সবাইকে ২০ হাজার করে টাকা দিব।” শুনে জনতার মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। এমনই একটি দৃশ্য দেখা যায় তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের নামযুক্ত একটি ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট হওয়া ভিডিওতে।

ভিডিওর শেষে টাকা পেতে পেজটি শেয়ার ও ফলো করতে এবং কমেন্টে বিকাশ নাম্বার দিতে বলেন তারেক রহমান। অনেক ব্যবহারকারীকে দেখা গেছে মন্তব্যে নিজেদের বিকাশ নাম্বার লিখছেন। দেখে মনে হবে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের কোনো ঘটনা। কিন্তু ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি এবং পেজটিও জাইমা রহমানের নয়।

এরকমই অসংখ্য ভিডিও ছড়াতে দেখা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। যেখানে জিয়া পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের এআই ভিডিওর মাধ্যমে বলা হচ্ছে কমেন্টে নিজেদের নাম্বার দিতে এবং অসংখ্য ব্যবহারকারী নিজেদের বিকাশ, নগদ বা রকেট নাম্বার জানিয়ে দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো শুধু আর্থিক প্রতারণার ঘটনা হলেও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাজনৈতিক দল, প্রশ্ন উঠতে পারে নির্বাচন নিয়েও। এগুলোর বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে এবং আর্থিক প্রতারণা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তৎপর হতে পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ।

টাকা দেওয়ার নানা উপলক্ষ

গত মাসে ‘জাইমা রহমান অফিসিয়াল’ নামের এক ফেসবুক পেজ থেকে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বিএনপিতে ভোট চাইতে দেখা যায়। এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাবসহ বাংলাদেশভিত্তিক একাধিক যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান (, )।

পরবর্তীতে জাইমা রহমানের নামে আরেকটি পেজ থেকে নিজের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সবাইকে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলে দর্শকদের কমেন্টে বিকাশ নম্বর চাইতে দেখা যায় জাইমা রহমানকে। ডিসমিসল্যাব ফ্যাক্টচেকে দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জাইমা রহমানের পুরোনো ছবি ব্যবহার করে ভিডিওটি বানানো হয়েছে। তবে বর্তমানে এই পেজ দুইটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। 

জিয়া পরিবারের সদস্যদের আদলে এআই চরিত্র দেখাচ্ছে টাকার প্রলোভন
টাকা দেওয়ার দাবি করে এআই ভিডিও প্রচার করা ১২টি ফেসবুক পেজের স্ক্রিনশট।

জাইমা রহমান নামের ফেসবুক পেজের আরেক ভিডিওতে দেখা যায় তারেক রহমান, ডা জুবাইদা রহমানসহ জাইমা রহমান দুই হাত ভর্তি টাকার বান্ডিলসহ দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিও-র ওপর লেখা, “ফলো করলে ৬০ হাজার টাকা”। ভিডিওতে জুবাইদা রহমানকে বলতে শোনা যায়, “আসসালামু আলাইকুম। আমার স্বামীকে যারা ভালোবাসো, এই পেজটা ফলো করো এবং ভিডিওটা শেয়ার কর। এবং ভিডিওটাকে কোন জেলা থেকে দেখেছ, তা কমেন্টে জানাও।” হাজারখানেক ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্টের মন্তব্যে তাদের জেলা ও উপজেলার নামসহ নাম্বার লিখে দিয়েছেন। 

জিয়া পরিবারের সদস্যদের আদলে এআই চরিত্র দেখাচ্ছে টাকার প্রলোভন
জিয়া পরিবারের বিভিন্ন সদস্যাদের নিয়ে বানানো এআই ভিডিও।

জনাব তারেক রহমান ৯.৯ নামের একটি পেজের ভিডিওতে লাল-সবুজ শাড়ি পরা জাইমা রহমানকে বলতে শোনা যায়, শবে বরাত উপলক্ষ্যে পেজটি ফলো করলে ৫০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। আরেকটি পেজে জাইমা রহমানের সঙ্গে আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওতে টাকা হাতে জাইমা রহমানকে বলতে শোনা যায়, “আমি জাইমা রহমান। আমার রমজান উপলক্ষ্যে সবাইকে ২০ হাজার টাকা দিচ্ছি।” পাশে শহীদুল আলম টাকা গ্রহণ করে বলেন, “টাকা পেতে হলে পেজটা ফলো করে ভিডিওটা ১০টা গ্রুপে শেয়ার করে বিকাশ-নগদ নম্বর দেন।”

অন্য এক ভিডিওতে হাতে টাকা নিয়ে জাইমা রহমানের সঙ্গে আরাফাত রহমান কোকোর মেয়ে জাফিয়া রহমানকে বলতে শোনা যায়, “ফলো আর শেয়ার না থাকার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিতে পারছি না। দ্রুত ফলো আর শেয়ার করে দিন।” মন্তব্যে নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলে নাম, নাম্বার দিয়েছেন হাজারখানেক ফেসবুক ব্যবহারকারী।

আরেকটি পেজের একটি ভিডিওতে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানকে বলতে শোনা যায়, “আমার মেয়ে জাইমা রহমানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আজ রাত ১২টার পরে সবাইকে ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। টাকা পেতে চাইলে ফলো এবং ১০টা গ্রুপে শেয়ার রাখতে হবে। এরপর আপনার বিকাশ নম্বর কমেন্ট করুন।”

  • এআই চরিত্র বলছে তারা জাইমা ও তারেক রহমান, প্রলোভন দেখিয়ে চাইছে মানুষের নাম্বার
  • এআই চরিত্র বলছে তারা জাইমা ও তারেক রহমান, প্রলোভন দেখিয়ে চাইছে মানুষের নাম্বার
  • এআই চরিত্র বলছে তারা জাইমা ও তারেক রহমান, প্রলোভন দেখিয়ে চাইছে মানুষের নাম্বার

এ ধরনের পোস্টে নিজের নাম্বার দিয়েছে এমন দুইজন ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ডিসমিসল্যাবকে জানান, তাদের কেউই এখনো কোনো কল বা টাকা পাননি।

বিভিন্ন পেজ থেকে শেয়ার হয় একই ভিডিও

এআই ব্যবহার করে তৈরি এসব মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের নাম্বার চাওয়ার ভিডিও ও ছবি পোস্ট করা অন্তত ১৩টি (, , , , , , , , , ১০, ১১, ১২, ১৩) পেজ খুঁজে পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। একাধিক পেজে একই ভিডিও শেয়ার করতে দেখা যায়।

জায়মা রহমানের এআই ভিডিও
একাধিক পেজে একই ভিডিও শেয়ার।

এদের মধ্যে কিছু পেজে অনুসারী সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাতে পেজ-এর নামের সঙ্গে , , বা মিলিয়ন যোগ করা হয়েছে। যেমন সাড়ে ৫ হাজার অনুসারীর পেজের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জাইমা রহমান ১ মিলিয়ন’। আরেকটি পেজে অনুসারী সংখ্যা এক হাজারের কিছু বেশি হলেও পেজের বর্ণনায় ১.২ মিলিয়ন এমনভাবে লেখা হয়েছে, যা আসল অনুসারীর ব্যাপারে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

জাইমা রহমান বিএনপি’ নামের পেজের প্রোফাইল ছবির ভেতরে জাইমা রহমানের পাশে ফেসবুক ভেরিফিকেশনের ব্লু টিক দিয়ে একে ভেরিফায়েড পেজ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এই পেজগুলো ৬ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি— এই এক মাসের ভেতরে খোলা হয়েছে। সর্বশেষ ৭ ফেব্রুয়ারি ‘জাইমা রহমান টাকা দেয়’ নামের এক পেজ খোলা হয়। 

জায়মা রহমানের নামে ভুয়া ফেসবুক পেজ
পেজের নামের সঙ্গে সংখ্যা (বামে) এবং প্রোফাইল ছবির ভেতরে ফেসবুক ভেরিফিকেশনের ব্লু টিক যোগ (ডানে)।

তারেক রহমান, জাইমা রহমান ও জাফিয়া রহমানের নামে ছয়টি ফেসবুক গ্রুপ (, , , , , ) পাওয়া যায়, যেখানে এসব পেজ থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার এআই ভিডিওগুলো শেয়ার করা হয়। দেখা যায়, গ্রুপে এসব পেজই বিভিন্ন গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণ স্বরূপ, ‘জাইমা রহমান অফিসিয়াল গ্রুপ বিএনপি’ গ্রুপটির অ্যাডমিনদের মধ্যে রয়েছেন ‘জাইমা রহমান ১ মিলিয়ন, ‘জাইমা রহমান ২ মিলিয়ন, জনাব তারেক রহমান ৯.৯জাইমা রহমান টাকা দেয়। 

জাইমা ও তারেক রহমানের আদলে বানানো এআই চরিত্র দেখাচ্ছে টাকার প্রলোভন
ছয়টি ফেসবুক গ্রুপের স্ক্রিনশট।

অন্যদিকে জাইমা রহমানজাইমা রহমান ফ্যানস গ্রুপ উভয়ের অ্যাডমিন তালিকায় ৩টি পেজ পাওয়া যায়—ইয়ামিন ভাই, ‘জাইমা রহমান ১ মিলিয়ন, ‘জাইমা রহমান ৫ মিলিয়ন’। এদের মধ্যে ইয়ামিন ভাই পেজের প্রোফাইল ছবিতেও জাইমা রহমানের একটি এআই ছবি দেওয়া আছে। এই পেজেও জাইমা রহমানসহ জিয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একই ধরনের ভিডিও দেখা যায়। তবে ২৯ জানুয়ারি ও এর আগে ভিন্ন ব্যক্তির বাস্তব ভিডিও পাওয়া যায়। দেখা যায়, সেই ভিডিওগুলো ‘মোজাহের ভাই’ নামের একজন ভ্লগারের ভিডিও থেকে নেওয়া। তখনো সেই ভ্লগারের ভিডিও শেয়ার করে এই পেজ থেকে টাকা দেওয়ার দাবি করা হতো। 

রাজনৈতিক প্রচারণা নাকি আর্থিক প্রতারণা

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তার পরিবারের সদস্যের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে টাকা দেওয়ার কথা বলা কি কোনো আর্থিক প্রতারণার অংশ, নাকি এর রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে? ডিজিটাল অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টের একই রকমের ভিডিও নিয়ে করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুবাইদা রহমান আর্থিক সহায়তা দেবে- এমন একটি এআই ভিডিওতে নাম্বার দিয়েছেন, এমন ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম্বারদাতা কয়েকজন জানায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

তারা দ্য ডিসেন্টকে জানায় তাদের মোবাইলে একাধিকবার কল গিয়েছে এবং অনুদান পাওয়ার শর্ত হিসেবে আগে টাকা পাঠাতে হবে। কেউ কেউ টাকা পাঠিয়ে প্রতারিত হওয়ার কথাও বলেন।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সের ডিন এবং মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের হেড সুমন রহমান মনে করেন, এটা যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি আর্থিক উদ্দেশ্যে। তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “এইসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী, যেমন এখানে বিএনপিকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাদের উচিত হবে এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া। শুধুমাত্র ফ্যাক্টচেক করে এ ধরনের ঘটনা থামানো যাবে না।” 

ডেমোক্রেসি-ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক ওয়াজেদ ফিরোজ ডিসমিসল্যাবকে বলেন, সাধারণ মানুষ এগুলোকে সহজে বিশ্বাস করে ফেলে। ফলে প্রতারিত হয়। ওয়াজেদ ফিরোজ আরও বলেন, “যাদের ছবি বা নাম ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের এগুলো নিয়ে কথা বলা উচিত। তাদের একটা টিম কাজ করা উচিত যারা এগুলোকে চিহ্নিত করবে এবং এগুলো যেন না থাকে সেই ব্যবস্থা নিবে।”

আরো কিছু লেখা