নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ

ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

একটি ফেসবুক পোস্ট। একটি দৈনিক পত্রিকার আদলে বানানো লোগো আর ফটোকার্ড। তাতে জনপরিচিত এক নারীর ছবি। ছবির নিচে লেখা, “বাংলাাদেশের ১১ জন মিলে যে রান করেছে তারচেয়ে আমার *** সংখ্যা বেশি।” অন্য কোনো পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হচ্ছে, “হাফপ্যান্ট পড়ে রাতে শ্রীলংকার রাস্তা আবাসিক হোটেলের সামনে অপেক্ষা করছে শবনম ফারিয়া।” কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসব পোস্টে হাজার হাজার হাহা প্রতিক্রিয়া, শেয়ার হচ্ছে শত শতবার। মন্তব্য পড়তে গেলে দেখা যাচ্ছে নানা জল্পনা-কল্পনা, উপহাস এবং চরিত্রহননমূলক বক্তব্যের ছড়াছড়ি। সংবাদমাধ্যমের আদলে বানানো লোগোর কারণে সাধারণভাবে এসব পোস্ট চোখে পড়লে তা অনেক ব্যবহারকারীর কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো তা নয়।

জনপরিচিত অনেক নারীর জন্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ার এখন আর শুধু নিরীহ বিনোদন নেই। বরং এটি এখন যৌন হয়রানির ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে।

ফেসবুকজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনামের মতো দেখতে ফটোকার্ড ব্যাপকভাবে ছড়াতে দেখা যায়। পরিচিত লোগো, আনুষ্ঠানিক লেআউট ও বিশ্বাসযোগ্য বার্তার সঙ্গে নারী রাজনৈতিক, অভিনয়শিল্পী, শিক্ষাবিদ ও অধিকারকর্মীদের ছবি ব্যবহার করা হয় এসব ফটোকার্ডে। সঙ্গে থাকা বার্তায় প্রায়ই নৈতিক অবক্ষয় বা যৌন অসদাচরণের ইঙ্গিত দিয়ে নারীদের উপহাসের পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করে।

এসব পোস্টের উৎপত্তি এমন কিছু স্বঘোষিত ফেসবুক “স্যাটায়ার” (ব্যঙ্গাত্মক) পেজ থেকে, যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নাম, লোগো এবং উপস্থাপনার ধরন অনুকরণ করে। যদিও এই পেজগুলো তাদের কনটেন্টকে বিনোদন বা প্যারোডি হিসেবে দাবি করে, কিন্তু তাদের প্রকাশিত কনটেন্টের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারীদের শরীর, যৌনতা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই, যা স্যাটায়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তা আসলে নিছক হয়রানি, চরিত্রহনন এবং অনলাইন হয়রানি।

এ ধরনের পাঁচটি পেজ থেকে প্রকাশিত পোস্টের ওপর ডিসমিসল্যাবের প্রায় পাঁচ মাসব্যাপী কনটেন্ট বিশ্লেষণে একটি ধারাবাহিক ধরন উন্মোচিত হয়েছে: নারীদের নিয়ে করা প্রতি চারটি পোস্টে একাধিক যৌন আক্রমণাত্মক বা হয়রানিমূলক ভাষা ছিল। একই দিনে একাধিক পেজে হুবহু একই ফটোকার্ড প্রকাশ হতেও দেখা গেছে, যা এর প্রচার ও প্রভাবকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এসব কনটেন্টের বেশিরভাগই ফেসবুকের নিজস্ব হয়রানি-বিরোধী নীতিমালার পরিপন্থী হলেও, এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। পেজগুলো নিয়মিতভাবেই তাদের পোস্টগুলোকে স্যাটায়ার বা প্যারোডি হিসেবে চিহ্নিত করে মডারেশন (নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) এড়িয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যখন কোনো কৌতুক ক্ষতির কারণ হয়, মানুষের বাকরোধ করে বা দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, তখন তা আর স্যাটায়ার থাকে না। বাংলাদেশের মতো দেশে সীমিত মিডিয়া লিটারেসি এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। অনেক ব্যবহারকারীই ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার মধ্যে পার্থক্য করতে হিমশিম খান, যার ফলে বিভ্রান্তিকর বা মানহানিকর পোস্টগুলো সত্য হিসেবে বিশ্বাস করার এবং ঘটনা হিসেবে আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

এই অনুসন্ধানের সময়কালে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরিন আমিন ভূঁইয়া মোনামি। তথাকথিত স্যাটায়ার পেজগুলোর দ্বারা ছড়ানো কনটেন্টকে তারা নিছক কৌতুক বা তাদের পেশাগত কাজের সমালোচনা নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহনন হিসেবে দেখছেন।

ফারিয়া বলেন, এসব পোস্টের উদ্দেশ্য ছিল তাকে জনসমক্ষে অপদস্থ ও হেয় করা। যদিও তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভেবেছেন, তবে ব্যবহারকারীদের মন্তব্যে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী “মিডিয়া ট্রায়াল”-এর ভয়ে তিনি পিছিয়ে এসেছেন। মোনামিও একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের কনটেন্ট নারীর মর্যাদার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। তিনি বলেন, “কনটেন্ট তৈরি করা যদি বাকস্বাধীনতা হয়, তবে আমাদেরও একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে, যা এই কনটেন্টগুলো ধ্বংস করছে।”

বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট নির্মাতারা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত অসংখ্য “স্যাটায়ার” বা ব্যঙ্গাত্মক পেজ ফেসবুকে গজিয়ে উঠেছে, যেগুলো মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নাম, লোগো এবং দৃশ্যমান পরিচয় অনুকরণ করে। এই প্রতিবেদনের জন্য ডিসমিসল্যাব এমন পাঁচটি পেজ নির্বাচন করেছে যারা: ১) নিজেদের বায়োতে স্পষ্টভাবে স্যাটায়ার বা বিনোদন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাবি করেছে এবং ২) যাদের অনুসারী সংখ্যা ৩০,০০০-এর বেশি। বিশ্লেষিত পেজগুলো হলো প্রথম আলু, বালের কণ্ঠ, গজবভিশন, জামেলা টিভি এবং মাই বাংলা টিভি।

পেজগুলোর স্বচ্ছতা-সম্পর্কিত তথ্যের বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়। বালের কণ্ঠ এবং প্রথম আলুর বায়ো হুবহু এক, এবং পেজ দুটি প্রায়ই একই ধরনের, কখনো কখনো হুবহু একই কনটেন্ট প্রকাশ করে। উভয়েই নিজেদের “শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ব্যঙ্গাত্মক সংবাদপত্র” হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং একটি সতর্কবার্তা যুক্ত করেছে, তাদের খবরের সত্যতা মাত্র “০.০১%”। একইভাবে, জামেলা টিভি এবং মাই বাংলা টিভি প্রায় অভিন্ন বায়ো ব্যবহার করে ঘোষণা দিয়েছে, “শুধুমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি, কোনো পোস্ট সিরিয়াসলি নেবেন না।”

মাই বাংলা টিভি পেজটি সময়ের সঙ্গে বারবার নাম পরিবর্তনের কারণে আলাদাভাবে নজরে আসে, যার আগের নামগুলোর মধ্যে “যৌন পরামর্শ” থেকে শুরু করে “ইসলামিক শর্টস” পর্যন্ত ছিল। অন্যদিকে, গজবভিশন “দৃষ্টি জুড়ে গজব” স্লোগান ব্যবহার করে, যা মূলধারার সম্প্রচার মাধ্যমের ব্র্যান্ডিংয়ের একটি অনুকরণ এবং এটি পেজটির প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমকে নকল করার বিষয়টিকে আরও সুদৃঢ় করে।

বিশ্লেষিত পাঁচটি পেজের মধ্যে, বালের কণ্ঠের পোস্টে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্টের অনুপাত সর্বোচ্চ ছিল। নারীদের নিয়ে করা এর অর্ধেক পোস্টই বিদ্বেষপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা পর্যালোচিত পেজগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষপূর্ণ পোস্টের হার জামেলা টিভি এবং মাই বাংলা টিভি উভয়ের ক্ষেত্রেই ৩৩ শতাংশ ছিল, যা প্রমাণ করে যে এই প্রবণতা কেবল একটি প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একাধিক পেজজুড়ে বিস্তৃত।

লক্ষ্যবস্তু এবং হয়রানির ধরন

এই হয়রানির প্রকৃতি বুঝতে, ডিসমিসল্যাব সাড়ে চার মাস ধরে পাঁচটি পেজ থেকে প্রকাশিত ৪,২৪৩টি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ (৯৯১টি পোস্ট) ছিল নারীদের নিয়ে। সেগুলোর মধ্যে ২৮ শতাংশকে (ফটোকার্ড আকারের ২৭৭টি পোস্ট) যৌন আক্রমণাত্মক বা হয়রানিমূলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা এই বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি। এই পোস্টগুলো চারটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন অনুসরণ করেছে:

(১) লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে গালি ও অপমান;

(২) সাধারণ গালি এবং অবমাননাকর ভাষা;

(৩) মতাদর্শিক কারণে অবমাননা ও হেয় করা; এবং

(৪) শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা পোশাক নিয়ে অপমান।

পাঁচটি পেজই বিভিন্ন মাত্রায় আক্রমণের এসব পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা বিচ্ছিন্ন কোনো ভুল না হয়ে লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ২৭৭টি হয়রানিমূলক ফটোকার্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮৩টিতে (৬৬ শতাংশ) লিঙ্গ বা যৌনতা-ভিত্তিক গালি ছিল। সাধারণ অপমান ছিল ২৫ শতাংশ কনটেন্টে, আর বাকি ৯ শতাংশে ছিল আদর্শিক অবমাননা বা নারীদের শরীর ও পোশাক নিয়ে উপহাস।

সার্বিকভাবে, এই শ্রেণিবিভাগগুলোর বিস্তার এবং পুনরাবৃত্তি ইঙ্গিত দেয়, এই হয়রানি ছিল সুসংগঠিত এবং নিয়মতান্ত্রিক। স্যাটায়ারের ছদ্মবেশে নারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করার জন্য এটি মূলত যৌনতানির্ভরতা, নৈতিক বিচার এবং ব্যক্তিগত অবমাননার ওপর নির্ভর করেছে।

বিনোদন জগৎ ছিল সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া খাত। বিশ্লেষিত ২৭৭টি অপমানজনক ফটোকার্ডের মধ্যে ১৬১টিই ছিল অভিনেত্রী, মডেল বা অন্যান্য মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে। অভিনেত্রী পরীমনি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন; তিনি ৬২টি ফটোকার্ডে উপস্থিত ছিলেন, যা এই ডেটাসেটে একক ব্যক্তি হিসেবে সর্বোচ্চ।

রাজনীতি এবং জননীতিতে সক্রিয় নারীরাও বারবার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মোট ১০৩টি পোস্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কয়েকজন সদস্য। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. তাসনিম জারা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। তাকে নিয়ে ১৭টি ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছিল।

বাকি ১৩টি পোস্ট লক্ষ্যবস্তু করেছে অন্যান্য জনপরিসরের নারীদের, যার মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক রুবাবা দৌলা এবং লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এটি নির্দেশ করে যে হয়রানির বিস্তৃতি বিনোদন এবং রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আরও দূরে ছড়িয়েছে।

লিঙ্গভিত্তিক গালি

বিশ্লেষণে চিহ্নিত হয়রানির সবচেয়ে প্রচলিত ধরনটির মূলে ছিল লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে গালি ও অপমান। এসব পোস্টের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল চরিত্রহনন, নারীদের নৈতিকভাবে স্খলিত বা যৌন দিক থেকে বহুগামী হিসেবে তুলে ধরা। পর্যালোচিত পেজগুলো জুড়ে, নারীদের বারবার যৌন উত্তেজক বা অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে বর্ণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে তাদের যৌনকর্মী (খান**) হিসেবে সমতুল্য করা বা যৌনভাবে সহজলভ্য (বারো**) বোঝানোর মতো ইঙ্গিত অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গজবভিশন পেজটি ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক শেহরিন আমিন ভূঁইয়া মোনামির ছবি সম্বলিত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে। ফটোকার্ডের ভেতরের লেখায় তার নামে মিথ্যা একটি বিবৃতি জুড়ে দেওয়া হয়, যেখানে লেখা ছিল, “আমি পার্ট-টাইম শিক্ষক, আর ফুল-টাইম শিবিরের সেবাদাসী।” সঙ্গে থাকা ক্যাপশনে দাবি করা হয় যে মন্তব্যটি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে করা হয়েছিল, যদিও তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। একইভাবে, ৪ অক্টোবর মাই বাংলা টিভি একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে যেখানে অভিনেত্রী অপু বিশ্বাসকে নিয়ে দাবি করা হয়, “নিষিদ্ধ হোটেলে আওয়ামীলীগ নেতাদের নিয়মিত সুখ দিতেন – অপু বিশ্বাস।” পোস্টটিতে কোনো প্রেক্ষাপট, সূত্র বা তথ্যগত ভিত্তি দেওয়া হয়নি, বরং ব্যক্তিটিকে হেয় করার জন্য কেবল যৌন ইঙ্গিতের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

লিঙ্গভিত্তিক গালি: ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ
মাই বাংলা টিভি (বামে) এবং গজবভিশনের (ডানে) ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকেও সুস্পষ্ট লিঙ্গভিত্তিক গালি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। জামেলা টিভির একটি পোস্টে দাবি করা হয় যে “রাবি নারী শিক্ষার্থীদের বোরখা পরা দেখে খা*কি পাড়ায় জ্বলছে আগুন।” যা নাসরিনের আদর্শিক অবস্থানকে ফ্রেমবন্দী করতে এবং উপহাস উস্কে দিতে যৌন অবমাননাকর ভাষার ব্যবহার।

অপমানজনক বিবৃতি

সুস্পষ্ট যৌনতাপূর্ণ গালির বাইরেও, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পোস্টে নারীদের আক্রমণ করার জন্য সাধারণ অপমান এবং অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ছিল প্রাণীর সঙ্গে তুলনা, অবমাননাকর তকমা ব্যবহার করা এবং পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত চরিত্রকে হেয় করার উদ্দেশ্যে নেতিবাচক বা অপমানজনক বিশেষণ প্রয়োগ করা।

যেমন, মাই বাংলা টিভি অভিনেত্রী পরীমনিকে নিয়ে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে। ক্যাপশন এবং ছবির ভেতরের লেখা উভয়েই ইঙ্গিত দেয় যে তিনি পেশাগত কাজের মাধ্যমে নয়, বরং যৌনকর্মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন, “নিজের সৌন্দর্য দিয়ে আমি কখনো অর্থ কামাইনি, যা কামিয়েছি তা আমার ছিদ্র দিয়ে – ছিদ্র নায়িকা পরী মনি।”

একইভাবে, বালের কণ্ঠ পেজটি ড. তাসনিম জারাকে লক্ষ্য করে একটি এডিটেড (সম্পাদিত) ফটোকার্ড প্রকাশ করে। ওই পোস্টে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীকে একটি গরুর সঙ্গে তুলনা করা হয়: “এক গাভীর দায়িত্ব নিতে দুই বলদের মারামারির সাক্ষ্য হতে যাচ্ছে ঢাকা ১৭ আসন।” বস্তুত, এই চিত্র এবং ভাষা প্রার্থীকে তার নিজস্ব অধিকারসম্পন্ন একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করার বদলে তাকে আধিপত্য বিস্তারের বস্তুতে পরিণত করেছে।

লিঙ্গভিত্তিক গালি: ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ
বালের কণ্ঠ (বামে) এবং মাই বাংলা টিভির (ডানে) ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

পোশাক নিয়ে অপমান

হয়রানির আরেকটি ধরন ছিল শারীরিক উপস্থিতি, শরীরের গড়ন বা পোশাকের ওপর ভিত্তি করে নারীদের হেয় করা। পাঁচটি পেজ জুড়েই, এ ধরনের পোস্টগুলো সাধারণ পোশাক বাছাইকে নৈতিক চরিত্রের সূচক হিসেবে তুলে ধরেছে, যা নারীবিদ্বেষী গতানুগতিক ধারণাকেই সুদৃঢ় করে।

অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে ৭ অক্টোবর একটি ছবি শেয়ার করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক স্যাটায়ার পেজ (, , , , ) ছবিটিকে ফটোকার্ডে রূপান্তরিত করে, তার সঙ্গে যৌন উত্তেজক ক্যাপশন এবং বানোয়াট প্রেক্ষাপট যুক্ত করে। প্রথম আলু, একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে, “হাফপ্যান্ট পড়ে রাতে শ্রীলংকার রাস্তা আবাসিক হোটেলের সামনে অপেক্ষা করছে শবনম ফারিয়া।” অন্য একটি পেজ, জামেলা টিভি, একই ছবি ব্যবহার করে এমন একটি ক্যাপশন দেয়, যেখানে ইঙ্গিত করা হয় যে একজন বেকার ছেলেকে বিয়ে করার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে তিনি এমন পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

অন্যান্য অভিনেত্রীদের লক্ষ্য করে করা পোস্টগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। জামেলা টিভি অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিনকে উপহাস করে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে, যেখানে তার পোশাক নিয়ে মন্তব্য করতে অন্তর্বাস জড়িত একটি অশোভন উপমা ব্যবহার করা হয়। একই পেজের আরেকটি পোস্টে, অভিনেত্রী রুনা খানকে এমন চিত্র ও ভাষা দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যা তার রূপকে শিশুদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কোনো অতিপ্রাকৃত অবয়বের সঙ্গে তুলনা করে।

লিঙ্গভিত্তিক গালি: ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ
জামেলা টিভি (বামে) এবং প্রথম আলুর (ডানে) ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য আক্রমণ

আরেকটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরনে ছিল নারীদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ঘিরে তৈরি করা আক্রমণ, যেগুলোকে পরবর্তীতে রূপকের মাধ্যমে যৌনরূপ দেওয়া হয়। এই প্রবণতাটি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে করা পোস্টগুলোতে বিশেষভাবে দৃশ্যমান ছিল। ভারতে তার অবস্থানের কথা উল্লেখ করে একটি পোস্টে বলা হয়: “শেখ হাসিনার গুপ্তস্থান থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার। সূত্র বলছে ওজন বেশি হওয়া শেখ হাসিনা তার সোনা রেখে ভারত পালিয়েছে।” একই ধরনের পোস্টগুলোতে (, ,) বারবার তার অবস্থান এবং রাজনৈতিক মর্যাদার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য নারী রাজনৈতিকদেরও সমতুল্য আচরণের শিকার হতে হয়েছে। মাই বাংলা টিভি সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে জড়িয়ে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে, যেখানে মিথ্যা দাবি করা হয় যে নির্বাচনের আগে বিয়ে না করলে তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। কার্ডটিতে লেখা ছিল: “নির্বাচনের পূর্বে রুমিন ফারহানা হাঙ্গা না করলে নমিনেশন দেওয়া হবে না – তারেক রহমান।” অন্য একটি ঘটনায়, গজবভিশন ছাত্রদল নেত্রী মনসুরা আলমকে লক্ষ্য করে স্পষ্ট যৌন রূপক ব্যবহার করে লেখে: “লিডারের সালাম নিন ধনের শীষে ভোট দিনঃ ছাত্রদল নেত্রী।”

লিঙ্গভিত্তিক গালি: ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ
গজবভিশন (বামে) এবং প্রথম আলুর (ডানে) ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

সম্মিলিত প্রসারণ

বিশ্লেষণে এমন একটি ধরনও প্রকাশ পেয়েছে যেখানে একাধিক স্যাটায়ার পেজ স্বল্প সময়ের মধ্যে একই বিষয়ে অভিন্ন যৌন উত্তেজনামূলক ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর, শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংক লকারগুলোতে ৮৩২ ভরি সোনার গহনা পাওয়া যাওয়ার প্রতিবেদনের পর, একাধিক স্যাটায়ার পেজ প্রায় অভিন্ন ফটোকার্ড (, , ) একসঙ্গে পোস্ট করে। ফটোকার্ডের ভেতরের লেখায় ছিল, “শেখ হাসিনার গুপ্তস্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনা।” একই পেজগুলো দুই দিন পর একই ধরনের পোস্ট (, , ) পুনরায় প্রকাশ করে, যা প্রসারণের মাধ্যমে একই ন্যারেটিভকে সুদৃঢ় করে।

এই সম্মিলিত আচরণ কেবল রাজনৈতিক ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নভেম্বর-ডিসেম্বরে “জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের সক্রিয়তা” ক্যাম্পেইন চলাকালে, সচেতনতা উদ্যোগের অংশ হিসেবে কয়েকজন নারী সেলিব্রিটি তাদের হাতে বা মুখে নম্বর লিখে ছবি পোস্ট করেন। এর কিছু সময় পর, একাধিক স্যাটায়ার পেজ (, , , , ) ওই লেখাগুলোকে ডিজিটালি পরিবর্তন করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্যাংশ বসিয়ে ছবিগুলো পুনরায় প্রকাশ করে, যা মূলত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি ক্যাম্পেইনকে অপমানের বস্তুতে পরিণত করে।

নির্বাচনী খবরাখবরকে ঘিরেও একই রকম প্রবণতা দেখা গেছে। ৩০ অক্টোবর, নির্বাচন কমিশন একটি নতুন দলীয় প্রতীক (শাপলার কলি) ঘোষণার পর, একাধিক স্যাটায়ার পেজ ওই প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ফটোকার্ড (, ) প্রকাশ করে। বালের কণ্ঠের এমন একটি পোস্টে লেখা ছিল, “বিশেষ অঙ্গে প্রবেশ করিয়ে ঘুরিয়ে দিলেই কলি হচ্ছে ফুল নতুন আবিষ্কারে সন্তুষ্ট সামান্তা” (একজন এনসিপি নেতা)। ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মেঘনা আলমও আক্রমণের শিকার হন। একাধিক স্যাটায়ার পেজ একই সঙ্গে তার প্রচারণাকে উপহাস করে ফটোকার্ড (, , ) প্রকাশ করে, যেখানে হুবহু একই শব্দ ব্যবহার করা হয়, যা রাজনৈতিক উপহাসের সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক গালির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।

লিঙ্গভিত্তিক গালি: ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ
মেঘনা আলমকে লক্ষ্য করে শেয়ার করা ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

প্ল্যাটফর্মের নীতিমালার লঙ্ঘন

এই প্রতিবেদনের জন্য বিশ্লেষিত অধিকাংশ পোস্টই মেটার হেট স্পিচ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের নীতিমালার লঙ্ঘন। তবে, এর প্রয়োগ এখনও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যার বড় কারণ হলো পেজগুলো তাদের প্রোফাইলে নিজেদের কনটেন্টকে স্যাটায়ার বা প্যারোডি হিসেবে বর্ণনা করে। নিজেদের এই তকমা দেওয়ার কারণে যৌন অবমাননাকর ভাষা এবং লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণ থাকা সত্ত্বেও অনেক পোস্ট মডারেশনের হাত থেকে বেঁচে যায়।

২০২৫ সালের আগে, মেটার ‘হেইটফুল কন্ডাক্ট’ (বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ) নীতিমালা স্যাটায়ার এবং প্যারোডি পেজগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। সেই নিয়ম অনুযায়ী, লিঙ্গ বা যৌন পরিচয়ের মতো সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিদের বস্তু, সম্পত্তি বা অমানবিক সত্তার সঙ্গে তুলনা করা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ছিল। নারীদের গৃহস্থালি সামগ্রী বা কারও সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা এমনকি স্যাটায়ারমূলক প্রেক্ষাপটেও সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতো। সুরক্ষিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে গালি বা অবমাননাকর ভাষার ব্যবহারও নিষিদ্ধ ছিল, কৌতুকের দাবি করা হলেও।

তবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে, এর ওভারসাইট বোর্ডের ধারাবাহিক কয়েকটি রায়ের পর মেটার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। ওই রায়গুলোতে দেখা যায় যে, প্ল্যাটফর্মটির স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক আলোচনা এবং নিরীহ স্যাটায়ারকে ভুলভাবে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, মেটা একটি নীতি পর্যালোচনা শুরু করে, যার ফলে “মোর স্পিচ, ফিউয়ার মিসটেকস” শিরোনামের একটি উদ্যোগের অধীনে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি একটি পরিবর্তন ঘোষণা করা হয়।

সংশোধিত অ্যান্টি-হেট স্পিচ নীতির অধীনে, মেটা এখন এমন কিছু কনটেন্টকে অনুমতি দেয় যা অন্যথায় তাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন করত। হালনাগাদ নির্দেশিকা অনুযায়ী, যখন নীতিমালা-লঙ্ঘনকারী উপাদানগুলো বিদ্রূপ বা সমালোচনার জন্য ব্যবহৃত হয়, অথবা যখন সেগুলো স্পষ্টভাবে অন্য কোনো বিষয়ের প্রতি আরোপ করা হয়, তখন এই ধরনের কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে থাকতে পারে। এই নীতিমালার সংশোধন নাগরিক সমাজ এবং গবেষকদের সমালোচনার মুখে পড়েছে, যারা সতর্ক করেছেন যে এটি নারী এবং অন্যান্য সংবেদনশীল গোষ্ঠীগুলোর জন্য আরও বড় ঝুঁকির সৃষ্টি করে।

ইউরোপিয়ান অবজারভেটরি অফ অনলাইন হেট -এর প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নীতি পরিবর্তনের ঠিক পরেই ফেসবুকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষপূর্ণ বার্তার পরিমাণ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে এই নীতিগত পরিবর্তন স্যাটায়ার এবং হয়রানির মধ্যবর্তী অস্পষ্ট সীমানাকে আরও প্রসারিত করেছে, যা এর প্রয়োগকে আরও বেশি বিষয়ভিত্তিক এবং অসম করে তুলেছে।

কনটেন্ট মডারেশনের পাশাপাশি, মেটার ‘ইমপারসোনেশন’ (ছদ্মবেশ ধারণ) নীতিমালা ব্যবহারকারীদের প্রকৃত ব্যক্তি, ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেওয়া থেকে, অথবা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন বোঝায় এমন ক্যাম্পেইন তৈরি করা থেকে নিষেধ করে। স্যাটায়ার পেজগুলোর জন্য, নীতিমালায় বলা আছে যে পেজের নাম, ব্যবহারকারীর নাম এবং বায়োতে স্পষ্টভাবে এর স্যাটায়ারমূলক প্রকৃতি উল্লেখ থাকতে হবে, যাতে দর্শকরা সহজেই একে আসল মিডিয়া আউটলেট থেকে আলাদা করতে পারে। এই বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও, মূলধারার সংবাদ সংস্থাগুলোর দৃশ্যমান পরিচিতিকে ঘনিষ্ঠভাবে নকল করা পেজগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

স্যাটায়ার এবং হয়রানির মধ্যবর্তী সীমানা সম্পর্কে বলতে গিয়ে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্যাটায়ার প্ল্যাটফর্ম ইয়ার্কি-র প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক সিমু নাসের বলেন যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অবমাননা করা পর্যন্ত বিস্তৃত নয়। তিনি বলেন, “প্রশ্ন তোলা বা কোনো বিষয়কে সামনে আনা স্বাধীন মতপ্রকাশের অংশ। কিন্তু কাউকে কোণঠাসা করা বা চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করাটা হলো হয়রানি।” তার মতে, একজন নারী কতবার বিয়ে করেছেন, তার শরীর দেখতে কেমন বা তিনি কেমন পোশাক পরেন, এসব বিষয়কে স্যাটায়ার হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।

নাসের স্বীকার করেন যে কৌতুক প্রায়ই অস্বস্তি বা অসংগতির ওপর নির্ভর করে এবং এটি সবসময় রাজনৈতিকভাবে শুদ্ধ নাও হতে পারে। তিনি বলেন, “কিন্তু যখন কেউ এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যখন কোনো গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ওই জায়গাটা আর কৌতুকের থাকে না।” তিনি আরও যুক্ত করেন যে, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় নারীবিদ্বেষ গভীরভাবে প্রোথিত, যা প্রায়ই সবচেয়ে আক্রমণাত্মক রূপ নেয় যখন নারীরা দৃশ্যমান জনপরিসরের ভূমিকা পালন করেন। তার মতে, এই ধরনের লক্ষ্যবস্তু করার প্রক্রিয়া মূলত নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াস হিসেবে কাজ করে।

তিনি কনটেন্ট মডারেশনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দিকেও ইঙ্গিত করেন এবং উল্লেখ করেন, বাংলা ভাষায় স্যাটায়ার ও বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট মডারেট করার জন্য কার্যকর টুলের অভাব রয়েছে। যে শূন্যতার কারণে এ ধরনের হয়রানি বাধাহীনভাবে চলতে থাকে।

বৈধ সংবাদ সংস্থাগুলোর ওপর এর মানহানিকর প্রভাবও একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গবেষণার অংশ হিসেবে, ডিসমিসল্যাব যমুনা টিভির আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ জামেলা টিভি পর্যালোচনা করেছে এবং যমুনা টিভির নিউ মিডিয়া এডিটর রুবেল মাহমুদের সঙ্গে কথা বলেছে। মাহমুদ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম বা পরিচয়ের আড়ালে লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণগুলো প্রায়শই তাৎক্ষণিক এবং গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়, বিশেষত যাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয় তাদের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তার অনুভূতি এবং পেশাগত স্বাচ্ছন্দ্যের ক্ষেত্রে।

গণমাধ্যম সাক্ষরতাও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে জানান প্রথম আলোর ডেপুটি হেড অব রিপোর্টিং রাজিব আহমেদ। তিনি বলেন, “অনেক পাঠক ব্যঙ্গাত্মক আইটেম এবং আসল সংবাদ কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। যখন মানুষ পার্থক্য বুঝতে পারে না, তখন তারা সহজেই বিভ্রান্ত হয়।” তিনি আরও বলেন, যখন এই বিভ্রান্তি তাৎক্ষণিক কোনো পরিণতির সৃষ্টি করে না, তখনও এটি পরোক্ষভাবে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর ক্ষতি তৈরি করে। 

গবেষণা পদ্ধতি

এই প্রতিবেদনের জন্য, ডিসমিসল্যাব এমন পাঁচটি ফেসবুক পেজের কনটেন্ট বিশ্লেষণ করেছে, যেগুলো তাদের বায়োতে প্রকাশ্যে নিজেদের স্যাটায়ার বা বিনোদন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে। প্রতিটি পেজের ৩০,০০০-এর বেশি অনুসারী রয়েছে এবং পেজগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে তাদের কনটেন্ট বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের পরিবর্তে কৌতুক বা স্যাটায়ারের উদ্দেশ্যে তৈরি। পেজগুলো নির্বাচন করা হয়েছে মূলধারার বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের নাম, লোগো বা দৃশ্যমান পরিচিতির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠভাবে অনুকরণ করার ভিত্তিতে, যা সাধারণত সুপরিচিত সংবাদ ব্র্যান্ডগুলোর আভিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে করা হয়। বিশ্লেষিত পাঁচটি পেজ হলো:

  • প্রথম আলু, প্রথম আলোর অনুকরণে (৯৪,০০০-এর বেশি অনুসারী)
  • বালের কণ্ঠ, কালের কণ্ঠের অনুকরণে (৩৭,০০০-এর বেশি অনুসারী)
  • গজবভিশন, বাংলাভিশনের অনুকরণে (৪১,০০০-এর বেশি অনুসারী)
  • জামেলা টিভি, যমুনা টিভির অনুকরণে (১,৪৩,০০০-এর বেশি অনুসারী)
  • মাই বাংলা টিভি, মাই টিভির অনুকরণে (৪৬,০০০-এর বেশি অনুসারী)
লিঙ্গভিত্তিক গালি: ব্যঙ্গ থেকে হয়রানি: সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি স্যাটায়ার পেজ থেকে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ
যে পাঁচটি ফেসবুক পেজের কনটেন্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি কনটেন্টের প্রকৃতি ও মাত্রা মূল্যায়ন করতে, ডিসমিসল্যাব সাড়ে চার মাস ধরে এই পাঁচটি পেজ থেকে প্রকাশিত সমস্ত পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে। প্রথমে নারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত পোস্টগুলো চিহ্নিত করা হয়, এরপর সেগুলোতে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ, হয়রানি বা যৌন আক্রমণাত্মক ভাষা আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে সেগুলো পর্যালোচনা করা হয়। এরপর পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন এবং হয়রানির রূপের ওপর ভিত্তি করে এই পোস্টগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যা এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত ফলাফলের ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই পোস্টগুলো চারটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন অনুসরণ করেছে-

  • লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে গালি ও অপমান: কোনো ব্যক্তির লিঙ্গগত প্রকাশ বা যৌন অভিমুখিতাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করে অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে সরাসরি আক্রমণ।
  • সাধারণ গালি এবং অবমাননাকর ভাষা: লক্ষ্যবস্তুর সুনির্দিষ্ট পটভূমি নির্বিশেষে তাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ব্যাপকভাবে আক্রমণাত্মক শব্দ এবং অসম্মানজনক বাক্যাংশ।
  • মতাদর্শিক কারণে অবমাননা ও হেয় করা: রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জন্য কাউকে আক্রমণ করা এবং লজ্জিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা উপহাস ও অবমাননাকর মন্তব্য।
  • শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা পোশাক নিয়ে অপমান: একজন মানুষ দেখতে কেমন, কেমন পোশাক পরেন বা বাইরের দুনিয়ার কাছে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করেন তাকে লক্ষ্য করে অগভীর আক্রমণ।

আরো কিছু লেখা