
মাত্র ২২ সেকেন্ডের একটি ফেসবুক রিল ভিডিও। ওপরের অংশে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন নারী বিএনপির পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের সমর্থনে ব্যানার নিয়ে হাঁটছেন, স্লোগান দিচ্ছেন। রিলটির নিচের অংশে এক শিশু; দেখে মনে হয় বয়স আট কি নয়। তাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “আবাসিকের কর্মীগুলো [যৌনকর্মী অর্থে] নেমে গেছে রাস্তায়। সমাজটাকে ধ্বংস করে শান্তি পাইবেন?” মন্তব্যের ঘরে একজন লিখেছেন, “একটু খানি পোলা আবার আবাসিকও চিনে?”
আরেক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তিকে ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলছে এক শিশু। আর ব্যক্তিটি জামায়াতের নাম শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে “ধুরো হারামজাদা রাজাকারের বাচ্চা” বলে শিশুটির দিকে জুতা ছুড়ে মারছেন। শেষে শিশুটি বলছে জনগণ ১২ তারিখ তাদের রায় দেবে। কমেন্টে একজন হাতপাখা সমর্থক শিশুটিকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন, “জামাইত্তা মুনাফেক টাটকা শয়তান”। এই ভিডিওটি আবার সাজানো, বা স্ক্রিপ্টেড।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণার এমন বেশ কিছু কনটেন্ট দেখা গেছে যেখানে শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও শিশুরা স্লোগান দিচ্ছে, কোথাও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখছে। অনেকক্ষেত্রে অভিভাবকেরা যে দল সমর্থন করেন তার পক্ষে শিশুদের দিয়ে প্রচারণা করাচ্ছেন, এই দাবিতে যে, শিশুরা থাকলে বেশি সাড়া পাওয়া যায়। তারা এটাও মানছেন, এ কারণে মন্তব্যের সারিতে শিশুটির প্রতি ঘৃণাসূচক বক্তব্য আসছে।
জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো প্রধান দলগুলোর প্রতিটির সমর্থনেই শিশুদের ব্যবহার দেখা গেছে। অন্তত দুটি দলের কর্মীরা সরাসরি মাঠপর্যায়ের প্রচারণাতেও শিশুদের ব্যবহার করছেন এবং সেই প্রচারণার দৃশ্য ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। প্রচারণায় শিশুদের মুখে এখন একই ধরনের বুলি: “আমরা যদি ভোটার হতাম… মার্কায় ভোট দিতাম” অথবা “আমরা যখন বড় হব… মার্কায় ভোট দেব”।
নির্বাচনী আইনে শিশুদের ব্যবহার সরাসরি নিষিদ্ধ বা দণ্ডনীয় অপরাধ না হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ অনুযায়ী অবৈধ এবং নির্বাচন কমিশন চাইলে এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে বিষয়টি যদি কেবল প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা নারীদের প্রতি অবমাননাকর হয়, তবে তা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ ও নির্বাচনী আচরণবিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এক্ষেত্রে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল বা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভারত বা নেপালে নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে তেমন সুনির্দিষ্ট বিধান নেই।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণায়, সমস্যাজনক ভিডিও বেশি দেখা গেছে ‘সুনামগঞ্জী আমরা’ (পরিবর্তিত নাম জিয়াউর রহমান) নামের একটি পেজে। পেজটির অনুসারীর সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। পেজটির আপলোড করা ভিডিওতে ৮-৯ বছর বয়সী এক শিশুকে নিয়মিত দেখা যায়। সাধারণ ভ্লগের পাশাপাশি শিশুটিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিডিওতেও ব্যবহার করা হয়, যার বেশিরভাগই বিদ্বেষপূর্ণ।
এই প্রতিবেদনের শুরুতে একটি দলের নারীকর্মীদের ‘আবাসিকের কর্মী’ বলে মন্তব্য করা যে ভিডিওর কথা বলা হয়েছে সেটি এই পেজের। ভিডিওটিতে ৫৩ হাজার ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাড়া দিয়েছেন। শেয়ার করেছেন পাঁচ হাজারের বেশি। মন্তব্যের ঘরে শতশত ব্যবহারকারী আবার শিশুটিতে উৎসাহ দিচ্ছেন।
একই পেজের অন্য একটি ভিডিওতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মিজানুর রহমান আজহারির সমালোচকদের ‘জুতাপিটা করা দরকার’ বলে মন্তব্য করে শিশুটি।

আন্দোলনরত নারীদের ফুটেজ ব্যবহার করে আরেকটি ভিডিওতে শিশুটি বলে, “আমার সোনার বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই নাই- এই রকমের স্লোগান দিয়ে ৯৫ পারসেন্ট মুসলমানের দেশে নগ্ন ড্রেসে স্বাধীনচেতা স্লোগান দেয়- এই দেশের আইন প্রশাসনের তিন টাকারও মূল্য নাই এখন। নগ্ন ড্রেসে এরা করে আন্দোলন। এদেরকে থামাতেও বুঝি ভয় পায় এ দেশের বেয়াদব প্রশাসন।”
পেজটির ভিডিওগুলোতে বিভিন্ন ব্যবহারকারীকে শিশুটির উদ্দেশ্যে নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা যায়। একজন ব্যবহারকারী লিখেন, “কিরে বা.. পাকনা বা.. পাকে নাই তাই এই অবস্থা বা.. পাকলে কি করবি”।
পেজটি পরিচালনা করেন জিয়াউর রহমান নামের এক ব্যক্তি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি জানান, ভিডিওর শিশুটি তার ছোট ভাই। তিনি দাবি করেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যায়, তার বয়স ১৪ বছর। অধিকাংশ সময় শিশুটি নিজেই ভিডিওর স্ক্রিপ্ট লিখে বলে জানান জিয়া।
শিশুদের দিয়ে এমন রাজনৈতিক ও আক্রমণাত্মক ভিডিও তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, “ম্যাক্সিমাম সময় অডিয়েন্সদের টার্গেট করা হয় যে তারা কোন দিকে ঝুঁকে আছে। ট্রেন্ডিং বিষয় ফলো করতে গিয়ে আমাদের ভিডিওগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।” ভিডিওতে অশালীন ভাষার ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
সামাজিক মাধ্যমে এই ধরণের কনটেন্টের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে অশ্লীল, অবমাননাকর, নারীবিদ্বেষী কিংবা ঘৃণ্য রাজনৈতিক কনটেন্টে শিশুদের ব্যবহার করা স্পষ্টভাবেই শিশু সুরক্ষা নীতিমালার লঙ্ঘন এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি নির্বাচনী আইনেরও পরিপন্থি।”
শিশুদের ব্যবহার করে সব প্রচারণার যত ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার সবই যে বিদ্বেষমূলক তা নয়। সেখানে প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণ যেমন আছে, তেমনি কোনো প্রার্থী বা দলের প্রতি নিছক সমর্থনও আছে। তবে শিশুদের এমন ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন আছে।
‘রায়হানস কিড’ নামের ৯৮ হাজার অনুসারীর একটি পেজ, নিয়মিত কয়েকজন শিশুকে ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামী ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালায়। পেজটি পরিচালনা করেন শাহাদাত কবির রায়হান নামের একজন ব্যক্তি, যাকে ভিডিওগুলোতে প্রায়ই শিশুদের সঙ্গে দেখা যায়।
এই পেজের একটি ভিডিওতে ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস. এম. খালিদুজ্জামান, কক্সবাজার-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুখ আর ঢাকা-৮ আসনের এনসিপির প্রার্থী মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ছবি প্রদর্শন করে একটি শিশুকে বলতে শোনা যায়, “এই তিনটি আসন আপনারা আমাদের দিন, আমরা জাতিকে ৩০০ আসন উপহার দিব ইনশাল্লাহ।” ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়ার সংখ্যা দুই লাখের বেশি এবং শেয়ার হয়েছে ১৫ হাজার বার।
আরেকটি ভিডিওতে জামায়াতের আমিরের সঙ্গে পারিবারিক আবহের একটি এআই ছবি ব্যবহার করে দুই শিশুকে বলতে শোনা যায়, “ওরা ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে চলে যাবে। আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিব না, ফ্যামিলি মেম্বার হয়ে সুখে-দুখে সারাক্ষণ আপনার পাশে থাকব।”
পেজটিতে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর কার্নিভাল ২০২৬’ নামের একটি অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমিরের সঙ্গে শিশুরা দেখা করতে পারবে, তা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেও একটি ভিডিও ছড়ায়। সেখানে তাদের বলতে শোনা যায়, “সম্ভবত দেখা হচ্ছে আমিরে জামাতের সাথে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটর কার্নিভাল ২০২৬ আমন্ত্রণ পেলাম। সব আল্লাহর রহমত আপনাদের ভালোবাসা।”

এ বিষয়ে শাহাদাত কবির রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। ভিডিওতে থাকা শিশুদের পিতা তিনি। তার চার সন্তানের প্রত্যেককেই ভিডিওগুলোতে দেখা যায়। তার বড় তিন সন্তান যথাক্রমে নবম শ্রেণি, ষষ্ঠ শ্রেণি ও প্রথম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে বলে জানান তিনি।
শাহাদাত কবির স্বীকার করেন ভিডিওর স্ক্রিপ্ট তিনি নিজেই তৈরি করেন। রাজনৈতিক প্রচারে শিশুদের ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা কথা বললে মানুষ হয়তো এত শোনে না, বাচ্চারা বললে একটু বেশি শোনে। তাই দলের জন্য কিছুটা… (বাচ্চাদের দিয়ে) শোনাতে হয়।” তার দাবি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং পরিবারের অন্যদের দেখে তার সন্তানরা রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে।
পেজটির বিভিন্ন ভিডিওর কমেন্টে শিশুগুলোর উদ্দেশ্যে নেতিবাচক ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যও দেখা যায়। একজন ব্যবহারকারী শিশুদের “পাকিস্তানি ফেরাউনের বংশধর” উল্লেখ করে মন্তব্য করেন। আরেকজন লিখেন, “যতসব বাটপারি ফেসবুকে’। আরেকজন লিখেন, “সারা জীবন শুনছোস ভিক্ষা কইরা এখন চলবি কি কইরা।” শাহাদাত কবির নিজেও শিশুদের উদ্দেশ্যে এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য আসাটাকে সমস্যাজনক বলে উল্লেখ করেন।
জাহিদুল ইসলাম নামের একটি প্রোফাইল থেকে এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর পক্ষে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছে এক শিশু। এই পেজের অনুসারী ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি।
পেজের একটি ভিডিওতে শিশুটি ঘোষণা দেয়, “আমি বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামাত কাউকে আমি ভোট দিব না। আমি ভোট দিব হাসনাত আবদুল্লাহকে। কারণ হাসনাত ভাই জিতলে আমি জিতে যাব।”
অন্য এক ভিডিওতে কুমিল্লা-৪ আসনে হাসনাত আব্দুল্লাহর ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের পোস্টার হাতে নিয়ে শিশুটি বলে, “এতদিন খালি ভিডিও করছি। এখন শুধু ভিডিও না, সাক্ষাৎ প্রচারণা হবে। আমি ঘরে ঘরে গিয়ে শাপলা কলি মার্কার প্রচারণা করাম। প্রতিদিন সবাই বেশি বেশি মানুষের ঘরে ঘরে যাইয়া শাপলা কলি মার্কায় ভোট চাবেন।”

বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণাতেও শিশুদের ব্যবহার করার বেশ কিছু উদাহরণ আছে। বিশেষ করে শিশুদের মুখে একটি নির্দিষ্ট স্লোগান সামাজিক মাধ্যমে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। এ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও (১, ২, ৩, ৪, ৫) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্লোগান বা মিছিলে অংশ নিয়ে শিশুরা সমস্বরে বলছে, “আমরা যখন বড় হব, ধানের শীষে ভোট দিব”।
দাঁড়িপাল্লাতেও একই ধরনের স্লোগান দিয়ে শিশুদের প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। দাঁড়িপাল্লার প্রচারণার এরকম একাধিক ভিডিওতে (১, ২, ৩, ৪, ৫) শিশুরা বলছে “আমরা যদি ভোটার হতাম, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতাম”।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট একটি মেয়ে শিশুকে কোলে নিয়ে এক ব্যক্তি তাকে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বলতে বলছেন। খেলার ছলে কয়েকবার বললেও পরে আর রাজি না হয়ে ভিডিও করার আবদার করতে থাকে শিশুটি। পরে শিশুটিকে দিয়ে ফের ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কার কথা বলানো হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতি ২০১১-এর ৬.৭.৪ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো প্রকার প্রলোভন বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে তাদের রাজনীতিতে জড়িত করা নিষিদ্ধ। তবে শিশু আইন ২০১৩ বা নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচারণার বিষয়ে কোনো উল্লেখই নেই। সামাজিক মাধ্যম প্লাটফর্মগুলোর কমিউনিটি নীতিমালায়ও শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি যেভাবে এসেছে, বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহারের বিষয়টি সেভাবে পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের আওতায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করা যাবে কিনা জানতে চাইলে ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন,
“নির্বাচনী আইনে সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক বিধানের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহারকে বৈধতা দেয় না। তবে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, নির্বাচনী বিধিমালা কিংবা নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির অধীনে নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহার করাকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি।”
তবে তিনি মনে করেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রেও জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ প্রযোজ্য হবে। তিনি বলেন, “জাতীয় শিশু নীতির ৬.৭.৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা, প্ররোচিত করা বা বাধ্য করা নিষিদ্ধ। নির্বাচনী প্রচারণা স্বভাবগতভাবেই একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, এবং এই নীতির আওতা থেকে নির্বাচনকে বাইরে রাখার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।”
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রচারণা ও নির্বাচনী কর্মসূচিতে শিশুদের ব্যবহার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা বা সচেতনতামূলক বিধান প্রয়োগের উদাহরণ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল ও ভারতে এটি নিষিদ্ধ। নেপালে, চলতি বছরের ৫ মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষ্যে জারি করা আচরণবিধিতে বলা হয়েছে কোনো শিশুকে নির্বাচনী প্রচারণায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
একইভাবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক নির্দেশনায় জানিয়েছে, পোস্টার ও প্যামফ্লেট বিতরণ, স্লোগান দেওয়া কিংবা প্রচারের গাড়িতে বা নেতার কোলে শিশুদের উপস্থিত করাও নির্বাচনী আইন ও শিশু শ্রম আইনের (২০১৬ সংশোধন) সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। কমিশনের নির্দেশানুসারে, রাজনৈতিক দলগুলো কোনো ধরনের প্রতীকী প্রচারণাতেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করতে পারবে না এবং এই নিয়ম ভঙ্গ করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “ভারত ও নেপালের মতো বাংলাদেশে এখনো সরাসরি প্রচারণায় শিশুদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী বিধিনিষেধ নেই। এখানে শিশুরা নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির অধীনে কোনো ঢালাও নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে কনটেন্ট-ভিত্তিক এবং আচরণ-ভিত্তিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে।” তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের ঘাটতি নীতিগত জায়গায় নয়, বরং নির্বাচনী নির্দেশনার অনুপস্থিতিতে। ফলে আদালত ও নির্বাচন কমিশনকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শুধু নীতিগত ও সাংবিধানিক আদর্শের ওপর নির্ভর করতে হয়।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান হিন্টালোভন ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের প্রভাবিত করা উচিত না। শিশুদের রাজনীতি বা নির্বাচন সম্পর্কে শিক্ষিত এবং সচেতন করা জরুরি, তবে এক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যেখানে শিশুরা না বুঝেই কোনো রাজনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে এবং তাদের নিজেদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকছে না, সেখানে তাদের কেবল ব্যবহারের সামগ্রী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সেখানে আরও বলা হয়, শিশুরা পাবলিক ফিগার না, ফলে একটি শিশুর তথ্য বা ছবি ব্যবহার করে প্রচারণা করাটা তার অধিকারের পরিপন্থি, যদি তার অভিভাবকের সম্মতি থেকে থাকে তবুও।