
নির্বাচনের হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণা চালাচ্ছে পুরোদমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিজ্ঞাপন দিচ্ছে দলগুলো। রাজনৈতিক প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষিদ্ধ বা অবৈধ নয়, তবে মেটাসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম দলগুলোকে মেনে চলতে হয়। মেটার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, রাজনীতি সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিজ্ঞাপনে এর পৃষ্ঠপোষক বা অর্থায়নকারীর নাম ও পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। না থাকলে বিজ্ঞাপনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত এবং অপসারণ করার কথা। তবে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেটা সব সময় এ ধরনের কন্টেন্ট শনাক্ত করতে এবং ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ ব্যর্থতা মেটার স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাই দেখিয়ে দিচ্ছে।
এই অনুসন্ধানের জন্য ডিসমিসল্যাব ৭ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেটার অ্যাড লাইব্রেরি বিশ্লেষণ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা নেতার নাম ব্যবহার করা অন্তত ৫০২টি প্রচারণা পোস্ট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মেটা তাদের নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত ৪১টি বিজ্ঞাপনকে “রাজনৈতিক, নির্বাচনী বা সামাজিক ইস্যু” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩২টি বিজ্ঞাপনে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক ডিসক্লেইমার বা তথ্য ছাড়াই সরাসরি রাজনৈতিক দল, তাদের কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের প্রচার করা হয়েছে।
সরাসরি রাজনৈতিক বার্তার বাইরেও রাজনৈতিক দলের নাম বা লোগো ব্যবহার করে টি-শার্ট, ক্যাপ, হুডি ও বইয়ের মতো বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য বিক্রির অন্তত ৪২টি বিজ্ঞাপন প্রচার হতে দেখা গেছে। মেটার নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের বিজ্ঞাপনেও ডিসক্লেইমার থাকা বাধ্যতামূলক। এমন নজিরও পাওয়া গেছে ডিসক্লেইমার না থাকায় একটি বিজ্ঞাপন সরিয়ে দেওয়া হলেও একই ধরনের অন্য বিজ্ঞাপন ঠিকই চলছিল, যা মেটার স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞাপন শনাক্তকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা রাজনৈতিক দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। মেটার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী সেগুলো ‘রাজনৈতিক’ হলেও চিহ্নিত করতে পারছে না প্ল্যাটফর্ম। ফলে এই বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণ কন্টেন্ট হিসেবে প্রচারিত হয়েছে এবং বিজ্ঞাপনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো অ্যাড লাইব্রেরি থেকে মুছে গেছে। মেটার নীতিমালা অনুসারে, সাধারণ বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় শেষ হলে তা অ্যাড লাইব্রেরি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনগুলো সংরক্ষিত থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার একটি আসনে নবগঠিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) বিজয় নিয়ে একটি আশাব্যঞ্জক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের লেখাটি ছিল: “ঢাকা ১৫ আসনে এন সি পি র প্রচারণা চলছে। জনগণের মার্কা, শাপলা কলি মার্কা। গ্রাম ও শহর অলি-গলি, জিতবে এবার শাপলা কলি। ইনশাআল্লাহ ✊✊ National Citizen Party – NCP” বিজ্ঞাপনে সরাসরি একটি দল ও নির্বাচনী প্রতীকের নাম উল্লেখ থাকলেও মেটা এটিকে রাজনৈতিক বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিজ্ঞাপনটি এখন আর অ্যাড লাইব্রেরিতে দেখা যাচ্ছে না।
আরেকটি বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, দলের প্রার্থী এবং দলে তার পদের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল: “🗳️ সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী-১৪৭ ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আমীর – গৌরীপুর উপজেলা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।” ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মেটা এটিকে সাধারণ বিজ্ঞাপন হিসেবে গণ্য করেছে এবং তাই এটি এখন আর অ্যাড লাইব্রেরিতে দৃশ্যমান নেই।

তৃতীয় আরেকটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে পঞ্চগড়-১ আসনের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) এক নেতার অফিসিয়াল পেজ থেকে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে: “আমাদের নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হবে হার্ভার্ড-অক্সফোর্ডের আন্তর্জাতিক জ্ঞান এবং পঞ্চগড়ের মাটি থেকে উঠে আসা অভিজ্ঞতা, কারণ বাংলাদেশের জন্য নীতি নির্ধারণে অবশ্যই মাটি থেকে উঠে আসা অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাতে হবে। সঠিক ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নে সঠিক নেতৃত্বকে ভোট দিন।” মেটার নীতিমালা অনুযায়ী, এমন সরাসরি রাজনৈতিক বার্তার ক্ষেত্রে অর্থায়নকারীর তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক, কিন্তু এই বিজ্ঞাপনে তা করা হয়নি। তবুও এটি মেটার স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় ধরা পড়েনি।
অনুসন্ধানে অন্তত ৪২টি এমন বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক দলের লোগো সম্বলিত টি-শার্ট, ক্যাপ এবং হুডিসহ বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করা হয়েছে। মেটার নিয়ম অনুযায়ী, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে এমন যেকোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সেটিকে একটি বিশেষ বিভাগভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। তবে প্ল্যাটফর্ম এই ৪২টি বিজ্ঞাপনের একটিকেও সেই বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করেনি। ফলে এগুলোর মূল বার্তা রাজনৈতিক হওয়া সত্ত্বেও ব্যবহারকারীদের কাছে এগুলো সাধারণ ই-কমার্স বিজ্ঞাপন হিসেবেই পৌঁছেছে।
অবশ্য মেটা যে সব সময় এ ধরনের কন্টেন্ট শনাক্ত করতে বা ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তা নয়। অনুসন্ধানের সময় প্ল্যাটফর্ম থেকে এই ধরণের একটি বিজ্ঞাপন সরিয়ে দেওয়া হয়। ‘ক্যাপ্টেন চয়েজ’ নামের একটি পেজ থেকে প্রচারিত ওই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল: “💥 ৩০% মূল্য ছাড়ে প্রতি পিস মাত্র ৬৫০ টাকা!! 🔥 ২ পিস অর্ডারে ডেলিভারি চার্জ একদম ফ্রি!!” বিজ্ঞাপনের বেশ কিছু ছবিতে প্রদর্শিত হুডিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নাম, লোগো এবং ‘ধানের শীষে’ ভোট চেয়ে স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছিল। বিজ্ঞাপনের বিস্তারিত অংশে মেটা উল্লেখ করেছে, ‘রাজনৈতিক, নির্বাচনী এবং সামাজিক ইস্যু’ সংক্রান্ত নীতিমালা মেনে না চলায় তারা বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে দিয়েছে।

অথচ অন্য একটি পেজ থেকে প্রচারিত একই ধরনের একটি বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্ল্যাটফর্মটি। সেখানে হুডিতে বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদলের নাম ও লোগো প্রদর্শিত হয়েছে। এটি মেটার শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ত্রুটিকেই আবারও সামনে আনে।

ডিসমিসল্যাব রাজনৈতিক দলের বই বিক্রির বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও মেটার শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেখতে পেয়েছে। একটি বিজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: “’বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ এবং ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’-এর সিলেবাসভুক্ত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সহজবোধ্য পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপন।” বিজ্ঞাপনটিতে সরাসরি একটি রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নাম উল্লেখ থাকায় মেটার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় এটি রাজনৈতিক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
মেটার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, ‘সামাজিক ইস্যু, নির্বাচন বা রাজনীতি’ সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হলে বিজ্ঞাপনদাতাকে অবশ্যই একটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নীতি বলছে, যদি কোনো বিজ্ঞাপন কোনো রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নির্বাচন বা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সামাজিক ইস্যুকে সমর্থন বা বিরোধিতা করে, তবে তাতে অবশ্যই একটি ‘ডিসক্লেইমার’ বা তথ্যসূত্র থাকতে হবে। এই ডিসক্লেইমারে বিজ্ঞাপনটির অর্থায়নকারী কে এবং তার নাম ও ঠিকানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক।
কোনো বিজ্ঞাপনে যদি কোনো দলের লোগো বা স্লোগান ব্যবহার করা হয়, তবে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ার কথা। মেটা বলছে, “যেসব বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য কোনো পণ্য বিক্রি বা সেবার প্রচারণা, সেগুলোকে সামাজিক ইস্যু সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন হিসেবে গণ্য না-ও করা হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে অনুমোদন বা ডিসক্লেইমারের প্রয়োজন নেই। তবে পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপনে যদি কোনো রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বা আইন প্রণয়নের উল্লেখ থাকে, তবে এই ছাড় প্রযোজ্য হবে না।” কিন্তু বাস্তবে এসব নীতিমালার প্রয়োগে খুব একটা কড়াকড়ি দেখা যায়নি। বিশেষ করে বাংলা ভাষার কন্টেন্ট এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে মেটার পদ্ধতিতে যে ঘাটতি আছে, তা এই অনুসন্ধানে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়ও মেটার রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় একই ধরনের অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছিল ডিসমিসল্যাব। সেই সময় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার এবং অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক মো. পিজুয়ার হোসেন সতর্ক করে বলেছিলেন, “জাতীয় নির্বাচনেও যদি এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ শনাক্তকরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং এর স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।”
তার মতে, যেসব প্রার্থীর বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা হয়, তারা কম প্রসার, ধীরগতির অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত নিয়ম মানার চাপে পড়তে পারেন; অন্যদিকে, এই ধরনের বিধিনিষেধ এড়িয়ে অন্য প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান। এই বৈষম্য ভোটারদের তথ্য পাওয়ার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, প্রচারণার পরিধিকে প্রভাবিত করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যেখানে ভোটারদের পছন্দ বা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নাও হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “তাছাড়া, ভোটাররা যদি মনে করেন যে মেটার মতো একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বা দলের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করছে, তবে তা পক্ষপাতের অভিযোগ উসকে দিতে পারে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—উভয়ের প্রতিই অনাস্থা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিবেশে এ ধরনের ধারণা মেরুকরণ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।”
রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে মেটার এই দুর্বলতা কোনো নতুন বিষয় নয়। এর আগে ডিজিটালি রাইট-এর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্ল্যাটফর্মটি অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিজ্ঞাপনকে “রাজনৈতিক” হিসেবে শনাক্ত করেছিল, অথচ বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও দলের বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে তারা ব্যর্থ হয়েছিল।