মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
This article is more than 2 months old
একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও, একটি ভাইরাল উক্তি এবং আমাদের অনলাইন বাস্তবতা

একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও, একটি ভাইরাল উক্তি এবং আমাদের অনলাইন বাস্তবতা

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

গত নভেম্বরে একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। এক মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের ওই ভিডিওতে উন্মুক্ত এক স্থানে দুই পুরুষকে এক কিশোরীর উপর যৌন নির্যাতন করতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে নির্যাতনকারীদের একজন দুই শব্দের একটি বাক্য ব্যবহার করে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেখা গেছে, অধিকাংশ পোস্টে মূল ঘটনা এড়িয়ে ধর্ষকের উচ্চারিত সেই কথাটিই ব্যবহৃত হয়েছে।

ধীরে ধীরে ওই শব্দযুগল পরিণত হয় ট্রেন্ডে।

ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও বাক্যটির বিস্তার রোধে ডিসমিসল্যাব ধর্ষকের উচ্চারিত উক্তিটি প্রকাশ করছে না। তবে ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝার স্বার্থে বলা দরকার; ভুক্তভোগী যখন যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন, তখন নিপীড়কদের একজন অন্যজনকে উদ্দেশ্য করে ভুক্তভোগীর গোপনাঙ্গকে লক্ষ্য করে বর্বরোচিত আরেকটি কাজ করতে উৎসাহিত করছিল।

ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার সময় ভিডিওর বিভিন্ন অংশ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ও এক্সে (সাবেক টুইটার) ভিডিওটির অডিও ও দৃশ্য নানাভাবে সম্পাদনা (এডিট) করে ব্যবহার করা হয়। কিছু পোস্টে এ ঘটনার বিস্তারিত বলে সমালোচনা করা হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিডিওর বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে বিনোদনের খোরাক হিসেবে। ফলোয়ার, রিচ ও এনগেজমেন্ট বাড়াতে ধর্ষকের উক্তিটি হ্যাশট্যাগ ও ভিডিওর টাইটেলে ব্যবহার করা হয়েছে। 

নভেম্বরের শেষ দিকে মানুষ গুগলে এত বেশি ওই উক্তি লিখে সার্চ করেছে যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই কিওয়ার্ডটি গুগল ট্রেন্ডসের উপরের দিকে উঠে এসেছিল। গুগল ট্রেন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করেই এই সার্চের পরিমাণ বেড়ে যায়। যা পরের কয়েক সপ্তাহেও দেখা গেছে। এক পর্যায়ে শতভাগ স্কোর পেয়ে ট্রেন্ডের শীর্ষে ছিল শব্দ দুটি। সার্চে ব্যবহৃত শব্দগুলো (কিওয়ার্ড) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘটনার বিস্তারিত জানতে নয়, ব্যবহারকারীদের অনেকেই মূল ভিডিওটি খুঁজছিলেন।

গত ১০ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমায় ডিসমিসল্যাব ঘটনাটির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক প্রায় ৬০০টি ভিডিও এবং ফেসবুকের ১,৪০০টির বেশি মন্তব্য বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণায় দেখা হয়েছে, কীভাবে যৌন সহিংসতার একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়েছে এবং ব্যবহারকারীরা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কীভাবে প্ল্যাটফর্মগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা এর বিস্তার রোধে বার বার ব্যর্থ হয়েছে, সেটাও দেখা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেসবুকে মন্তব্যকারীদের প্রায় ৬৫ শতাংশই ভিডিওটি ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন অথবা ভিডিওর লিংক চেয়েছেন। এর বাইরে অনেকেই উপহাস করেছেন, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করেছেন। অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে পাওয়া ভিডিওগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেই মূল ফুটেজ বা অডিও ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ভিডিও ঢাকার কোনো ব্যবস্থা (ব্লার) বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

ভুক্তভোগীর ট্রমাকে অনলাইনে ট্রেন্ড করার পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠলে, বিশেষ করে সে ঘটনাকে হাস্যরস বা উপভোগ্য বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সমাজে সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। ভুক্তভোগীর পুনরায় হেনস্তা (সেকেন্ডারি ভিক্টিমাইজেশন) হওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। ভুক্তভোগীর কাছে ভিডিওর প্রতিটি প্রচার মূল নির্যাতনেরই পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে।

আর এই ঘটনা প্ল্যাটফর্মগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের সুরক্ষা নীতিমালা কতটা অকার্যকর। যখন জবাবদিহিতার চেয়ে কনটেন্ট ছড়ানোর প্রক্রিয়া সহজ হয়, তখন এসব নীতিমালাকে উপেক্ষা করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না ব্যবহারকারীদের।

ভাইরাল উক্তি ও ভিডিওর মূল ঘটনা

গত ২২ নভেম্বর প্রথম ভিডিওটি ডিসমিসল্যাবের নজরে আসে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা এবং ধর্ষণের নিন্দা জানিয়ে ফেসবুকে পোস্টটি করা হয়েছিল। ভিডিওতে উন্মুক্ত স্থানে এক নারীর ওপর দুই ব্যক্তিকে যৌন নিপীড়ন চালাতে দেখা যায়। ভিডিওর এক পর্যায়ে অপরাধীদের একজনকে দুটি শব্দ বলতে শোনা যায়। পরবর্তীতে সেই উক্তিই শিরোনাম ও হ্যাশট্যাগ হিসেবে অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেদিন ভিডিওর উৎস বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা ভিডিওর বিভিন্ন কিফ্রেম এবং প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, পরদিন কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের (, , ) প্রতিবেদনে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একটি নির্জন চরে দশম শ্রেণির এক ছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। নির্যাতনের দৃশ্য অপরাধীরা ধারণ করে রাখে, যা নভেম্বরের শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১০ নভেম্বর ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়। পুলিশ সেদিনই দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তবে আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও সামাজিক মাধ্যমে ক্রমাগত ছড়িয়েছে ভিডিও।

 পুরোপুরি নিশ্চিত হতে ডিসমিসল্যাব মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। শিবগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এস এম শাকিল হাসান নিশ্চিত করেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ওই ঘটনার। তিনি জানান, গত ৬ এপ্রিল অপরাধীরা ধর্ষণের সময় ভিডিও ধারণ করে রাখে। পরবর্তীতে সেটি ব্যবহার করে ভুক্তভোগীকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হলে ভুক্তভোগীর মা আইনের আশ্রয় নেন।

পুলিশ কর্মকর্তা শাকিল হাসান আরও জানান, গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে ভিডিওটি সরানোর ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ঠেকানো যায়নি ভিডিওর ছড়িয়ে পড়া

গবেষকেরা সেই নির্দিষ্ট ‘কিওয়ার্ড’ ধরে ১০ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটির বিস্তার পর্যবেক্ষণ করেন। এই সময়ের মধ্যে ফেসবুকে ২১৯টি পোস্ট, ইউটিউবে ১০০টি এবং টিকটকে ১০১টি প্রাসঙ্গিক ভিডিও শনাক্ত করা হয়। সামাজিক মাধ্যম এক্সেও (সাবেক টুইটার) একই সময়সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্ট দুটি ভিডিও ও একটি পোস্ট পাওয়া যায়।

প্ল্যাটফর্মভেদে ভিডিওটি ছড়ানোর ধরণ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এতে একদিকে প্ল্যাটফর্মগুলোর নজরদারির পার্থক্য ও অন্যদিকে ভিডিওটি পুনঃব্যবহারের বিচিত্র সব কৌশল নজরে আসে।

ফেসবুকে শনাক্ত হওয়া পোস্টগুলোর প্রায় ৩৮ শতাংশেই মূল ভিডিও বা অডিওর অংশবিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে। এসবের কোনোটিতেই দৃশ্য বা অডিও পর্যাপ্তভাবে অস্পষ্ট করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে মূল অসম্পাদিত ভিডিওটি দেখার জন্য টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিংক ক্যাপশনে বা কমেন্টে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক রিলস ও ছোট ভিডিওগুলোতে ওই অডিওর সঙ্গে মিলিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি বা স্কেচ ভিডিও তৈরি করেছেন অনেকে। এসব পোস্টের ক্যাপশন ও মন্তব্যে হাসির ইমোজি এবং কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার প্রমাণ করে, অপরাধের সাক্ষ্য নয় বরং বিনোদনের খোরাক হিসেবেই দেখা হয়েছে ভিডিওকে।

ভিডিও শেয়ারিং মাধ্যম ইউটিউবে শনাক্ত হওয়া ১০০টি ভিডিওর মধ্যে ৬০টিতেই মূল ঘটনার দৃশ্য বা অডিও ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই ঘটনার স্পষ্ট ফুটেজ আপলোড করা হয়েছে, যা ইউটিউব কমিউনিটি গাইডলাইনের পরিপন্থী। বাকি ৪০টি ভিডিওর শিরোনাম বা বর্ণনায় সেই ভাইরাল শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে ঘটনাটির উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাদের ভ্লগ বা আলোচনাতেও ওই অডিও জুড়ে দিয়েছেন।

টিকটকে মূল ভিডিওর উপাদান ব্যবহারের প্রবণতা আরও বেশি ছিল। নথিভুক্ত ভিডিওগুলোর ৭৪ শতাংশেই মূল ঘটনার কোনো না কোনো অংশ, বিশেষ করে অডিও ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ভিডিওগুলোর সম্পাদিত সংস্করণই বেশি দেখা গেছে, হুবহু মূল ফুটেজ পাওয়া যায়নি। বাকি ২৬ শতাংশ ভিডিওতে সরাসরি দৃশ্য বা শব্দ ব্যবহার না করলেও ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করা হয়েছে। মাত্র একটি ভিডিওতে ‘সেনসিটিভ কনটেন্ট’ বা সংবেদনশীল লেবেল দেখা গেছে, যেখানে শুধু অডিও ছিল।

অন্যদিকে এক্স-এ ওই সময়ে দুটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে ঘটনার পুরো ফুটেজই ছিল। ভিডিও দুটিতে ‘সেনসিটিভ কনটেন্ট’ বা সতর্কবার্তা থাকলেও তা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। অর্থাৎ, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলেই যে কেউ ভিডিওটি দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

এছাড়া ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে একাধিক পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটেও ভিডিওটির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিসমিসল্যাবকে জানান, সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের ভিডিও ছড়ালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধারণত বিটিআরসিকে অবহিত করে। এরপর বিটিআরসি কনটেন্টটি সরানোর উদ্যোগ নেয়।

ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলার চ্যালেঞ্জ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান বলেন, যখন একই ভিডিও বা অডিও বারবার ডাউনলোড, এডিট এবং পুনরায় আপলোড করা হয়, তখন প্রতিবারই একটি নতুন লিংক ও ভিন্ন ডিজিটাল সিগনেচার  তৈরি হয়। তিনি বলেন, “এর ফলে একই কনটেন্ট ভিন্ন ভিন্ন লিংক হিসেবে প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব কনটেন্ট ধারাবাহিকভাবে শনাক্ত ও ব্লক করা কঠিন হয়ে পড়ে।”

রিচ-এনগেজমেন্ট বাড়াতে অপরাধ যেভাবে “বিনোদন”  

বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহারকারীই সবচেয়ে বেশি। তাই গভীর বিশ্লেষণের জন্য ফেসবুকে শনাক্ত হওয়া ২১৯টি পোস্টকে বেছে নেওয়া হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিডিওর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক প্রথম পোস্ট আপলোড করা হয় ১১ নভেম্বর। অর্থাৎ ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে যেদিন মামলা করেছিলেন তার পরদিন।

এরপর থেকে পোস্টের সংখ্যা বাড়তে থাকে, পাল্টাতে থাকে কনটেন্টের ধরণ। কেউ মূল ভিডিওর পুরোটা আপলোড করেছে, কেউ আংশিক। কেউ ফুটেজ সম্পাদনা (এডিট) করে দৃশ্য ঝাপসা করলেও মূল ভিডিওর সংবেদনশীল অডিও রেখে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু অডিও অংশটুকু আলাদা করে ভিন্ন কোনো ছবি বা অভিনয়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে রিলস। মূল ঘটনার কথা উল্লেখ না করে অপরাধীর সেই উক্তি ভিডিওটি খুঁজে পাওয়ার ‘কি-ওয়ার্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

  • একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও, একটি ভাইরাল উক্তি এবং আমাদের অনলাইন বাস্তবতা
  • একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও, একটি ভাইরাল উক্তি এবং আমাদের অনলাইন বাস্তবতা

কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। গত ২০ নভেম্বর ফেসবুকে একজন ব্যবহারকারী মূল ভিডিওর একটি সম্পাদিত সংস্করণ পোস্ট করেন। ভিডিওর ওপর বিভিন্ন লেখা ও ইমোজি জুড়ে দেওয়া হয়। ক্যাপশনে বলা হয়, ভিডিওটি পেতে তার অ্যাকাউন্ট ফলো করতে এবং মেসেজ দিতে। মন্তব্যে একটি টিকটক প্রোফাইল উল্লেখ করে তা ফলো দিয়ে ইনবক্সে স্ক্রিনশট দিলে বিনিময়ে পুরো ভিডিও দেওয়ার কথা বলা হয়।

ভিডিওর দৃশ্য কিছুটা অস্পষ্ট থাকলেও অডিও ছিল স্পষ্ট। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে। এছাড়া এতে দেড় হাজারেরও বেশি প্রতিক্রিয়া ও ২০০-এর বেশি মন্তব্য পড়েছে, যার অধিকাংশই ভিডিওর লিংক চেয়েছে। ফেসবুক ও টিকটকে ভিডিওটির এই সংস্করণটিই বারবার ঘুরপাক খেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমিউনিটি গাইডলাইনের কোনো সতর্কবার্তা নজরে আসেনি। 

আরেক ব্যবহারকারী ছয় সেকেন্ডের একটি রিলস পোস্ট করেন। সেখানে তাকে হাসতে হাসতে বলতে শোনা যায়, “মামা… (ধর্ষকের সেই উক্তি), মানে কি ভাই? পুরাই টেনিং কাপাইতেছে ভাই।” ভিডিওর ক্যাপশনেও হাসির ইমোজি দিয়ে ওই একই উক্তি লেখা হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি দেড় লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। এক হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া ছিল, মানুষ মন্তব্য করেছে সাড়ে তিন শরও বেশি।

আরেকটি ১৫ সেকেন্ডের রিলসে মূল অডিওর ‘রিমিক্স’ ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও ঢালিউডের বিখ্যাত খলনায়ক মনোয়ার হোসেন ডিপজলের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ  যোগ করে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওর ওপর ভুক্তভোগীর আকুতি লিখে ক্যাপশনে প্রশ্ন রাখা হয়, “ঘটনাটা কে কে দেখছেন?” এই রিলসটিও ১ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।

মাত্র ১১ জন ব্যবহারকারীকে পাওয়া গেছে, যারা এই ঘটনায় নিন্দা বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে তাদের কেউ কেউ প্রমাণের দোহাই দিয়ে ওই অডিও শুনিয়েছেন, যা ভুক্তভোগীকে কার্যত আবারও জনসম্মুখে হেনস্তা করেছে। যেমন, ‘নাইম হাব’ নামের একটি পেজ থেকে একজন ক্যামেরার সামনে এসে বলেন, “আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মা-বোনেরা নিরাপদ নয়। ওপরের কথাগুলো শুনলেই বুঝবেন।” এর পরপরই ভিডিওতে মূল ঘটনার সংবেদনশীল অডিওটি বাজিয়ে শোনানো হয়।

রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়েও ভিডিওটি ব্যবহার করা হয়েছে। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ধর্ষণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি আর খুন করে দেশটা শেষ করে দিল ইউনূস। আজ মা-বোনদের নিরাপত্তা কোথায়? এসব ভিডিও দেখা যন্ত্রণাদায়ক।” অথচ তিনি নিজেই মূল ভিডিওটি যথাযথ অস্পষ্টতা ছাড়াই শেয়ার করেছেন, যা ৬ হাজারের বেশি মানুষ দেখেছেন।

‘ভাই, ভিডিওর লিংকটা দেন’

সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা এই ভাইরাল কনটেন্টে কীভাবে সাড়া দিয়েছেন, তা বুঝতে ডিসমিসল্যাব ফেসবুকের ২১৯টি পোস্টের নিচে করা ১ হাজার ৪০৬টি মন্তব্য বিশ্লেষণ করেছে। ব্যবহারকারীদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য কোনো মন্তব্যের প্রতিউত্তর বা ‘রিপ্লাই’ এই বিশ্লেষণের বাইরে রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, প্রতি তিনজন মন্তব্যকারীর মধ্যে একজন ভিডিওটি ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তারা ভিডিওর লিংক শেয়ার করেছেন অথবা কোথায় গেলে মূল ভিডিও পাওয়া যাবে, সেই পথ বাতলে দিয়েছেন। এদের অনেকেই টেলিগ্রাম চ্যানেল বা অন্য কোনো ওয়েবসাইটের লিংক জুড়ে দিয়েছেন। যেমন, একটি মন্তব্যে লেখা ছিল, “যাদের ফুল লিংক দরকার, নিচে ক্লিক করেন।” এরপর একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের লিংক দেওয়া হয়। আবার অনেকে লিখেছেন, “যাদের লাগবে ইনবক্সে আসো।” কেউ কেউ ভিডিওর বিনিময়ে টিকটক অ্যাকাউন্ট বা ফেসবুক পেজ ফলো করার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে  এক-তৃতীয়াংশ মন্তব্যকারী সরাসরি ভিডিওটি চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে অনেকেই ভাইরাল হওয়া সেই কুরুচিপূর্ণ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং তাদের চাওয়ার ধরনে কোনো সংকোচ ছিল না। অনেকেই উপহাসের সুরেও খুঁজেছেন ভিডিওর লিংক। যেমন— “ভাই, লিংকটা দেন”, “ভিডিওটা কেউ দেন”, “ফুল ভিডিও আছে?” ইত্যাদি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘হা হা’ রিয়েকশন ও হাসির ইমোজি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অন্তত ৯০ জন ব্যবহারকারী এই অপরাধকে সমর্থন করে বা যৌনউত্তেজক মন্তব্য করেছেন। তারা ধর্ষণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে না দেখে বরং উপভোগ্য ‘কনটেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

বিশ্লেষণের আওতায় থাকা ৩৯টি মন্তব্যে অপরাধীদের বদলে উল্টো ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়েছে। নৈতিকতা বা ধর্মের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছে, মেয়েটির আচরণের কারণেই এমনটা ঘটেছে। যেমন, একজনের মন্তব্য, “মেয়ে ভালো হলে এতগুলো ছেলের সঙ্গে যেত না।” কেউ কেউ ভুক্তভোগীর শাস্তিও দাবি করেছেন। এমনকি ভুক্তভোগীর উদ্দেশে অশালীন গালিগালাজ এবং ধর্ষকদের ‘বাঘের বাচ্চা’ বলে বাহবা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এক মন্তব্যে লেখা হয়েছে, “ল্যাংটা হয়ে ছেলেদের সাথে ঘোরার শখ মিটছে এবার।”

প্রতি দশজনের মধ্যে মাত্র একজন এই ঘটনার প্রতিবাদ বা ভুক্তভোগীর প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন। কেউ কেউ ভিডিওটি দেখে নিজের মানসিক যন্ত্রণার কথা লিখেছেন। একজন লিখেছেন, “ভিডিওটা দেখে খুব খারাপ লাগল। মেয়েটা অসহায় ছিল।” আরেকজন লিখেছেন, “ভিডিওটি দেখে কান্না পাচ্ছে। যারা এই ভিডিও খুঁজছে, তারা মানুষ না।”

তবে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের মধ্যেও অনেকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন গালিগালাজ। অপরাধীদের শাস্তির দাবির বদলে তারা আক্রমণ করেছেন অপরাধীদের মা, বোন বা স্ত্রীকে। তাদের মন্তব্যে ব্যবহৃত হয়েছে কুরুচিপূর্ণ শব্দ, যা কার্যত নারীবিদ্বেষী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। অপরাধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন নারীদের নিয়েও তারা ঘৃণাসূচক শব্দ ব্যবহার করেছেন।

আগ্রহের ছাপ গুগল ট্রেন্ডসেও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে ভিডিওটি কীভাবে সাধারণ মানুষের সার্চ বা অনুসন্ধানের বিষয়ে পরিণত হলো, তার চিত্র উঠে এসেছে গুগল ট্রেন্ডসের তথ্যে। এই টুলটি মানুষের ব্যক্তিগত মতামত বা আবেগ পরিমাপ করে না, বরং এটি দেখায় কখন বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বল্প সময়ের মধ্যে একই শব্দ লিখে সার্চ করছে। সাধারণত কোনো ভাইরাল ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এমনটা ঘটে। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো কীভাবে অনলাইনে মানুষের আকস্মিক ও তীব্র আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল ভিডিওটিকে।

ভিডিওটি নিয়ে সার্চ করার প্রবণতা নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কম থাকলেও তা স্থিতিশীল ছিল। তবে ১৮ নভেম্বরের দিকে তা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকার পর মাসের শেষের দিকে তা দ্রুত কমে আসে। ডিসেম্বর মাস জুড়ে সার্চের হার কিছুটা নিম্নমুখী ও স্থিতিশীল ছিল। এর মধ্যে ৫ ও ২৩ ডিসেম্বরের দিকে সার্চের পরিমাণ সামান্য বাড়লেও তা শুরুর দিকের মতো তীব্র ছিল না।

গুগল ট্রেন্ডসের তথ্যে বেশ কিছু ‘ব্রেকআউট’ কোয়েরি বা অনুসন্ধান শব্দ চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের সময়ের তুলনায় এসব শব্দ লিখে সার্চ করার হার ৫ হাজার শতাংশেরও বেশি বেড়েছিল। এসব সার্চের কিওয়ার্ডে ছিল ভিডিওর সেই ভাইরাল উক্তি, যার মাধ্যমে ভিডিওর লিংক খোঁজা হয়েছে। অনুসন্ধানের ধরণ দেখে বোঝা যায়, ব্যবহারকারীরা অপরাধ বা ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার বদলে মূলত ভিডিওটি দেখার জন্যই আগ্রহী ছিলেন। গুগল ট্রেন্ডসে এ ধরনের ‘ব্রেকআউট’ প্যাটার্ন সাধারণত স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র ভাইরাল মুহূর্তের ইঙ্গিত দেয়, যখন নির্দিষ্ট কিছু শব্দ সার্চ তালিকার উপরের দিকে চলে আসে।

ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের সব জায়গায় সার্চের হার সমান ছিল না। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে এ নিয়ে আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাম, যেখানে ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছিল। সার্চের সময়কাল, ব্যবহৃত ভাষা এবং আঞ্চলিক ঘনত্ব বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ ঘটনা বা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার চেয়ে ডিজিটাল ক্লিপটি ছড়িয়ে দেওয়ার এবং দেখার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিল।

প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা ও স্থানীয় আইনের লঙ্ঘন 

ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব এবং এক্স—সব প্ল্যাটফর্মেই যৌন শোষণ, ছবি ব্যবহার করে যৌন হয়রানী, এবং সংবেদনশীল কনটেন্ট প্রচার নিষিদ্ধ। এর মধ্যে মূল ভিডিওর সম্পাদিত সংস্করণ (এডিটেড ক্লিপ) বা অডিও ব্যবহারও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এসব নিয়ম কার্যকরে প্ল্যাটফর্মগুলোর দুর্বলতা ও অসামঞ্জস্যতা স্পষ্ট। যেমন, কিছু মূল ভিডিও ঝাপসা (ব্লার) বা ফ্ল্যাগ করা হলেও এক ক্লিকেই তা দেখার সুযোগ ছিল। আবার কোনো লেবেল বা বাধা ছাড়াই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওর সম্পাদিত সংস্করণ ও অডিও রিমিক্স ছড়িয়ে পড়েছে। এতেই বোঝা যায়, নীতিমালার প্রয়োগ কতটা নড়বড়ে।

অনলাইনে এ সকল কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ এবং অনুমতি ছাড়া যৌন কনটেন্ট ছড়ানো দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডবিধির ১৮৬০ (ধারা ২৯৩ ও ২৯৪) অনুযায়ী অশ্লীল বস্তু প্রদর্শন ও প্রচার নিষিদ্ধ। যৌন সহিংসতা বিষয়ক আইনেও বলা হয়েছে, এ ধরনের ভিডিও রেকর্ড ও প্রচার করা ভুক্তভোগীকে পুনরায় হেনস্তা (সেকেন্ডারি ভিক্টিমাইজেশন) করার শামিল। ভিডিও, এডিট করা ক্লিপ এবং অডিওর এই অবাধ বিস্তার প্রমাণ করে যে, এখানে একদিকে যেমন প্ল্যাটফর্মের নজরদারি দুর্বল, তেমনি দেশের প্রচলিত আইনও লঙ্ঘিত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন বলেন, এ ধরনের ভিডিও শেয়ার বা প্রচার করা পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫—উভয় আইনের অধীনেই ফৌজদারি অপরাধ।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন এসব কনটেন্ট এত ব্যাপকভাবে ছড়ায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, কেউ কেউ কৌতূহল থেকে এসব দেখেন। আবার কেউ কেউ অন্যের ভোগান্তি দেখে বিকৃত আনন্দ পান, যাকে তিনি “মানসিক বিকৃতি” বা “মানসিক সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যারা ছোটবেলায় অতিরিক্ত শাসন বা শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন, তাদের কাছে সহিংসতা বিষয়টি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের কষ্ট দেখে তাদের মধ্যে এক ধরণের তৃপ্তি কাজ করে। আর ভুক্তভোগী নারী হলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

গবেষণা পদ্ধতি

এই প্রতিবেদনে ডিসমিসল্যাব ২০২৫ সালের ১০ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার ধরন বিশ্লেষণ করেছে। ভিডিওটি কীভাবে ছড়িয়েছে তা বুঝতে ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব এবং এক্সে নির্দিষ্ট কিওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে ফেসবুকের ২১৯টি, ইউটিউবের ১০০টি এবং টিকটকের ১০১টি ভিডিও বিশ্লেষণের জন্য নেওয়া হয়। বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহারকারী বেশি হওয়ায় এই মাধ্যমটিকে গভীর বিশ্লেষণের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

পোস্টগুলো যাচাই করে দেখা হয়েছে, সেখানে মূল ভিডিও বা অডিও ব্যবহার করা হয়েছে কি না, বাইরের কোনো লিংক দেওয়া হয়েছে কি না, অথবা এনগেজমেন্ট, বিনোদন বা প্রতিবাদের জন্য কনটেন্টটি নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না। দর্শকের প্রতিক্রিয়া বুঝতে ফেসবুকে পাওয়া প্রাসঙ্গিক পোস্টগুলোর ১ হাজার ৪০৬টি মন্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে মন্তব্যগুলোকে ভিডিও শেয়ার করা, লিংক খোঁজা, হাস্যরস, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ বা নিন্দা জানানোর মতো কয়েকটি ভাগে আলাদা করা হয়েছে। এছাড়া ভাইরাল হওয়া উক্তিটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বুঝতে গুগল ট্রেন্ডসের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর সুরক্ষার স্বার্থে সেই উক্তিটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

আরো কিছু লেখা