
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে চলছে জ্বালানী তেলের সংকট। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে তেল সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন। সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ করে দেওয়াসহ নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে তেল বিক্রির প্রচার-প্রচারণা। কখনো সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি, কখনো আবার অস্বাভাবিক কম দামে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক পেজ। কিন্তু আকর্ষণীয় অফার, সীমিত সময়ের ঘোষণা এবং হোম ডেলিভারির প্রতিশ্রুতির আড়ালে আছে প্রতারণার জাল; যেখানে সাধারণ ক্রেতার অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই হলো মূল লক্ষ্য।
ডিসমিসল্যাব এমন ১৩টি পেজের সন্ধান পেয়েছে, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি বা কম দামে তেল বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সবগুলো পোস্টই করা হয়েছে গত ৩০ মার্চ থেকে ০৪ এপ্রিল সময়সীমার মধ্যে। সেখানে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলসহ বিভিন্ন তেলের দাম উল্লেখ করা হয়েছে। পোস্টে এও বলা হচ্ছে, তাদের মজুদকৃত সকল ধরনের তেল সরকারের অনুমোদন ছাড়া। তাই এই বিষয়ে সকল ডকুমেন্ট ক্রেতার কাছে রাখতে হবে এবং সেটি প্রকাশ করা যাবে না।
জ্বালানি তেল কেনাবেচার এই প্রচারণাগুলো বিজ্ঞাপন আকারেও চলতে দেখা গেছে যা স্পষ্টত মেটার পলিসি লঙ্ঘন। ১৩টি পেজের মধ্যে ১০টি পেজ থেকেই তেল বিক্রয় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন চালাতে দেখা গেছে।
চলমান জ্বালানি সংকটে সরকার থেকে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুদ এবং বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তারপরও ফেসবুকের একাধিক পোস্টে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। আবার কিছু কিছু পোস্টকে বিজ্ঞাপন আকারে মেটার অ্যাড লাইব্রেরিতেও দেখা গেছে।
ফেসবুকে “খান ট্রেডার্স” নামের একটি পেজের পোস্টে লেখা হয়েছে, “খান ট্রেডরসে পাচ্ছেন সীমিত সময়ের জন্য মজুদকৃত ডিজেল অকটেন, পেট্রোল, এবং সয়াবিন, সরিষার তেল।” এরপর, ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, সয়াবিন ও সরিষার তেলের লিটারপ্রতি দাম উল্লেখ করা হয় যথাক্রমে ১৩০, ১৫০, ১৫০, ১৪০ ও ১৬০ টাকা। পোস্টে আরও বলা হয়, যেকোনো পণ্য ১০ লিটারের নিচে বিক্রি হয় না এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ভিতর সারা বাংলাদেশ হোম ডেলিভারি করে দেওয়া যাবে। এছাড়া সেখানে জানানো হয়, তাদের মজুদকৃত সকল ধরনের তেল সরকারের অনুমোদন ছাড়া। তাই এই বিষয়ে সকল ডকুমেন্ট ক্রেতার কাছে রাখতে হবে এবং সেটা প্রকাশ করা যাবে না।
আবার “যমুনা তেল পাম্প” নামের একটি পেজ থেকেও গত ১ এপ্রিল জ্বালানি তেল বিক্রি করা একটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনের এক অংশে বলা হয়, “যমুনা তেল পাম্প নিয়ে এলো পেট্রোল ও অকটেন ১:পেট্রোল প্রতি লিটার১৪০ ২:অকটেন প্রতি লিটার ১৫০ ৩:ডিজেল প্রতি লিটার ১২০ ৪:কেরোসিন প্রতি লিটার ১০০ বিশেষ দ্রষ্টব্য সম্পূর্ণ ক্যাশ অন ডেলিভারিতে মাল দেওয়া হয় না 🔯অর্ডার করলেই ডেলিভারি চার্জ সম্পূর্ণ ফ্রি সম্পূর্ণ ক্যাশন অন ডেলিভারি প্রযোজ্য নয় আপনাকে ২০% টাকা এডভান্স করতে হবে বাকি ৮০% টাকা ডেলিভারি মেনকে পরিশোধ করতে হবে।” যোগাযোগের জন্য একটি নম্বরও দেওয়া হয় পোস্টে। এ নিয়ে মেটায় বিজ্ঞাপনও চালিয়েছে পেজটি।

যাচাইয়ে দেখা গেছে, এই পেজগুলো থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রির উল্লেখ আছে। এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গত ৩১ মার্চে প্রকাশিত সেই নির্দেশিকায় ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এপ্রিলে প্রতি লিটার ১০০ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা, পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ আর অকটেনের দাম ১২০ টাকা করা হয়। ১ এপ্রিল থেকে নির্দেশনাটি কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।
এই পেজ দুটো ছাড়াও ফেসবুকের আরও চারটি পেজ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে দেখা যায়। “আমিরুল ওয়েল সাপ্লাইয়ার্স”, “অনলাইন শপ” এবং “সরকারি মালিকানাধীন ইআরএল লিমিটেড”, ও “বিজিবি কাস্টম হাউস” নামের চারটি পেজ থেকেই পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল বেশি দামে বিক্রি করার পোস্ট দেখা যায়। এর মধ্যে দুটি (১, ২) পেজকে বিজ্ঞাপনও চালাতে দেখা যায়। কিছু পোস্টে (১, ২) জ্বালানি তেল ছাড়া সয়াবিন তেল এবং সরিষার তেলও বিক্রি করতে দেখা গেছে।
আবার ফেসবুকের একাধিক পেজে দেখা গেছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রির দাবি করতে। “মেঘনা ডিপো” নামের একটি পেজ থেকে গত ৩০ মার্চ একটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে বলা হয়, “আসসালামু আলাইকুম মেঘনা ডিপো নিয়ে এলো পেট্রোল ও অকটেন ১:পেট্রোল প্রতি লিটার ৯৫ ২:অকটেন প্রতি লিটার ১০০ ৩:ডিজেল প্রতি লিটার ৮০ ৪:কেরোসিন প্রতি লিটার ৮০ বিশেষ দ্রষ্টব্য সম্পূর্ণ ক্যাশ অন ডেলিভারিতে মাল দেওযা হয়না” (বানান অপরিবর্তিত)। এখানেও পরবর্তীতে যোগাযোগের জন্য একটি নাম্বার দেওয়া রয়েছে। একই ক্যাপশন এবং ছবি সংযুক্ত করে একাধিক (১, ২) পেজ থেকেও পোস্ট দিতে দেখা যায়।
আবার একই ক্যাপশনে ভিন্ন ছবি দিয়ে পোস্ট করতে দেখা যায় “পদ্মা এন্টারপ্রাইজ” নামের পেজ থেকে গত ৪ এপ্রিল। এই সবগুলো পোস্টেই যোগাযোগ নম্বর ছাড়া বাকি সব তথ্যে মিল রয়েছে। আর এই সবগুলো পেজ থেকে (১, ২, ৩, ৪) বিজ্ঞাপনও চালানো হয়েছে।
এসব ছাড়াও একাধিক (১, ২, ৩) পেজ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাপশনে এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করার পোস্ট দিতে দেখা গেছে এবং পেজগুলো (১, ২, ৩) থেকে মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে বিজ্ঞাপনও চালাতে দেখা গেছে।
ফেসবুকে তেল বিক্রির প্রচারণা চালানো ১৩টি পেজের ৯টি পেজই তৈরি করা হয়েছে চলতি বছরের ২৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিলের মধ্যে। যে ৪টি ২০২৫ সালে খোলা হয়েছে সেগুলোর ট্রান্সপারেন্সি সেকশন যাচাই করলে দেখা যায়, ৩টি পেজ গত মার্চে আর একটি পেজ গত ১ এপ্রিলে নিজেদের নাম আপডেট করেছে। কেয়া পাইকারি স্টোরের নাম বদলে মেঘনা ডিপো করা হয়েছে। আবার তামান্না পাইকারি স্টোর বদলে যমুনা ডিপো করা হয়েছে।

পেজগুলো প্রকৃতপক্ষেই তেল বিক্রি করছে কি না তা অনুসন্ধানে ক্রেতা পরিচয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। কথা বলা হয় ৮টি পেজের পোস্টে যুক্ত করা মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে। যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, রাজশাহী, সিলেট এবং চট্টগ্রাম থেকে তেল পাঠানো হচ্ছে বলে জানানো হয় পেজগুলোর পক্ষ থেকে।। বিভিন্ন পরিমাণে পেট্রোল, ডিজেল এবং অকটেন চাওয়া হলে সবগুলো পেজ থেকেই অগ্রিম হিসেবে ১৫০ টাকা দাবি করা হয়।
অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরও তেল পাঠায় কি না তা যাচাইয়ে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি আলাদা পেজে বিকাশের মাধ্যমে ১৫০ টাকা পাঠায় ডিসমিসল্যাব। “যমুনা তেল পাম্প” এবং “বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন” পেজ দুটিকে টাকা পাঠানো হলে হোয়াটসঅ্যাপে তারা ডেলিভারির ঠিকানা জানাতে বলে। সেটি জানানো হলে তারা জানায় পরের দিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে তেল ডেলিভারি করা হবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন পেজটি ডিসমিসল্যাবের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করে এবং আশ্বস্ত করে “তেল আগামীকালের মধ্যেই” পাওয়া যাবে। তবে, পরদিন সকালে মনির নামের একজন ডেলিভারিম্যান জানায় তেলের পার্সেলটি সংগ্রহ করেছেন কিন্তু সম্পূর্ণ টাকা বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে না পাঠালে তিনি সেটা পৌঁছাতে পারবেন না। এটাও জানান, টাকা পরিশোধের পর তাদের পক্ষ থেকে একটি কোড পাঠানো হবে। এই কোড জানানোর পরই তেল সরবরাহ করবে। তবে ডিসমিসল্যাবের পক্ষ থেকে পণ্য গ্রহণের পর বাকি টাকা পরিশোধ করতে চাওয়া হলে তারা অস্বীকৃতি জানান।
এরপর যমুনা তেল পাম্প পেজটি থেকে যোগাযোগ করে হুবহু একই পদ্ধতিতে পুরো টাকা পরিশোধের কথা বলা হয় এবং এরপরই তারা কোড দিবে বলে জানায়। তবে, পণ্য পাওয়ার পর টাকা পরিশোধ করতে চাইলে (ক্যাশ অন ডেলিভারি) এক পর্যায়ে গালিগালাজ করে কল কেটে দেন তারা।
এর আগে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে মাদকদ্রব্য ও অ্যালকোহল কেনাবেচার প্রতারণা নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাব। সেখানেও প্রতারক চক্র একই পদ্ধতিতে পণ্য পৌছাঁনোর আগে পুরো টাকা পরিশোধ করে কোড পাঠানোর কথা বলেছিল ডিসমিসল্যাবকে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। অনলাইনে তেল ক্রয়-বিক্রয়কে অবৈধ জানিয়ে তিনি বলেন, “তেল ক্রয় বিক্রয়ের জন্য পেট্রোল পাম্প তো আছেই।”

মেটার বিপজ্জনক পণ্য ও পদার্থ নীতিমালাতে বলা হয়েছে, “বাণিজ্যিক বার্তায় কোনোভাবেই বিপজ্জনক পণ্য এবং পদার্থের ক্রয়, বিক্রয় বা আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করা যাবে না।” মেটার এই পলিসিতে বিপজ্জনক পণ্যের মধ্যে রয়েছে “দাহ্য এবং দহনযোগ্য পদার্থ ও পণ্যসমূহ।” এ ধরনের পণ্যই অর্থাৎ, ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিনের মতো জ্বালানি তেল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে ফেসবুকের এসব পেজ থেকে। শুধু বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং অধিকাংশ পেজ পণ্যগুলোর বিজ্ঞাপনও চালাচ্ছে মেটার অ্যাড লাইব্রেরিতে যা প্ল্যাটফর্মটির নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।