মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল

স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

পরিচয় যোগাযোগ মাধ্যম উই চ্যাটে। পরিচয় থেকে প্রেম এবং শেষে টাঙ্গাইলের এক বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করলেন চীনা নাগরিক। সংবাদ প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে, আলোচনা চলে সামাজিক মাধ্যমেও। কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে নানা ধরনের গল্প ছড়াতে থাকে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে।

বিভিন্ন পোস্টে চীনা এই নাগরিককে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে দেখানো হয়। কোনো গণমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া না গেলেও এআই দিয়ে বিভিন্ন ছবি তৈরি করে পোস্ট হতে থাকে সামাজিক মাধ্যমে। ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বসবাসরত পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো এই বয়ানের শুরু ফেসবুকের একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিয়ে ছড়ানো এই ধরনের বিদ্বেষমূলক কনটেন্টগুলো মূলত কাঠামোগত সহিংসতার অংশ। ভিত্তিহীন এইসব দাবি মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে থাকা স্টেরিওটাইপগুলোকে আরও ছড়িয়ে দেয় এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ কমে যায় বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

স্যাটায়ার পেজ থেকে অপতথ্য

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি চীনা যুবক মামুসা বাংলাদেশে আসেন টাঙ্গাইলের মায়া আক্তারকে বিয়ে করতে। এরপর মুসলিম রীতি মেনে তাদের বিয়ে সম্পন্নও হয়। কনে মায়া আক্তারের পরিবারও এই বিয়ে মেনে নিয়েছেন। ভিনদেশি পাত্র দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ কনের বাড়িতে ভিড় জমিয়েছেন। পাসপোর্ট, ভিসা ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্ত্রীকে নিজের দেশ চীনে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন ওই যুবক।

সংবাদগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর “আনোয়ার টিভি” নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ থেকে গত ৭ মার্চ একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। ফটোকার্ডে লেখা হয়, “চীন নয়, খাগড়াছড়ি থেকে প্রেমের টানে ছুটে আসেন মিতুল বার্মা নামের যুবক, ভিপিএন দিয়ে চালাতো উইচ্যাট।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে ৪০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। শেয়ার ও মন্তব্য করা হয়েছে যথাক্রমে দুইশ ও নয় শর বেশি বার।  এরপর একই দাবিতে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইল থেকে পোস্ট হতে দেখা যায় (, , , )।

ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল
আনোয়ার টিভি নামের স্যাটায়ার পেজ থেকে পোস্ট হওয়া ফটোকার্ডের স্ক্রিনশট।

“আনোয়ার টিভি” নামের পেজটির ক্যাটাগরি অনুযায়ী এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজ। পেজের বায়োতে লেখা এটি সবসময় সমসাময়িক ঘটনাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রকাশ করে থাকে এবং ব্যবহারকারীদের অনুরোধ করা হয়েছে যেন পোস্টগুলো ঠাট্টা হিসেবেই গ্রহণ করা হয়। যদিও পেজটি থেকে পোস্ট হওয়া ফটোকার্ডে একটি সম্পাদিত ছবিও যুক্ত করা হয়েছে। যে ফটোকার্ড পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজ থেকে সত্য দাবিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফটোকার্ডে থাকা চীনের নাগরিকের সঙ্গে গ্রুপ সেলফির ছবিটি রিভার্স সার্চ দিলে একাধিক (, , ) সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সামনে আসে। বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ২০২৫ সালে এপ্রিলের একটি প্রতিবেদনে হুবহু একই ছবি খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে মাঝখানে থাকা ব্যক্তি ছাড়া সকলে চেহারা ও ছবির ফ্রেমিং হুবহু এক। 

ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে খুঁজে পাওয়া আসল গ্রুপ সেলফির স্ক্রিনশট।

দাবিটি স্যাটায়ার পেজ থেকে করা হলেও দ্রুতই এটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানান ডালপালা মেলে। বিভিন্ন ব্যবহারকারীকে পোস্ট করতে দেখা যায় এই দাবিতে যে, টাঙ্গাইলে আসা সেই যুবক আসলে চীনা নাগরিক নয়, বরং খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। এটি নিয়ে প্রতারণার দায় দিয়ে বিভিন্ন পোস্ট হতে দেখা যায় এবং “প্রতারককে” তুলে ধরা হয় একজন পাহাড়ি যুবক হিসেবে।  

ফেসবুকের একটি প্রোফাইল থেকে গত ৮ মার্চ একটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “ব্রেকিং নিউজ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিয়ে করার অভিযোগ চাকমা ছেলের বিরুদ্ধে ——প্র*তারণা করে বিয়ে করল, চাকমা ছেলে বাঙালি মেয়েকে –নেট দুনিয়ায় ভাইরাল, মি*থ্যা ও ছ*লনার আশ্রয় নিয়ে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলবাসীকে, যেভাবে ধোঁকা দিল চাকমা ছেলে।। অনেকেই যা ভেবেছে, অবশেষে তাই হলো। নেট দুনিয়ায় গুঞ্জন উঠেছে যে চীন থেকে আসা, ওই যুবকটির আসল বাড়ি বাংলাদেশে। সে পার্বত্য এলাকা থেকে এসেছে বলে, পরিচয় গোপন করেছে, এবং VPN ব্যবহার করে নেট সংযোগ করে WeChat অ্যাপে,, ২ মাস ধরে প্রেম করে বিয়ে করেছে।। নেটিজেনদের মধ্যে আগেই ধারণা ছিল যে, এটি হয়তো একটি প্রতারণা। মেয়েটির তো অভিযোগ করার কিছু নেই, কারণ সে যে মানুষ টিকে ভালোবেসেছে তাকে বিয়ে করেছে। সে হোক চায়না কিংবা চাকমা তাতে কি?? এখন তো মনে হচ্ছে মেয়েটি “”চায়না “”দেশকে ভালোবেসেছে, ছেলেটিকে না।। বর্তমান যুগে সত্যিকারে ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই, সবাই খুঁজে লাভের ভালোবাসা।”

ঘটনাটি সত্য ভেবে পোস্টের মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “উচিত শিক্ষা হয়ছে। অতি লোভে তাতি নষ্ট।” আরেকজন লিখেছেন, “আমি আগেই বলেছিলাম সেই চাকমা বা মারমা হতে পারে।” একটি মন্তব্যে লেখা আছে, “পাহাড়ে নিয়ে পাচার না করলেই হয়।” আবার কয়েকজনকে পোস্টটি মিথ্যা বলেও মন্তব্য করতে দেখা যায়। আরও একাধিক প্রোফাইল ও পেজ থেকে একই ধরনের ক্যাপশনে পোস্ট দিতে দেখা গেছে (, , , )। কেবল ফেসবুকেই নয়, সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রামেও একই ধরনের পোস্ট ছড়াতে দেখা যায় (, , )।

ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল
ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইল থেকে মিথ্যা দাবিতে পোস্ট হওয়া ফটোকার্ডের স্ক্রিনশট।

পাহাড়ের খবর” নামের একটি পেজ থেকে সরাসরি পাহাড়ি প্রতারক চক্র দাবি করে একটি পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, “খাগড়াছড়ির প্র”তারক চ’ক্রের ফাঁদ! বুঝেন ওরা কত বড় বাটপার?” ক্যাপশনে আরও উল্লেখ করা হয়, “চীন নয়, Khagrachari থেকে প্রেমের টানে ছুটে আসেন মৃতুল বর্মা নামের এক যুবক। জানা গেছে, ভিপিএন ব্যবহার করে বিদেশি পরিচয় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় তৈরি করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, এভাবে বিদেশি পরিচয় দেখিয়ে মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিভিন্নভাবে প্র’তারণার চেষ্টা করা হতো।” একই দাবিতে একাধিক পোস্ট পাওয়া যায় ফেসবুকে (, , ), ইনস্টাগ্রাম (, , )। 

একটি পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “প্রেমের টানে পাহাড়ি আদিবাসী যুবক রাঙ্গামাটি থেকে চলে আসলো টাঙ্গাইল জেলায় মেয়ে বাঙালি ছেলে চাকমা তারা দুজন দুজনকে তাদের জীবনের থেকেও বেশি ভালবাসে তাই মেয়েটি ও ছেলেটির হাত ধরে বাসা থেকে বের হয়ে আসলো। সবাই এদের জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ করবেন। এরা যেন ভালবেসে দুজন দুজনের পাশে থাকতে পারে সারা জীবন। পুরো ভিডিওটি দেখতে নিঃশব্দ গল্পের পাতা এই পেজটিতে ফলো দিয়ে কমেন্ট করো আমি তোমাদের পুরো ভিডিওটি দেখাবো।”

চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে হওয়া মেয়েটিকে ভারতে পাচার করা হয়েছে দাবিতেও কিছু পোস্ট (, ) ছড়ানো হয়েছে। একটি পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “মেয়েটার হাতে হা’রি’কে’ন ধরিয়ে দিছে চীনের এক যুবক প্রেমের টানে টাঙ্গাইল এসে নবম শ্রেণীর একটা মেয়েকে বিয়ে করছে;ভিডিওতে দেখলাম ওই যুবককে পেয়ে মেয়েটাও ভীষণ খুশি ।কিন্তু এখন শোনা যাইতেছে ছেলেটার বাড়ি নাকি খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটি (চাকমা হওয়ায় দেখতে চীনা যুবকদের মতো দেখায়)। অ’ব’শে”ষে আজকে মেয়েটাকে ভারতে পা’চা’র করে দিছে ।”

ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল
ভারতে পাচারের দাবিতে প্রচারিত পোস্টের স্ক্রিনশট।

সংবাদমাধ্যমের আদলে নাম ও লোগো দিয়ে তৈরি একাধিক পেজ থেকেও ছেলেটিকে চাকমা দাবি করে পোস্ট করা হয়েছে (, , )। নিজেদের সংবাদমাধ্যম দাবি করা পেজ এস এ নিউজ বাংলা থেকে ছেলে ও মেয়েটির একাধিক ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “টাঙ্গাইলের ঘাটাইলবাসীকে যেভাবে ধোঁ’কা দিল সেই কথিত “চাইনিজ” যুবক!  যা ভেবেছিলাম, শেষ পর্যন্ত নেট দুনিয়ায় ঠিক সেই গু’ঞ্জনই উঠেছে। অনেকেই বলছে—চীন থেকে আসা বলে পরিচয় দেওয়া ওই যুবকের আসল বাড়ি নাকি বাংলাদেশেই। বান্দরবনের এক চাকমা ছেলে, যে নাকি VPN ব্যবহার করে WeChat-এ প্রায় ২ মাস প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত বিয়েও করেছে। অনেকের আগেই স’ন্দেহ ছিল—ঘটনার পেছনে হয়তো কোনো প্রতারণা আছে! আপনারা কী মনে করেন?প্র’তা’রক… নাকি সত্যিই প্রেমের গল্প?”

ছেলে ও মেয়েটির এআই দিয়ে বানানো ছবি দিয়েও করা হয়েছে একই ধরনের পোস্ট। এমন একটি পোস্টের ছবি গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থআইডি দিয়ে পরীক্ষা করে ডিসমিসল্যাব। জেমিনি জানায়, “সিন্থআইডি ওয়াটারমার্ক শনাক্তকরণের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এই ছবির বেশিরভাগ অংশ বা সম্পূর্ণটাই গুগল এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি বা উল্লেখযোগ্যভাবে এডিট করা হয়েছে।”

“সোনিয়া খান” নামের এক আইডি থেকে ছেলেটির আরেকটি ছবি পোস্ট করে দাবি করা হয়, চীনা পরিচয় দেওয়া যুবকের বাড়ি বান্দরবন এবং তিনি আগে থেকেই বিবাহিত। তার স্ত্রীসহ দুটি সন্তানও রয়েছে। ছবিটি সিন্থআইডি দিয়ে যাচাই করলে দেখা যায় এটি গুগলের এআই মডেলের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। “সোনিয়া খান” নামের পেজটি থেকে ৬ মার্চ থেকে ১৪ মার্চের মধ্যে অন্তত ১৬টি পোস্ট হতে দেখা যায় শুধু এই ঘটনা নিয়ে। কোনো পোস্টে দাবি করা হয় “পাহাড়ি যুবক” স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়েছে, আবার কোনো পোস্টে বলা হয়েছে মেয়েটিকে পাচারের কথা। এআই দিয়ে তৈরি ছবি পোস্ট করতে দেখা গেছে অন্তত তিনটি।

ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল
চীনের নাগরিক বান্দরবানের বাসিন্দা ও তার একাধিক স্ত্রী আছে দাবিতে ছড়ানো পোস্টের স্ক্রিনশট।

তবে ওই যুবক চীনের নয় বরং পাহাড়ি– এমন কোনো তথ্য মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে খুঁজে পায়নি ডিসমিসল্যাব। প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের যেসব সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়েছে সেগুলোতে বিয়ের পিরিতে বসা যুবককে চীনের নাগরিক বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের রানি উখেংচিং মারমা মনে করেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিয়ে ছড়ানো এই ধরনের বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট মূলত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাঠামোগত সহিংসতারই অংশ। যেসব মাধ্যম ব্যবহার করে এসব করা হয়, সেগুলোর কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকে যা তারা বাস্তবায়ন করতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা ডিসমিসল্যাবকে বলেন, যেকোনো অপতথ্যকে যখন আমরা মোকাবিলা করব তখন আমাদের বিবেচনা করা উচিত, এই বিভ্রান্তি তৈরি করা এবং নেতিবাচকভাবে কোনো পরিচয় নির্মাণ করা, এটা একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে হয়। যার উদ্দেশ্যটি হচ্ছে- যাকে বা যে সম্প্রদায়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেই সম্প্রদায়টিকে ডিলেজিটিমাইজ বা অবৈধকরণ করার একটা প্রক্রিয়া; এবং এটা একটা রাজনৈতিক প্রকল্প। যারা এগুলো করে, তাদের উদ্দেশ্য অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে ঐ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা। 

সে যুবক সম্পর্কে যা জানা যায়

প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব, যেখানে মামুসা নামের যুবকের একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যম “বাংলা এডিশন”-এর একটি ভেরিফায়েড পেজ থেকে পোস্টটি করা হয়েছে। ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, “চীন থেকে এসে বাংলাদেশি স্কুলছাত্রীকে বিয়ে, আ’শ’ঙ্কা’য় মেয়ের বাবা।” পোস্টে থাকা ভিডিও প্রতিবেদনের দৈর্ঘ্য ৬ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড। ভিডিওর ২৩ সেকেন্ডে গিয়ে ওই নাগরিক পরিচয়পত্রের ছবি দেখানো হয়, যেখানে থাকা ছবি আলোচিত যুবকের চেহারার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে পরিচয়পত্রটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলোচিত যুবকের নাম “মা মুসা”। তার জাতিসত্তার নাম উল্লেখ করা আছে “ডংশিয়াং”। আর ঠিকানা হিসেবে গানসু প্রদেশের ডংশিয়াং স্বায়ত্তশাসিত কাউন্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে কার্ডে। 

উল্লেখ্য, ডংশিয়াং জনগোষ্ঠী মূলত গানসু প্রদেশের লিংশিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত প্রিফেকচারের ডংশিয়াং স্বায়ত্তশাসিত কাউন্টিতে বসবাস করে। ডংশিয়াং ভাষায় কথা বলা এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশই ইসলাম ধর্মের অনুসারী। 

পরিচয়পত্রে ছবিটি রিভার্স সার্চ দিলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চীনের আরও একাধিক পরিচয়পত্রের ছবি (, , ) পাওয়া যায়, যেগুলোর ফরম্যাট দেখতে হুবহু একই এরকম।

ফ্যাক্ট চেক স্যাটায়ার পোস্ট যেভাবে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টির উৎস হয়ে উঠল
সংবাদমাধ্যম বাংলা এডিশনের ভিডিও প্রতিবেদনে দেখানো চীনা নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের স্ক্রিনশট।

এছাড়া মামুসা নামের যুবকের সঙ্গে বিয়ে করা টাঙ্গাইলের মেয়েটির সঙ্গেও কথা বলে ডিসমিসল্যাব। তিনি ডিসমিসল্যাবকে জানায় মামুসা চীন থেকে এসেছেন এবং এটি তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন। এছাড়া তাকে ভারত পাচার করে দেওয়া হয়েছে বা তার গহনা চুরি করে যুবকটি পালিয়েছে এমন দাবিগুলোকেও তিনি মিথ্যা বলে জানান। তিনি বলেন, “মানুষ বলতেছে ও নাকি চায়নার না, রাঙামাটির। এগুলা সবাই বলতাছে। তো আমি প্রথমত বলব যে, ও কোনো রাঙামাটির না, ওর বাসা চায়নাতে। ওর সাথে কথা বলছি, ওর বাবা-মার সাথে কথা বলছি। আর ওর এখানে ফ্রেন্ড আছে, মানে ওরা চায়না থেকেই আসছে, এগুলা সব ইয়া। আর মানুষ যা ছড়াইতাছে, মনে করেন যে ডিম, মানে মুরগি ডিম পাড়ার আগেই মনে করেন যে ফুটাইয়া বাচ্চা বাইর কইরা ফালাইছে সবাই।”

কেন এমন বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট ছড়ায়

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মঈন জালাল চৌধুরী বলেন, আনোয়ার টিভির মতো পেজগুলো মূলত মূলধারার গণমাধ্যমকে পরিহাস করে। আমরা যে ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’তে বসবাস করছি সেখানে এই পেজগুলোর কাজই হলো আমাদের মনোযোগ ধরতে পারা। এই মনোযোগ ধরার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মানুষের মধ্যে থাকা নানা ধরনের পক্ষপাত, যদি আরও নির্দিষ্ট করে বলি আমাদের বাঙালি আধিপত্যবাদী সংখ্যাগুরু মনের বিভিন্ন পূর্ব নির্ধারিত ধারণাকে (স্টেরিওটাইপ) ব্যবহার করা। মানুষের বায়াসই মানুষকে এমন কনটেন্টে যুক্ত হতে বাধ্য করে।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছড়ানো এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট মূলত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাঠামোগত সহিংসতারই অংশ বলে মনে করেন রানি উখেংচিং মারমা। তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুল তথ্য ছড়ানো অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা স্টেরিওটাইপ চিন্তাকে আরও দৃঢ় করে। জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা সংকীর্ণ হয়ে আসে।

অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, “এ ধরনের অপতথ্য পাহাড়ে ও সমতলের মানুষের মধ্যে আস্থা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সেটাই উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্যটা অনেক ক্ষেত্রে সফল হবে যদি সাধারণ সমতলের জনগোষ্ঠী কিংবা পাহাড়ে আদিবাসী নয় এরকম জনগোষ্ঠী সেটিতে বিশ্বাস করেন। এবং আমি যা দেখলাম তাতে তারা বিশ্বাস করছেন এবং একটা বড় সংখ্যক মানুষ এই প্রচারণায় বিশ্বাস করেছেন। এবং এই বিশ্বাস করার ফলে, আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে না জানার ফলে তাদের সম্পর্কে এক ধরনের ভুল ধারণা, ভ্রান্ত মত এবং প্রেজুডিস থাকে, সেগুলোকে আরও বেশি বাড়িয়ে তুলবে। যা পাহাড়ে এবং সমতলের মানুষের মধ্যে যেকোনো সম্প্রীতিমূলক সহাবস্থান, সহনাগরিকের অধিকারের অবস্থান— এগুলোকে ক্ষুণ্ন করবে।”

এই প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার নিতে সহায়তা করেছেন নীতি চাকমা এবং নোশিন তাবাসসুম।

আরো কিছু লেখা